বাংলাদেশ সংবাদ
সাত মাসে মানবাধিকার লঙ্ঘন হয়নি—দাবির বিপরীতে টিআইবির পরিসংখ্যান
বাংলাদেশ প্রতিনিধি, ১৬ সেপ্টেম্বর:
বাংলাদেশে গত সাত মাসে কোনো মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটেনি—প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা ও প্রাথমিক ও গণশিক্ষা উপদেষ্টা মাহাদী আমিনের এমন দাবির সঙ্গে একমত নন ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান। তাঁর দাবি, টিআইবির কাছে থাকা তথ্য বরং মানবাধিকার পরিস্থিতিতে একাধিক উদ্বেগজনক ঘটনার চিত্র তুলে ধরছে।
আন্তর্জাতিক গণতন্ত্র দিবস উপলক্ষে মঙ্গলবার ঢাকার ধানমন্ডিতে টিআইবি কার্যালয়ে ‘গণতন্ত্র, মানবাধিকার ও জবাবদিহিমূলক সরকার ব্যবস্থা’ শীর্ষক আলোচনা সভায় এ নিয়ে মতবিনিময় হয়।
অনুষ্ঠানে মাহাদী আমিন বলেন, গত সাত মাসে দেশে অভূতপূর্ব বাক্স্বাধীনতা ও মানবাধিকার নিশ্চিত হয়েছে। তাঁর দাবি, এ সময়ে রাষ্ট্রীয় মদদে গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যা কিংবা হেফাজতে মৃত্যুর মতো ঘটনা ঘটেনি। বিরোধী মত ও ভিন্ন আদর্শের মানুষের মতপ্রকাশের অধিকারও কেড়ে নেওয়া হয়নি।
তবে এর বিপরীতে ইফতেখারুজ্জামান বলেন, মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটেনি—এমন দাবি করার মতো তথ্য টিআইবির হাতে নেই। বরং তাঁদের পর্যবেক্ষণে মানবাধিকার পরিস্থিতির বিভিন্ন ক্ষেত্রে উদ্বেগজনক চিত্র রয়েছে।
টিআইবির তথ্য অনুযায়ী, বাক্স্বাধীনতা চর্চাকে কেন্দ্র করে অন্তত ৫২টি হয়রানির ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় ৫৮ জনকে আটক করা হয়েছে। আটক ব্যক্তিদের অধিকাংশের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে বলে জানান ইফতেখারুজ্জামান।
তিনি বলেন, ২০২৪ সালের পর পরিবর্তিত রাজনৈতিক বাস্তবতায় মতপ্রকাশের কারণে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে আটকের ঘটনা প্রত্যাশিত ছিল না।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন টিআইবির নির্বাহী পরিচালক। তাঁর মতে, পুলিশ এখনো নৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিকভাবে পুরোপুরি ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি। ফলে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সম্পূর্ণ স্বাভাবিক হয়েছে—এমন দাবি করার সুযোগ নেই।
ইফতেখারুজ্জামানের দেওয়া পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত সাত মাসে কন্যাশিশু ও নারীর বিরুদ্ধে সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে ১ হাজার ৭০০টির বেশি। এর মধ্যে ধর্ষণের ঘটনা ৫০৩টি।
একই সময়ে হেফাজতে নির্যাতনের ৫১টি ঘটনা ঘটেছে এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে ৭ জনের মৃত্যুর ঘটনাও ঘটেছে বলে তিনি জানান। এ ছাড়া একটি গুমের ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়ার কথাও উল্লেখ করেন তিনি।
নারীর বিরুদ্ধে সহিংসতার এই চিত্রকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বিভিন্ন মানবাধিকার ও নারী অধিকার সংগঠনের পরিসংখ্যানেও বাংলাদেশে নারী ও শিশুর নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগজনক প্রবণতা দেখা গেছে। ২০২৬ সালের আগস্টে মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশনের হিসাবে নারী ও শিশু নির্যাতনের ৩২৭টি ঘটনা নথিভুক্ত হয়; জুলাইয়ে ছিল ৩০৬টি। আগস্টে মব সহিংসতায় ৩৫ জন নিহত ও ৭৪ জন আহত হন।
অন্যদিকে, মাহাদী আমিন বলেন, রাজনৈতিক কারণে তাঁর জানা মতে কোনো মানবাধিকার লঙ্ঘন ঘটেনি। রাষ্ট্রের বিশাল কাঠামোর কোথাও বিচ্ছিন্ন ভুল বা অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটে থাকলে সেগুলো জবাবদিহির আওতায় আনা হচ্ছে বলেও তিনি দাবি করেন।
ফলে আন্তর্জাতিক গণতন্ত্র দিবসের আলোচনায় মূল প্রশ্নটি হয়ে দাঁড়িয়েছে—মানবাধিকার পরিস্থিতি মূল্যায়নে রাজনৈতিক বক্তব্য নয়, মাঠপর্যায়ের তথ্য, ভুক্তভোগীর অভিজ্ঞতা এবং স্বাধীন পর্যবেক্ষণের পরিসংখ্যানকে কতটা গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
টিআইবির দেওয়া তথ্যের সঙ্গে সরকারের বক্তব্যের এই পার্থক্য বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে আরও স্বাধীন, স্বচ্ছ ও নিয়মিত তথ্য প্রকাশের প্রয়োজনীয়তাকেও সামনে এনেছে।