বাংলাদেশের সাবেক এসবি প্রধান মনিরুল ইসলামের সঙ্গে কথোপকথন

‘২০২৩ সালেই বুঝেছিলাম, পরিবর্তনের একটি ছক তৈরি হচ্ছে’

‘২০২৩ সালেই বুঝেছিলাম, পরিবর্তনের একটি ছক তৈরি হচ্ছে’

বাংলাদেশ প্রতিনিধি, ১৯ আগস্ট:

বাংলাদেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পেছনের ঘটনাপ্রবাহ নিয়ে নতুন করে নানা আলোচনা চলছে। সেই প্রেক্ষাপটে পুলিশের বিশেষ শাখার (এসবি) সাবেক প্রধান মনিরুল ইসলাম দাবি করেছেন, ২০২৩ সালেই তিনি সম্ভাব্য রাজনৈতিক পরিবর্তন এবং ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে ঘিরে একটি সরকার গঠনের সম্ভাবনা নিয়ে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে বিস্তারিত রিপোর্ট দিয়েছিলেন।

তাঁর দাবি, সেই প্রতিবেদনে সম্ভাব্য সরকারের কাঠামো এবং কয়েকজন সম্ভাব্য ব্যক্তির নামও ছিল। পরবর্তী সময়ে তাঁদের কেউ কেউ অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা, আবার কেউ বিভিন্ন কমিশনের গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পান।

এক সাক্ষাৎকারে সাংবাদিক মাসুদা ভাট্টির বিভিন্ন প্রশ্নের জবাবে এসব দাবি করেন মনিরুল ইসলাম। তাঁর বক্তব্যের আলোকে সাক্ষাৎকারটি প্রশ্নোত্তর আকারে সাজানো হয়েছে।

প্রশ্ন: ২০২৩ সালের মার্চে আপনি যে রিপোর্ট দিয়েছিলেন, সেখানে কী ধরনের পূর্বাভাস ছিল?

মনিরুল ইসলাম: সেখানে মূলত সম্ভাব্য একটি নতুন সরকারব্যবস্থা নিয়ে বিশ্লেষণ ছিল। ধারণা করা হয়েছিল, ২০২৪ সালের নির্বাচনকে ঘিরে বড় ধরনের রাজনৈতিক পরিবর্তনের চেষ্টা হতে পারে। এমনকি সম্ভাব্য সরকারে কারা থাকতে পারেন, সে সম্পর্কেও কিছু নাম উল্লেখ করা হয়েছিল।

পরবর্তী সময়ে দেখা গেছে, ওই তালিকায় থাকা কয়েকজন ব্যক্তি অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা হয়েছেন। কেউ কেউ বিভিন্ন কমিশনের চেয়ারম্যান বা সদস্য হয়েছেন। এ কারণে পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহের সঙ্গে পুরনো রিপোর্টের বেশ কিছু মিল আমি দেখতে পেয়েছি।

প্রশ্ন: সেই রিপোর্ট কি সরাসরি শেখ হাসিনার হাতে দিয়েছিলেন?

মনিরুল ইসলাম: হ্যাঁ। আমি সরাসরি তাঁর হাতে রিপোর্টটি দিয়েছিলাম। সেটি ছিল প্রায় সাত-আট পৃষ্ঠার একটি বিশ্লেষণধর্মী প্রতিবেদন। তিনি পুরো রিপোর্টটি পড়েছিলেন।

প্রশ্ন: রিপোর্ট পড়ার পর শেখ হাসিনার প্রতিক্রিয়া কী ছিল?

মনিরুল ইসলাম: রিপোর্টের একটি জায়গায় ড. মুহাম্মদ ইউনূসের প্রসঙ্গ ছিল। আমার ধারণা ছিল, বয়সের কারণে তিনি হয়তো সরাসরি নেতৃত্বে থাকবেন না; তাঁর পরিবর্তে অন্য কেউ নেতৃত্ব দিতে পারেন।

কিন্তু শেখ হাসিনা তখন আমাকে বলেন, ইউনূস নিজেই ক্ষমতার কেন্দ্রে থাকতে চাইবেন। তখন আমার কাছে বিষয়টি কিছুটা বিস্ময়কর লেগেছিল। কারণ ব্যক্তিগতভাবে ড. ইউনূসের সঙ্গে আমার কখনো দেখা বা কথা হয়নি।

পরবর্তী ঘটনাগুলো বিশ্লেষণ করতে গিয়ে ওই কথাটি আমার বারবার মনে হয়েছে।

প্রশ্ন: আপনার রিপোর্টে কি শুধু সরকার পরিবর্তনের সম্ভাবনার কথা ছিল, নাকি নির্বাচন নিয়েও কোনো আশঙ্কা ছিল?

মনিরুল ইসলাম: নির্বাচন নিয়ে স্পষ্ট আশঙ্কা ছিল। আমাদের বিশ্লেষণ ছিল—২০২৪ সালের নির্বাচনকে বাধাগ্রস্ত করার চেষ্টা হতে পারে এবং নির্বাচনকে সামনে রেখে অথবা নির্বাচনের পর বড় ধরনের পরিবর্তনের উদ্যোগ নেওয়া হতে পারে।

তবে শেষ পর্যন্ত নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এর আগে বিভিন্ন ধরনের রাজনৈতিক চাপ ও আন্দোলনের ঘটনাও ঘটেছে।

প্রশ্ন: ২০২৩ সালের ভিসা নিষেধাজ্ঞার বিষয়েও আপনি আগে রিপোর্ট করেছিলেন বলে জানিয়েছেন। সেখানে কী বলা হয়েছিল?

মনিরুল ইসলাম: যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা নিষেধাজ্ঞা ঘোষণার কয়েক দিন আগে আমরা একটি রিপোর্ট দিয়েছিলাম। সেখানে সম্ভাব্য পদক্ষেপ এবং কোন কোন দেশ এর সঙ্গে যুক্ত হতে পারে, সে বিষয়ে কিছু বিশ্লেষণ ছিল।

পরে ২০২৪ সালের দিকে পুরনো ড্রাফটটি উদ্ধার করে দেখি, সেখানে যে বিষয়গুলো অনুমান করা হয়েছিল, তার সঙ্গে পরবর্তী বাস্তবতার প্রায় ৯০ শতাংশের মতো মিল রয়েছে।

প্রশ্ন: তাহলে ২৮ অক্টোবর ২০২৩-এর বিএনপি-জামায়াতের সমাবেশকে আপনি কীভাবে দেখছেন?

মনিরুল ইসলাম: আমাদের পরবর্তী বিশ্লেষণে মনে হয়েছে, ২৮ অক্টোবরের ঘটনাকে একটি গুরুত্বপূর্ণ টার্গেট হিসেবে দেখা হয়েছিল। তখন পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে চলে আসায় যে পরিকল্পনার কথা আমরা ধারণা করেছিলাম, সেটি পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি।

এরপর নির্বাচন হয়ে যায়। নতুন সরকার গঠনের পর সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ে কিছুটা আত্মতুষ্টি বা আত্মতুষ্টির মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল।

প্রশ্ন: আপনি কি বলছেন, নির্বাচন হয়ে যাওয়ার পর সরকার রাজনৈতিক ঝুঁকিকে কম করে দেখেছিল?

মনিরুল ইসলাম: অনেকটা সে রকমই। একটা ধারণা তৈরি হয়েছিল যে, নির্বাচন হয়ে গেছে, ফলে সরকার অন্তত কিছু সময়ের জন্য নিরাপদ। আন্দোলন হলেও হয়তো কয়েক বছর পর, সরকারের শেষ দিকে গিয়ে বড় আন্দোলন হবে—বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এমন নজির রয়েছে।

এই আত্মতুষ্টিই পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহ বোঝার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ।

প্রশ্ন: আপনি ‘ডিপ স্টেট’-এর কথা বলেছেন। আপনার ব্যাখ্যায় এটি কী?

মনিরুল ইসলাম: ‘ডিপ স্টেট’ কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিষ্ঠান নয়। তবে আমার বিশ্লেষণ হলো, বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় ও রাজনৈতিক কাঠামোর ভেতরে ছড়িয়ে থাকা কিছু প্রভাবশালী গোষ্ঠী দীর্ঘমেয়াদে একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক পরিবর্তনের জন্য কাজ করতে পারে।

আমাদের পর্যবেক্ষণে, ২০১৮ সালের নির্বাচন এবং তার আগের ঘটনাগুলো থেকে একটি বিষয় স্পষ্ট হচ্ছিল—শুধু প্রচলিত রাজনৈতিক আন্দোলনের মাধ্যমে সরকার পরিবর্তন করা কঠিন।

প্রশ্ন: তাহলে ২০১৮ সালের ঘটনাগুলোকে আপনি কেন গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন?

মনিরুল ইসলাম: নিরাপদ সড়ক আন্দোলন এবং পরবর্তী কোটা আন্দোলনকে আমি দুটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হিসেবে দেখি। এগুলো সরকারকে বিভিন্ন সময়ে চাপে ফেলেছিল।

আমাদের বিশ্লেষণে তখন একটি ধারণা তৈরি হয়েছিল—যদি প্রচলিত রাজনৈতিক দলগুলোর মাধ্যমে সরকার পরিবর্তন সম্ভব না হয়, তাহলে তরুণ ও শিক্ষার্থীদের আন্দোলনকে কেন্দ্র করে বড় ধরনের পরিবর্তনের চেষ্টা করা হতে পারে।

প্রশ্ন: তাহলে ২০২৪ সালের ঘটনাকে কি আপনি দীর্ঘমেয়াদি কোনো পরিকল্পনার ফল হিসেবে দেখছেন?

মনিরুল ইসলাম: আমার কাছে ঘটনাগুলো বিচ্ছিন্ন মনে হয়নি। ২০১৮ সালের পর থেকে বিভিন্ন ঘটনা, আন্দোলন এবং রাজনৈতিক চাপকে একসঙ্গে বিশ্লেষণ করলে একটি ধারাবাহিকতা দেখা যায়।

তবে এটি আমার গোয়েন্দা বিশ্লেষণ ও পর্যবেক্ষণের ভিত্তিতে বলা কথা।

প্রশ্ন: ৫ আগস্টের আগে যদি রাষ্ট্রীয় গোয়েন্দা সংস্থাগুলো পরিস্থিতির আভাস পেয়ে থাকে, তাহলে এত দ্রুত রাষ্ট্রীয় কাঠামো ভেঙে পড়ল কেন?

মনিরুল ইসলাম: এটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। আমার মতে, এখানে শুধু রাজনৈতিক আন্দোলন দিয়ে বিষয়টি ব্যাখ্যা করা যাবে না।

রাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ভেতরে কী ধরনের অবস্থান তৈরি হয়েছিল, সেটিও দেখতে হবে। বিশেষ করে সেনাবাহিনীর মতো শক্তিশালী ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর ভেতরের অবস্থান গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিল।

প্রশ্ন: আপনি কি দাবি করছেন, সেনাবাহিনীর ভেতরেও একটি ‘ডিপ স্টেট’ কাজ করছিল?

মনিরুল ইসলাম: আমি বলছি, রাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ভেতরে অবসরপ্রাপ্ত ও কর্মরত ব্যক্তিদের একটি অংশের মধ্যে আলাদা ধরনের প্রভাব ও যোগাযোগ থাকতে পারে। সেনাবাহিনীও এর বাইরে নয়।

আমার পর্যবেক্ষণে, সরকারের আন্দোলন নিয়ন্ত্রণের যে পরিকল্পনা ছিল, সেটির বিরুদ্ধে প্রতিষ্ঠানের ভেতর থেকেই এক ধরনের প্রতিরোধ বা বাধা তৈরি হয়েছিল।

প্রশ্ন: ৫ আগস্টের পর এত বড় পরিবর্তন হলেও রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ কিছু শীর্ষ কর্মকর্তা কেন বহাল ছিলেন?

মনিরুল ইসলাম: এটিও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। প্রশাসনের বহু পর্যায়ে পরিবর্তন এসেছে। কিন্তু রাষ্ট্রের কিছু অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ পর্যায়ের নেতৃত্ব তুলনামূলকভাবে অক্ষত ছিল।

এ থেকে বোঝা যায়, পরিবর্তনটি শুধু রাস্তার আন্দোলনের ফল হিসেবে দেখলে পুরো চিত্র পাওয়া যাবে না। রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ শক্তির ভারসাম্যও এখানে বিবেচনায় নিতে হবে।

প্রশ্ন: আপনার বক্তব্যের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ কোনটি?

মনিরুল ইসলাম: আমার কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো—ঘটনাগুলো হঠাৎ করে শুরু হয়নি। ২০২৩ সালে আমরা যে রিপোর্ট করেছিলাম, সেখানে সম্ভাব্য পরিবর্তনের যে চিত্র আঁকা হয়েছিল, পরবর্তী অনেক ঘটনার সঙ্গে তার মিল পাওয়া গেছে।

আমি মনে করি, বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিবর্তন বুঝতে হলে শুধু ২০২৪ সালের ঘটনাকে সামনে রাখলে হবে না। এর আগের কয়েক বছরের রাজনৈতিক আন্দোলন, আন্তর্জাতিক চাপ, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের ভেতরের পরিবর্তন এবং বিভিন্ন পক্ষের ভূমিকা—সবকিছুকে একসঙ্গে দেখতে হবে।

প্রশ্ন: এখন পেছনে ফিরে তাকালে ২০২৩ সালের সেই রিপোর্টকে কীভাবে মূল্যায়ন করেন?

মনিরুল ইসলাম: তখন সেটি ছিল একটি সম্ভাব্য পরিস্থিতির বিশ্লেষণ। ভবিষ্যৎ শতভাগ নির্ভুলভাবে কেউ বলতে পারে না। কিন্তু পরবর্তী ঘটনাগুলোর সঙ্গে যখন পুরনো রিপোর্টের অনেক বিষয় মিলে যায়, তখন স্বাভাবিকভাবেই মনে হয়, আমরা কিছু গুরুত্বপূর্ণ সংকেত আগেই দেখতে পেয়েছিলাম।

বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাসে এই ঘটনাগুলোর পূর্ণাঙ্গ মূল্যায়ন হয়তো আরও পরে হবে।