বিশ্ব সংবাদ

সৌদি আরবের পাঠ্যবইয়ে মহানবী (সা.) ও ইহুদিদের সম্পর্কের নতুন পাঠ

সৌদি আরবের পাঠ্যবইয়ে মহানবী (সা.) ও ইহুদিদের সম্পর্কের নতুন পাঠ

বিশ্ব সংবাদ ডেস্ক, ১৯ আগস্ট: 

সৌদি আরবের পাঠ্যবইয়ে ধর্মীয় সহনশীলতা ও শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের ওপর গুরুত্ব বাড়ছে। একই সঙ্গে ইহুদি, খ্রিস্টান ও অন্যান্য ধর্মাবলম্বীদের সম্পর্কে অতীতের নেতিবাচক বা বৈষম্যমূলক উপস্থাপনার বেশ কিছু অংশ বাদ দেওয়া হচ্ছে। আন্তর্জাতিক শিক্ষা পর্যবেক্ষণ সংস্থা ইমপ্যাক্ট-এসইর পর্যালোচনায় সৌদি শিক্ষাক্রমে এমন পরিবর্তনের কথা উঠে এসেছে। সংস্থাটির সাম্প্রতিক পর্যালোচনায় ২০২৫-২৬ শিক্ষাবর্ষে প্রথম থেকে দ্বাদশ শ্রেণির ১৩৬টি পাঠ্যবই পরীক্ষা করা হয়েছে।

ইমপ্যাক্ট-এসইর তথ্য অনুযায়ী, সৌদি আরবের সাম্প্রতিক পাঠ্যক্রমে ইহুদি ও খ্রিস্টানদের সম্পর্কে আগের তুলনায় বেশি ভারসাম্যপূর্ণ ভাষা ব্যবহার করা হচ্ছে। উগ্রতা, বৈষম্য ও সহিংসতাকে উৎসাহিত করে এমন বক্তব্য বাদ দেওয়ার পাশাপাশি ভিন্ন ধর্ম ও সংস্কৃতির মানুষের সঙ্গে সংলাপ, সম্মান ও শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের বিষয়গুলো গুরুত্ব পাচ্ছে।

এই পরিবর্তনের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর সময়কার ইহুদি ও খ্রিস্টানদের সঙ্গে মুসলমানদের সম্পর্ককে একমাত্রিকভাবে না দেখানো। কারণ ইসলামের প্রাথমিক ইতিহাসে এই সম্পর্ক কখনো ছিল সহযোগিতা ও চুক্তির, কখনো ছিল প্রতিবেশীসুলভ সহাবস্থানের, আবার রাজনৈতিক ও সামরিক পরিস্থিতিতে কোথাও কোথাও সংঘাতেরও।

৬২২ খ্রিস্টাব্দে মদিনা শহরের একাংশ

মদিনায় ইহুদিদের সঙ্গে প্রথম সম্পর্ক ছিল চুক্তির

৬২২ খ্রিস্টাব্দে মহানবী (সা.) মক্কা থেকে মদিনায় হিজরত করার পর মদিনা ছিল বিভিন্ন গোত্র ও ধর্মীয় সম্প্রদায়ের আবাসস্থল। সেখানে মুসলমানদের পাশাপাশি উল্লেখযোগ্য ইহুদি জনগোষ্ঠীও বসবাস করত। বনু কাইনুকা, বনু নাদির ও বনু কুরাইজা ছিল মদিনার পরিচিত ইহুদি গোত্রগুলোর মধ্যে।

মদিনায় এসে মহানবী (সা.) বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে রাজনৈতিক ও সামাজিক সম্পর্ক নির্ধারণের জন্য একটি চুক্তিভিত্তিক ব্যবস্থা গড়ে তোলেন, যা ইতিহাসে ‘মদিনার সনদ’ নামে পরিচিত। আধুনিক গবেষণায় সনদের সুনির্দিষ্ট অংশগ্রহণকারী ও এর বিভিন্ন ধারার প্রকৃতি নিয়ে বিতর্ক থাকলেও, গবেষকেরা একমত যে মহানবীর মদিনার সমাজে ইহুদিদের সঙ্গে বিভিন্ন ধরনের চুক্তি ও নিরাপত্তা-ব্যবস্থা ছিল।

অর্থাৎ মহানবী (সা.)-এর মদিনা-জীবনের শুরুতেই ইহুদিদের সঙ্গে সম্পর্কের ভিত্তি ছিল না কেবল ধর্মীয় বিরোধিতা; বরং রাজনৈতিক সহাবস্থান, পারস্পরিক নিরাপত্তা ও চুক্তির বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ ছিল।

তবে পরে সম্পর্কের অবনতি ও সংঘাতও হয়েছিল

ইতিহাসকে অবশ্য এর পরের ঘটনাগুলো বাদ দিয়ে দেখলে তা অসম্পূর্ণ হবে। মদিনার কয়েকটি ইহুদি গোত্রের সঙ্গে মহানবী (সা.)-এর রাজনৈতিক সম্পর্ক পরবর্তী সময়ে অবনতির দিকে যায়। ঐতিহাসিক বর্ণনায় বনু কাইনুকা ও বনু নাদিরের মদিনা থেকে বহিষ্কারের কথা রয়েছে। অন্যদিকে বনু কুরাইজার ঘটনাটি খন্দকের যুদ্ধের সময়কার রাজনৈতিক ও সামরিক পরিস্থিতির সঙ্গে যুক্ত এবং এর বিবরণ নিয়ে ঐতিহাসিক গবেষণায় নানা মতভেদ রয়েছে।

তাই ইতিহাসের পাঠে ‘ইহুদিরা মহানবী (সা.)-এর শত্রু ছিল’—এমন একটি সাধারণীকরণ যেমন পুরো বাস্তবতাকে ধারণ করে না, তেমনি পরবর্তী সংঘাতের ঘটনাগুলো অস্বীকার করাও ইতিহাসসম্মত নয়।

মূল বিষয় হলো—সংঘাতের কারণ ছিল নির্দিষ্ট রাজনৈতিক, সামরিক ও চুক্তিগত পরিস্থিতি; কোনো একটি ধর্মীয় পরিচয়ের সব মানুষকে একই রাজনৈতিক চরিত্রে দেখানো ইতিহাসের যথার্থ পাঠ নয়।

খ্রিস্টানদের সঙ্গে আরেকটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা

মহানবী (সা.)-এর সঙ্গে খ্রিস্টানদের সম্পর্কের ইতিহাসেও এমন একটি ঘটনা রয়েছে, যা ধর্মীয় সহাবস্থানের আলোচনায় বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।

মদিনায় মহানবী (সা.)-এর কাছে নাজরানের এক খ্রিস্টান প্রতিনিধিদল এসেছিল। ইসলামী ঐতিহ্য ও পরবর্তী ঐতিহাসিক গবেষণায় এ প্রতিনিধিদলের সঙ্গে মহানবীর ধর্মীয় আলোচনা, মতবিনিময় এবং পরবর্তী চুক্তির কথা উল্লেখ করা হয়েছে। ২০২৬ সালে প্রকাশিত একটি গবেষণাতেও নাজরানের খ্রিস্টান প্রতিনিধিদলের সাক্ষাৎকে মহানবীর যুগের গুরুত্বপূর্ণ মুসলিম-খ্রিস্টান সংলাপ হিসেবে পর্যালোচনা করা হয়েছে।

সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বর্ণনাগুলোর একটি হলো—খ্রিস্টান প্রতিনিধিদল মদিনায় এসে মহানবী (সা.)-এর মসজিদে তাদের প্রার্থনার সময় উপস্থিত হলে তিনি তাদের প্রার্থনা করতে দেন। এই ঘটনার বর্ণনা ইবনে ইসহাকের সীরাত-ঐতিহ্যেও পাওয়া যায় এবং আধুনিক গবেষণাতেও ঘটনাটি আলোচিত হয়েছে।

ধর্মীয় মতের পার্থক্য থাকা সত্ত্বেও আলোচনার পথ বন্ধ হয়নি। বরং নাজরানের খ্রিস্টানদের সঙ্গে পরবর্তী সময়ে একটি চুক্তির কথাও ইসলামী ঐতিহাসিক সূত্রে পাওয়া যায়, যেখানে তাদের ধর্মীয় ও সামাজিক নিরাপত্তার বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত ছিল। চুক্তিটির বিভিন্ন বর্ণনা ও দলিলের ঐতিহাসিক নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে গবেষকদের মধ্যে বিতর্ক আছে; তবে নাজরান প্রতিনিধিদলের সঙ্গে মহানবীর সাক্ষাৎ ও আলোচনার ঐতিহাসিক সূত্র একাধিক ধারায় পাওয়া যায়।

ধর্মীয় পার্থক্য মানেই শত্রুতা নয়

মহানবী (সা.)-এর যুগের ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা সম্ভবত এখানেই। ইহুদি ও খ্রিস্টানরা ইসলামী পরিভাষায় ‘আহলে কিতাব’—অর্থাৎ পূর্ববর্তী ঐশী ধর্মগ্রন্থের অনুসারী। ফলে তাদের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে ধর্মীয় মতভেদ থাকলেও সবসময় তা যুদ্ধ বা শত্রুতার সমার্থক ছিল না।

মদিনায় ইহুদিদের সঙ্গে চুক্তি হয়েছে, আবার কোনো কোনো গোত্রের সঙ্গে রাজনৈতিক সংঘাতও হয়েছে। খ্রিস্টানদের সঙ্গে ধর্মতাত্ত্বিক বিতর্ক হয়েছে, আবার তাদের সঙ্গে শান্তিচুক্তিও হয়েছে। অর্থাৎ মহানবী (সা.)-এর সময়কার মুসলিম-ইহুদি ও মুসলিম-খ্রিস্টান সম্পর্ক ছিল বহুমাত্রিক।

এই ইতিহাসকে এক কথায় ‘বন্ধুত্ব’ কিংবা ‘শত্রুতা’—কোনোটিতেই সীমাবদ্ধ করা যায় না।

৬২২ সালের মদিনার চিত্র যাদুঘরের সৌজন্যে

সৌদি পাঠ্যবইয়ে ভাষার পরিবর্তন

এই ঐতিহাসিক বাস্তবতার আলোকে সৌদি আরবের পাঠ্যবইয়ের সাম্প্রতিক পরিবর্তনটি তাৎপর্যপূর্ণ। ইমপ্যাক্ট-এসই বলছে, সৌদি শিক্ষাক্রমে ইহুদি, খ্রিস্টান ও অন্যান্য ধর্মাবলম্বীদের নিয়ে পুরোনো কিছু নেতিবাচক ও বৈষম্যমূলক উপস্থাপনা কমানো হয়েছে। একই সঙ্গে শান্তি, সহনশীলতা ও ‘অন্যের’ প্রতি সম্মানের ওপর গুরুত্ব বাড়ানো হয়েছে।

ইসরায়েল ও ফিলিস্তিন প্রসঙ্গেও ভাষাগত পরিবর্তনের কথা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। আগের কিছু পাঠ্যবইয়ে ব্যবহৃত ‘ইহুদিবাদী শত্রু’ ধরনের শব্দের পরিবর্তে ‘ইসরায়েলি দখলদার’ শব্দবন্ধ ব্যবহারের কথা বলা হয়েছে। তবে পাঠ্যবইয়ের মানচিত্রে ইসরায়েলকে আলাদা রাষ্ট্র হিসেবে দেখানোর বিষয়টি এখনও পরিবর্তিত হয়নি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে।

এই পরিবর্তনকে শুধু সৌদি আরবের শিক্ষানীতির সংস্কার হিসেবে দেখলে এর গুরুত্ব হয়তো পুরোপুরি বোঝা যাবে না। এর মধ্যে একটি বড় প্রশ্নও রয়েছে—ধর্মীয় ইতিহাসকে কি রাজনৈতিক শত্রুতার ভাষায় পড়ানো হবে, নাকি ইতিহাসের ভালো-মন্দ, সংঘাত-সহাবস্থান—সবকিছুকে প্রেক্ষাপটসহ তুলে ধরা হবে?

মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর জীবন ও মদিনার সমাজের ইতিহাস বলছে, ধর্মীয় ভিন্নতা থাকা সত্ত্বেও চুক্তি, সংলাপ, প্রতিবেশীসুলভ সম্পর্ক এবং পারস্পরিক নিরাপত্তার জায়গা তৈরি করা সম্ভব ছিল। একই সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা, রাজনৈতিক বিরোধ ও যুদ্ধের ঘটনাও ইতিহাসের অংশ।

তাই ইতিহাসের সত্যকে আড়াল না করে তার পূর্ণাঙ্গ রূপ তুলে ধরাই হতে পারে সহনশীলতার সবচেয়ে শক্তিশালী শিক্ষা। কারণ মানুষকে ‘শত্রু’ হিসেবে শেখানোর চেয়ে তার ধর্মীয় পরিচয়, রাজনৈতিক ভূমিকা ও ব্যক্তিগত আচরণ—এই তিনটিকে আলাদা করে দেখতে শেখানোই ইতিহাসের অধিকতর দায়িত্বশীল পাঠ।