বাংলাদেশ সংবাদ

চাকরির ফাঁদে কম্বোডিয়ায় তরুণদের পাচার, জিম্মি করে বাধ্য করা হতো অনৈতিক কাজে

চাকরির ফাঁদে কম্বোডিয়ায় তরুণদের পাচার, জিম্মি করে বাধ্য করা হতো অনৈতিক কাজে

বাংলাদেশ প্রতিনিধি, ১৯ আগস্ট:

খুলনায় উচ্চ বেতনের চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে তরুণদের কম্বোডিয়ায় পাচারের অভিযোগ উঠেছে একটি সংঘবদ্ধ চক্রের বিরুদ্ধে। অভিযোগ অনুযায়ী, কম্পিউটারভিত্তিক চাকরির কথা বলে বিদেশে নেওয়ার পর তাদের চীনা ও থাই অপরাধীচক্রের কাছে বিক্রি করে দেওয়া হতো। পরে জিম্মি করে অনলাইনে যৌন চ্যাটিং ও পর্নোগ্রাফিক কর্মকাণ্ডে বাধ্য করা হতো।

ভুক্তভোগীদের ভাষ্য, প্রতারকচক্রটি মাসে ৭০ হাজার থেকে এক লাখ টাকা বেতনের চাকরির কথা বলে তরুণদের আকৃষ্ট করত। বিদেশ যাওয়ার জন্য অনেকেই জমিজমা বিক্রি কিংবা ঋণ করে ৬ থেকে সাড়ে ৬ লাখ টাকা পর্যন্ত দেন দালালদের। কিন্তু কম্বোডিয়ায় পৌঁছানোর পরই তাদের সঙ্গে প্রতিশ্রুত চাকরির পরিবর্তে শুরু হয় ভয়াবহ নির্যাতন।

পাচারকারীরা বিমানবন্দর থেকে তরুণদের নিয়ে গিয়ে বিভিন্ন আস্তানায় আটকে রাখত বলে অভিযোগ। সেখানে তাদের ২ হাজার থেকে ৫ হাজার ডলারের বিনিময়ে চীনা ও থাই অপরাধীচক্রের কাছে বিক্রি করা হতো। পরে ফ্ল্যাট বা হোটেলে আটকে রেখে নির্দিষ্ট স্ক্রিপ্ট অনুযায়ী অনলাইনে নারীদের সঙ্গে যৌন কথোপকথনসহ বিভিন্ন আপত্তিকর কর্মকাণ্ডে বাধ্য করা হতো।

কাজ করতে অস্বীকৃতি জানালে নির্যাতনের শিকার হতে হতো বলে জানিয়েছেন দেশে ফেরা ভুক্তভোগীরা। মোস্তাকিম হাসান কাজী নামে এক তরুণের দাবি, তাকে বৈদ্যুতিক শক দেওয়া এবং দিনের পর দিন খাবার না দিয়ে আটকে রাখার মতো নির্যাতন করা হয়েছে। আরেক ভুক্তভোগী মনিরুল ইসলাম মুকুল জানিয়েছেন, ওই চক্রের হাত থেকে বের হতে হলে বিপুল অর্থ দিতে হতো।

ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, শুধু খুলনা নয়, দেশের বিভিন্ন এলাকার আরও তরুণ একই ধরনের প্রতারণার শিকার হয়েছেন। ২০২৫ সালের অক্টোবর থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত খুলনার বেশ কয়েকজন তরুণকে এভাবে কম্বোডিয়ায় নেওয়া হয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।

এ ঘটনায় দেশে ফিরে আসা অন্তত চারজন তরুণ খুলনার আদালতে মামলা করেন। তদন্তের দায়িত্ব নেয় পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। প্রযুক্তিগত তথ্য ও প্রাথমিক তদন্তের ভিত্তিতে ৩ আগস্ট ঢাকার সাভারের হেমায়েতপুর থেকে জিহাদ আলী লস্কর জজ ও তার স্ত্রী সুমাইয়া সুমিকে গ্রেফতার করা হয়।

পিবিআই খুলনার পুলিশ সুপার রেশমা শারমিন জানিয়েছেন, গ্রেফতার দুজন আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিয়েছেন এবং সেখানে কম্বোডিয়ায় তরুণদের পাচারের বিষয়টি স্বীকার করেছেন।

চাকরির নামে বিদেশে যাওয়ার প্রবণতাকে কাজে লাগিয়ে মানব পাচারকারীরা কীভাবে তরুণদের আন্তর্জাতিক অপরাধচক্রের হাতে তুলে দিচ্ছে, এই ঘটনা তার ভয়াবহ উদাহরণ। তাই বিদেশে চাকরির ক্ষেত্রে শুধু আকর্ষণীয় বেতন নয়—নিয়োগদাতা প্রতিষ্ঠান, ভিসার ধরন, চাকরির চুক্তি এবং সংশ্লিষ্ট রিক্রুটিং এজেন্সির বৈধতা যাচাই না করে অর্থ দেওয়া থেকে বিরত থাকা জরুরি।