বাংলাদেশ সংবাদ

৬ মাসে বিএনপির অভ্যন্তরীণ সংঘাতে নিহত ৩৯ নেতাকর্মী

৬  মাসে বিএনপির অভ্যন্তরীণ সংঘাতে নিহত ৩৯ নেতাকর্মী

বাংলাদেশ প্রতিনিধি, ১৯ আগস্ট: 

সরকার গঠনের প্রথম ৬ মাসেই বিএনপি ও দলটির বিভিন্ন অঙ্গসংগঠনের অভ্যন্তরীণ বিরোধ থেকে সংঘাত-সহিংসতার ঘটনা বেড়েছে। আধিপত্য বিস্তার, পদ-পদবি, স্থানীয় নির্বাচন, ব্যবসায়িক নিয়ন্ত্রণ ও উপদলীয় বিরোধকে কেন্দ্র করে এসব সংঘাতের কিছু ঘটনা প্রাণঘাতী রূপ নিয়েছে।

মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) তথ্য অনুযায়ী, গত ১৭ ফেব্রুয়ারি থেকে ১৭ আগস্ট পর্যন্ত বিএনপি ও এর অঙ্গসংগঠনের অন্তত ৩৯ নেতাকর্মী নিহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে বিএনপির ২১ জন, যুবদলের আট, স্বেচ্ছাসেবক দলের তিন, কৃষক দলের দুই, শ্রমিক দলের দুই, ছাত্রদলের দুই এবং তাঁতী দলের একজন রয়েছেন। একই সময়ে সংঘর্ষ ও পাল্টাপাল্টি হামলায় আহত হয়েছেন কয়েক শতাধিক মানুষ।

আসকের তথ্যের সঙ্গে সামগ্রিক রাজনৈতিক সহিংসতার চিত্রও উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে। মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির (এইচআরএসএস) হিসাবে, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত দেশে রাজনৈতিক দলীয় কোন্দল ও নির্বাচনি সহিংসতায় ৫৬ জন নিহত হয়েছেন। এ সময়ে ৮৩০টি রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনা ঘটে। এর প্রায় ৮১ শতাংশের সঙ্গে বিএনপির অভ্যন্তরীণ বিরোধ কিংবা বিএনপির সঙ্গে অন্য রাজনৈতিক দলের সংঘাত জড়িত ছিল।

কেন বাড়ছে সংঘাত

স্থানীয় পর্যায়ে রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠাকে কেন্দ্র করেই অধিকাংশ বিরোধের সূত্রপাত হচ্ছে বলে বিভিন্ন সূত্রের তথ্য। দলীয় কমিটিতে পদ পাওয়া, স্থানীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে প্রার্থী নির্ধারণ, হাট-বাজার ও পরিবহন টার্মিনালের নিয়ন্ত্রণ, টেন্ডার এবং চাঁদার ভাগাভাগি—এসব বিষয়ও সংঘাতের কারণ হিসেবে উঠে এসেছে।

কিছু ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত বিরোধ ও পুরোনো শত্রুতার সঙ্গে রাজনৈতিক পরিচয় যুক্ত হয়ে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে। কোথাও আবার প্রতিপক্ষকে দমাতে বাইরে থেকে লোক এনে হামলা বা হত্যার অভিযোগও তদন্তে উঠে এসেছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হকের মতে, রাজনৈতিক পদ-পদবি ও প্রভাব বিস্তারের প্রতিযোগিতা, দখল ও অর্থনৈতিক স্বার্থকে কেন্দ্র করে সংঘাত তৈরি হচ্ছে। এসব ঘটনা রাজনীতি সম্পর্কে সাধারণ মানুষের মধ্যে নেতিবাচক ধারণা তৈরি করতে পারে।

রাজধানী থেকে বিভিন্ন জেলায় প্রাণহানি

গত কয়েক মাসে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় বিএনপির নেতাকর্মীদের মধ্যে সংঘাতের একাধিক ঘটনা ঘটেছে।

গত ২৪ জুলাই রাজধানীর কাফরুলে গুলিতে যুবদলকর্মী ইউসুফ আলী নিহত হন। পুলিশ জানিয়েছে, স্থানীয় রাজনৈতিক বিরোধের জেরে যুবদল নেতা হাফিজুল ইসলাম বাবুকে হত্যার জন্য ভাড়াটে শুটার নিয়োগের অভিযোগের তদন্তে এ ঘটনা সামনে আসে।

১ জুলাই আদাবরে একটি সালিশ বৈঠকের সময় হামলায় গুরুতর আহত হন বিএনপি নেতা আবুল বাসার বাদশা ও সাদ্দাম হোসেন। পরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান বাদশা। পুলিশ বলছে, ঘটনার পেছনে স্থানীয় আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে বিরোধের বিষয়টি তদন্তে এসেছে।

এ ছাড়া সীতাকুণ্ডে ইউপি নির্বাচনে প্রার্থী হওয়াকে কেন্দ্র করে যুবদলকর্মী সজিব চৌধুরী হত্যার অভিযোগ, মৌচাকে চাঁদার ভাগাভাগি নিয়ে স্বেচ্ছাসেবক দলের সাবেক নেতা বিল্লাল হোসেন হত্যাসহ বিভিন্ন জেলায় দলীয় বিরোধে প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে।

সর্বশেষ ১৫ আগস্ট পুরান ঢাকার সদরঘাটে শ্রমিক দলের এক নেতার অনুসারীদের দুই পক্ষের সংঘর্ষে মিতুল নামে ২০ বছর বয়সী এক তরুণ নিহত হন। তিনি স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবক দলের কর্মী ছিলেন বলে জানা গেছে।

জুলাইয়েও সহিংসতা

এইচআরএসএসের হিসাবে, জুলাই মাসে দেশে ৪৫টি রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনা ঘটে। এসব ঘটনায় ছয়জন নিহত এবং ১৬৪ জনের বেশি আহত হন।

এর মধ্যে বিএনপির অভ্যন্তরীণ কোন্দলে ১৪টি ঘটনায় অন্তত ৪৮ জন আহত ও দুজন নিহত হন। বিএনপি-জামায়াত সংঘর্ষের ছয় ঘটনায় আহত হন ৪৪ জন। বিএনপি-এনসিপির সংঘর্ষের পাঁচ ঘটনায় ৩৮ জন এবং অন্যান্য দলের সঙ্গে সংঘর্ষের ১৪ ঘটনায় ১৬ জন আহত হন।

পুলিশের অবস্থান কঠোর

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বলছে, অপরাধের ক্ষেত্রে অভিযুক্ত ব্যক্তির রাজনৈতিক পরিচয় বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে না। পুলিশ সদর দপ্তরের পক্ষ থেকে মাঠপর্যায়ে রাজনৈতিক পরিচয় না দেখে তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশনা রয়েছে।

পুলিশ সদর দপ্তরের মুখপাত্র এআইজি শাহাদাত হোসাইন বলেছেন, রাজনৈতিক পরিচয় নয়, তথ্যপ্রমাণের ভিত্তিতে অপরাধীদের শনাক্ত করে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।

ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (ডিবি) শফিকুল ইসলামও জানিয়েছেন, অপরাধী যে দলেরই হোক, আইন অনুযায়ী তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

তবে রাজনৈতিক সংঘাতের সঙ্গে অবৈধ অস্ত্রের উপস্থিতি নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে। ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের সময় বিভিন্ন থানা ও পুলিশ স্থাপনা থেকে লুট হওয়া অস্ত্রের একটি অংশ এখনো উদ্ধার হয়নি। পুলিশের হিসাবে, ১ হাজার ৩২০টি অস্ত্র এখনও উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর আশঙ্কা, এসব অস্ত্র অপরাধীদের হাতে থেকে গেলে রাজনৈতিক বিরোধ আরও সহিংস হয়ে উঠতে পারে। ফলে দলীয় কোন্দল নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারের বিষয়টিও এখন নিরাপত্তা ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।