‘‘গল্পকাররা বিশ্ব শাসন করে’’
নির্ঝর এর ঝরঝরে অনুগল্প ।। ৪২ ।। আমি যে আঁধারের বন্দিনী
।। আমি যে আঁধারের বন্দিনী।।
উৎসর্গ
পোশাকশিল্পের সেইসব শ্রমজীবী নারীর প্রতি—
যাদের না-বলা গল্প আজও আঁধারে বন্দী

সাভার। ব্রিকলেন গার্মেন্টস। এই ফ্যাক্টরির তৃতীয় তলায় প্রায় তিনশ নারী কাজ করে। সারাদিন সেলাই মেশিনের শব্দে জায়গাটা মুখর থাকে। সন্ধ্যার পর তলা ফাঁকা হয়ে গেলে শুধু দূরের কোনো মেশিনের মৃদু শব্দ শোনা যায়।
ঘটনাটা শুরু হয় মিতাকে দিয়ে।
সন্ধ্যার দিকে বাথরুমে ঢুকে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে চুল ঠিক করছিল সে। হঠাৎ আয়নায় নিজের পেছনে একজন নারীকে দেখতে পায়।
সাদা পোশাক। ভেজা চুল।
মিতা ঘুরে দাঁড়ায়।
কেউ নেই।
আবার আয়নার দিকে তাকায়। এবার শুধু নিজের মুখ। মিতা মাথা ঘুরে বাতরুমে পড়ে অজ্ঞান হয়ে যায়। পরে অনেকে ধরাধরি করে তাকে বাথরুম থেকে নিয়ে আসে।
পরদিন দুপুরে আরেক কর্মি রিনা বেগম টয়লেট থেকে বেরিয়েই জ্ঞান হারায়। জ্ঞান ফেরার পর সে শুধু বলে,
—একজন মহিলা আমাকে নাম ধরে ডাকছিল।
খবরটা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। কেউ বলে, বাথরুমে অদ্ভুত শব্দ শোনা যায়। কেউ বলে, রাতে আয়নায় অন্য কাউকে দেখা যায়।
প্রশাসনিক কর্মকর্তা তানভীর আহমেদ এসব অলৌকিক ভুত প্রেতে বিশ্বাস করেন না। সেদিন রাতেই তৃতীয় তলায় যান টয়লেট পরিদর্শন করতে।
সময় ১০টা ১৭ মিনিট।
টয়লেটের ভেতর থেকে পানির শব্দ আসছে। তিনি পরিস্কার শুনতে পাচ্ছেন।
টুপ।
টুপ।
তানভীর দরজা খুলে ঢোকেন। সব কল বন্ধ। মেঝেও শুকনো।
আয়নার সামনে দাঁড়াতেই তাঁর চোখ আটকে যায়।

পেছনে একজন নারী।
তানভীর দ্রুত ঘুরে দাঁড়ান।
কেউ নেই।
আবার আয়নায় তাকাতেই মেয়েটি এবার আরও কাছে।
—কে আপনি?
মেয়েটি ধীরে মুখ তোলে।
—আমি যে আঁধারের বন্দিনী।
আলো নিভে যায়।
তানভীর আর এক মুহূর্তও সেখানে থাকেন না। প্রায় ছিটকে উন্মাদের মতো এক দৌড়ে টয়লেট থেকে বেরিয়ে পড়েন।
পরদিন পুরোনো কর্মীদের কাছ থেকে একটি নাম পাওয়া যায়—শিউলি রহমান।
ছয় বছর আগে তিনি এই কারখানায় শ্রমিকদের হয়ে কথা বলতেন। মজুরি ও নিরাপত্তা নিয়ে কর্তৃপক্ষের সঙ্গে তাঁর বিরোধ ছিল।
এক রাতে তিনি নিখোঁজ হন।
কর্তৃপক্ষ বলেছিল, তিনি চাকরি ছেড়ে চলে গেছেন।
কিন্তু এক বৃদ্ধ কর্মচারী জানান, শিউলিকে শেষবার তৃতীয় তলায় এক প্রভাবশালী কর্মকর্তার সঙ্গে দেখা গিয়েছিল। তারপর আর কেউ তাঁকে দেখেনি।
খোঁজ করতে গিয়ে বাথরুমের পাশের দেয়ালের ভেতর একটি পুরোনো ঘর পাওয়া যায়। বর্তমান নকশায় ঘরটির কোনো উল্লেখ নেই।
তালা ভেঙে ভেতরে ঢুকে একটি আলমারি পাওয়া যায়। আলমারিতে শিউলির নামে ফাইল। শেষ পাতায় লেখা—
‘আজ রাতে আবার আমাকে ডাকা হয়েছে।’
আর কিছু নেই।
ঘরের দেয়ালে কয়েকটি পুরোনো আঁচড়।
নিচে লেখা—
‘আলো নিভলে আমি একা নই।’
এরপর পাওয়া যায় একটি পুরোনো ছবি। ছবিতে শিউলি দাঁড়িয়ে আছেন সেই প্রভাবশালী কর্মকর্তার পাশে। পেছনে তৃতীয় তলার করিডর। ছবির পেছনে লেখা—
‘শেষ রাত।’
ছবিটি দেখেই তানভীর অস্বাভাবিক চুপ হয়ে যান। সেই রাতেই তিনি চাকরি ছেড়ে চলে যান। পরদিন তাঁর ড্রয়ারে পাওয়া যায় একটি ডায়েরি। শেষ পাতায় লেখা—
‘ওকে মেরে ফেলিনি। শুধু দরজাটা বন্ধ করেছিলাম।’
কোন দরজা—তার উত্তর কেউ পায় না।
তিন দিন পর রাতের নিরাপত্তাকর্মী মোস্তফা সিসিটিভিতে একজন নারীকে দেখতে পায়।
সময় ১০টা ১৭ মিনিট।
নারীটি তৃতীয় তলার পুরোনো ঘরের সামনে গিয়ে দাঁড়ায়।
দরজাটা নিজে থেকেই খুলে যায়।
পরদিন ঘরের ভেতরে পাওয়া যায় একজোড়া পুরোনো স্যান্ডেল।
সঙ্গে একটি কাগজ।
‘আমাকে যে বন্ধ করেছে, সে এখনো বেঁচে আছে।’
সেদিন রাতে নিরাপত্তাকর্মী রাকিব পুরোনো ছবিটা নিয়ে বসে ছিল।
হঠাৎ তার ফোনে অচেনা নম্বর থেকে একটি ছবি আসে।
পুরোনো সেই ছবি।
শিউলি, সেই কর্মকর্তা এবং পেছনে তৃতীয় তলার করিডর।
রাকিব ছবিটা বড় করে দেখে থমকে যায়।
ছবির এক কোণে একজন মানুষ দাঁড়িয়ে।
পোশাক দেখে মনে হচ্ছে—
রাকিব নিজেই।
সে ঘড়ির দিকে তাকায়।
১০টা ১৬ মিনিট।
ফোন আবার কেঁপে ওঠে।
আরেকটি ছবি।
এবার ছবিতে রাকিব নিজেই নিরাপত্তাকক্ষে বসে আছে।
অর্থাৎ কেউ এই মুহূর্তে তাকে ছবি তুলছে।
রাকিব ধীরে ধীরে পেছনে তাকায়।
ঘর খালি।
ঠিক ১০টা ১৭ মিনিটে আলো নিভে যায়।
অন্ধকারে একটি নারীকণ্ঠ শোনা যায়—
—রাকিব ভাই...
সে কোনো উত্তর দেয় না।
কণ্ঠটি এবার একেবারে কানের কাছে।
—আয়নাটা খুলে রেখেছেন কেন?
আলো জ্বলে ওঠে।
রাকিব নেই।
টেবিলের ওপর পড়ে আছে শুধু তার ফোন।
স্ক্রিনে সর্বশেষ ছবিটি খোলা।
ছবিতে তৃতীয় তলার বাথরুম।
সেখানে একটি আয়না লাগানো।
আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে শিউলি।
তার পাশে রাকিব।
আর তাদের পেছনে মিতা।
মিতার মুখে অদ্ভুত হাসি।
ছবির নিচে মাত্র একটি লাইন—
‘‘আমি যে আঁধারের বন্দিনী, আমারে আলোতে ডেকে নাও..নাও..নাও..’
লন্ডন, ১৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬