সিলেট সংবাদ

সিলেট বিভাগে ২০ দিনে ১৬ হত্যাকাণ্ড

সিলেট বিভাগে ২০ দিনে ১৬ হত্যাকাণ্ড

সিলেট প্রতিনিধি, ২০ আগস্ট:

সিলেট বিভাগে সাম্প্রতিক সময়ে একের পর এক হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় উদ্বেগ বাড়ছে। গত ২০ দিনে বিভাগের বিভিন্ন এলাকায় অন্তত ১৬টি হত্যাকাণ্ডে প্রাণ গেছে ১৬ জনের। এসব হত্যাকাণ্ডের পেছনে পারিবারিক বিরোধ, জমি নিয়ে বিরোধ, শিশুদের খেলাকে কেন্দ্র করে বিরোধ, প্রেমঘটিত দ্বন্দ্ব এবং ব্যক্তিগত শত্রুতার মতো কারণ সামনে এসেছে। কোনো কোনো ঘটনায় ঘাতক হিসেবে স্বজনের নামও এসেছে।

সবশেষ আলোচিত ঘটনা সিলেট নগরের রায়নগরে একই পরিবারের দুজন ও গৃহকর্মীসহ তিনজন হত্যাকাণ্ড। এর আগে ও পরে বিভাগের বিভিন্ন জেলায় আরও কয়েকটি হত্যার ঘটনা ঘটে।

রায়নগরে একই বাসায় তিন খুন

১২ আগস্ট সকালে সিলেট নগরের রায়নগর মিতালী আবাসিক এলাকার ১১১ নম্বর বাসা থেকে আব্দুস সাত্তার (৯০), তাঁর স্ত্রী সুরাইয়া বেগম (৭৬) এবং গৃহকর্মী তাহমিনা বেগমের (২৫) গলাকাটা মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ।

ঘটনার কয়েক ঘণ্টার মধ্যে বাবুল মিয়া (৪০) নামে এক রংমিস্ত্রিকে আটক করা হয়। পুলিশের প্রাথমিক বক্তব্য, গৃহকর্মী তাহমিনার সঙ্গে কথিত সম্পর্ক ও বিরোধের জেরে বাবুল তিনজনকে হত্যা করেন। তবে নিহতদের পরিবারের পক্ষ থেকে সম্পত্তি নিয়ে বিরোধের বিষয়টি সামনে আনা হয়েছে। ফলে হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত কারণ এখনো তদন্তাধীন।

বাবুলকে পরে গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতে হাজির করা হলে চার দিনের রিমান্ড মঞ্জুর হয়।

দিরাইয়ে দুই সন্তানকে পানিতে ফেলে হত্যা

১২ আগস্টই সুনামগঞ্জের দিরাইয়ে পারিবারিক বিরোধের জেরে দুই শিশুকে পানিতে ফেলে হত্যার অভিযোগ ওঠে। এ ঘটনায় কামরুল ইসলাম নামে এক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।

পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, পারিবারিক বিরোধের জেরে তিনি নিজের দুই সন্তানকে পানিতে ফেলে দেন। শিশু দুটির মৃত্যু ওই দিনই ঘটে।

গোয়াইনঘাটে ধর্ষণের অভিযোগ করায় বাবাকে কুপিয়ে হত্যা

১৫ আগস্ট দুপুরে সিলেটের গোয়াইনঘাট উপজেলার লাফনাউট দিঘিরপার গ্রামে কলিম উল্লাহ (৫০-এর বেশি বয়সী) নামে এক ব্যক্তি নিহত হন।

অভিযোগ, তাঁর মেয়েকে ধর্ষণের ঘটনায় থানায় অভিযোগ করায় তাঁকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। এ ঘটনায় নিহতের ভাইয়ের ছেলে আমির উদ্দিনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।

বড়লেখায় ইউপি সদস্য নিহত

১৫ আগস্ট মৌলভীবাজারের বড়লেখা উপজেলার পূর্ব শংকরপুর এলাকায় ইউপি সদস্য আবদুল হক (৫০) নিহত হন। স্থানীয় বিরোধের জেরে এ হত্যাকাণ্ড ঘটেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ঘটনাটিও ওই ২০ দিনের হত্যাকাণ্ডের তালিকায় রয়েছে।

তাহিরপুরে ফুটবল খেলাকে কেন্দ্র করে যুবক খুন

একই ১৫ আগস্ট সুনামগঞ্জের তাহিরপুর উপজেলার বালিয়াঘাট এলাকায় ফুটবল খেলা নিয়ে বিরোধের জেরে আল আমিন (৩৮) নামে এক যুবককে পিটিয়ে হত্যা করা হয়।

অর্থাৎ শিশু-কিশোরদের একটি খেলাকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া বিরোধ শেষ পর্যন্ত প্রাণঘাতী হামলায় গড়ায়।

দোয়ারাবাজারে বৃদ্ধ বাবাকে হত্যার অভিযোগ ছেলের বিরুদ্ধে

১৪ আগস্ট সুনামগঞ্জের দোয়ারাবাজার উপজেলার সোনাপুর গ্রামের নিজ ঘর থেকে মোহাম্মদ আলী (৭৫) নামে এক বৃদ্ধের মরদেহ উদ্ধার করা হয়।

পুলিশের দাবি, বিদেশে থাকা তাঁর ছেলে ইসমাইল মিয়া স্ত্রীকে ব্যবহার করে ভাড়াটে লোক দিয়ে বাবাকে হত্যা করিয়েছেন। এ ঘটনায় পুত্রবধূসহ তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

জৈন্তাপুরে স্ত্রীকে হত্যা

১১ আগস্ট সিলেটের জৈন্তাপুর উপজেলার নয়াগাত্তি গ্রামে জেসমিন বেগম (২৩) নিহত হন।

অভিযোগ, তাঁর স্বামী গোলাম রফিক তাঁকে হত্যা করেন। পারিবারিক বিরোধের জেরে এ হত্যাকাণ্ড ঘটে বলে জানা গেছে।

দক্ষিণ সুরমায় ঘর থেকে ডেকে নিয়ে যুবককে হত্যা

২৮ জুলাই রাত সাড়ে ১০টার দিকে সিলেটের দক্ষিণ সুরমা উপজেলার সিলাম ইউনিয়নের মুক্তারপুর গ্রামে বাতির আলী (৩০) নামে এক যুবককে ঘর থেকে ডেকে নিয়ে হত্যা করা হয়।

স্থানীয়দের বরাত দিয়ে জানা যায়, কয়েকজন যুবক তাঁকে বাড়ি থেকে ডেকে নিয়ে যাওয়ার পর হামলা চালায়। হত্যার কারণ নিয়ে তদন্ত হয়েছে।

ফুটবল খেলা নিয়ে স্কুলছাত্রকে হত্যা

২৭ জুলাই রাতে সিলেট নগরের কাজিরবাজার সেতুর দক্ষিণ প্রান্তে ফুটবল খেলাকে কেন্দ্র করে বিরোধের জেরে রিফাত আহমেদ (১৫) নামে এক স্কুলছাত্র নিহত হয়।

খেলার মতো একটি সাধারণ বিষয় কীভাবে কিশোরের প্রাণ কেড়ে নেওয়ার ঘটনায় পরিণত হলো, সেটিই ঘটনাটিকে আরও উদ্বেগজনক করে তুলেছে।

জমি নিয়ে বিরোধে সদর উপজেলায় যুবক নিহত

২৭ জুলাই সিলেট সদর উপজেলার হাটখোলা এলাকায় জমিসংক্রান্ত বিরোধের জেরে আবদুল্লাহ (২৫) নামে এক যুবককে হত্যা করা হয়।

জমি নিয়ে বিরোধকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষের একপর্যায়ে তাঁর ওপর হামলা চালানো হয় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

বিশ্বনাথে ধানখেত থেকে মরদেহ উদ্ধার

একই ২৭ জুলাই সিলেটের বিশ্বনাথ উপজেলার পাঠানেরগাঁও গ্রামের কাছে ধানখেত থেকে মকরম আলী (৬৮) নামে এক ব্যক্তির মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ।

তাঁকে কীভাবে হত্যা করা হয়েছে এবং হত্যার পেছনে কারা ছিল—তা নিয়ে তদন্তের কথা জানিয়েছে পুলিশ।

খুনের ঘটনায় স্বজনের সম্পৃক্ততা নিয়ে উদ্বেগ

সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোর একটি বড় দিক হলো—কয়েকটি হত্যাকাণ্ডে ঘাতক হিসেবে স্বজন, পরিবারের সদস্য বা পরিচিতজনের নাম উঠে এসেছে। কোথাও বাবা, কোথাও ভাই বা আত্মীয়, আবার কোথাও স্বামী কিংবা সন্তানকে ঘিরে অভিযোগ এসেছে।

সিলেটের নাগরিক সংগঠন সুশাসনের জন্য নাগরিক—সুজনের সিলেট সাধারণ সম্পাদক মিজানুর রহমানের মতে, আইনের যথাযথ প্রয়োগের অভাব এবং সামাজিক, পারিবারিক ও নৈতিক অবক্ষয় অপরাধ বাড়ার অন্যতম কারণ। তিনি সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধির ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন।

সিলেট মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত উপকমিশনার মো. মনজুরুল আলম জানিয়েছেন, রায়নগরের তিন খুনসহ মহানগরে সংঘটিত হত্যাকাণ্ডগুলোর তদন্ত চলছে এবং জড়িতদের গ্রেপ্তারে পুলিশ কাজ করছে।

হত্যাকাণ্ডের ধরনেই বাড়ছে উদ্বেগ

মাত্র ২০ দিনের ঘটনাপ্রবাহ বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এসব হত্যাকাণ্ডের পেছনে বড় কোনো একটি কারণ নেই। পারিবারিক কলহ থেকে সন্তান হত্যা, ধর্ষণের অভিযোগকে কেন্দ্র করে প্রতিশোধ, জমি নিয়ে বিরোধ, খেলাকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষ, দাম্পত্য কলহ এবং ব্যক্তিগত দ্বন্দ্ব—সবই প্রাণহানির কারণ হয়েছে।

সবচেয়ে উদ্বেগজনক হলো, অনেক ঘটনাতেই বিরোধ মীমাংসার আগেই তা সহিংসতায় রূপ নিয়েছে। ফলে সিলেট বিভাগে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির পাশাপাশি সামাজিক ও পারিবারিক সম্পর্কের অবনতির বিষয়টিও নতুন করে আলোচনায় এসেছে।

তবে ২০ দিনের ১৬ হত্যাকাণ্ডের হিসাবটি সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত ঘটনাভিত্তিক তথ্যের ওপর নির্ভরশীল। পুলিশ বা সরকারি কোনো একক সংস্থার আনুষ্ঠানিক সমন্বিত পরিসংখ্যান প্রকাশিত হলে মোট সংখ্যা ও প্রতিটি ঘটনার শ্রেণিবিন্যাস আরও নির্ভুলভাবে নির্ধারণ করা সম্ভব হবে।