কলিকালের কলধ্বনি–৪৮।। গেলো গেলো দেশটা, এবার পুরো রসাতলে গেলো

কলিকালের কলধ্বনি–৪৮।। গেলো গেলো দেশটা, এবার পুরো রসাতলে গেলো

কলিকালের কলধ্বনি–৪৮

গেলো গেলো দেশটা, এবার পুরো রসাতলে গেলো।

উৎসর্গ

একজন নিবেদিত নেতা ও সমাজসেবী, যিনি ন্যায়ের পথে লড়তেন এবং অন্যের জন্য বেঁচে থাকতেন। তাঁর অকাল মৃত্যু আমাদের শোক দান করেছে, কিন্তু আদর্শ ও স্মৃতি চিরকাল অনুপ্রাণিত করবে।

ওসমান হাদীকে শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা—চিরকাল।

আমাদের ছেড়ে আসা প্রিয় দেশটা কি সত্যিই আর আগের মতো আছে? নাকি আমরা ধীরে ধীরে এমন এক খাদে নামছি, যেখানে মৃত্যু, আবেগ, গুজব আর পরিকল্পিত সহিংসতা একাকার হয়ে যাচ্ছে?

মাত্র দুদিন আগে ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক ওসমান হাদীর মৃত্যুর খবরে যেভাবে সারা দেশে মহাতাণ্ডব ঘটে গেল, তা দেখে মনে হলো—এই দেশটাকে দেখাশোনার জন্য কি আদৌ কোনো সরকার আছে? নেই কোনো আইন-কানুন? নেই পুলিশ বা সেনাবাহিনী?

হ্যাঁ, সবাই আছে বটে।
কিন্তু তারা এসেছে ঠিক বাংলা সিনেমার পুলিশের মতো—সবকিছু শেষ হয়ে যাওয়ার পর।

এমনকি প্রধান উপদেষ্টা ফোন করে প্রথম আলোডেইলি স্টার-এর সম্পাদকদ্বয়কে বলেছেন, “তিনি দেখবেন।” প্রশ্ন হলো—দুটি সংবাদপত্রের অফিস ভাঙচুর হয়ে যাওয়ার পর, তথ্য-উপাত্ত পুড়ে যাওয়ার পর, আর দেখার বা করার কী থাকে?

ওসমান হাদীর মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ার পর যে দৃশ্য দেশজুড়ে দেখা গেল, তাকে আর বিচ্ছিন্ন ঘটনা বলা কঠিন। প্রথমে ঢাকা, তারপর একে একে জেলা—ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ, হামলা। প্রশ্ন উঠছে, এই ধ্বংসযজ্ঞ কি সত্যিই স্বতঃস্ফূর্ত? নাকি এর পেছনে আছে সুপরিকল্পিত কোনো নকশা?

কারণ হাদীর যে বাঁচার সম্ভাবনা নেই, সেটা ঢাকার ডাক্তাররাই বুঝেছিলেন। তারপরও সাতদিন সিঙ্গাপুরে রেখে শেষ চেষ্টা করা হয়েছে—যাতে কারও আক্ষেপ না থাকে। কিন্তু হাদীর মৃত্যুর খবর দেশে পৌঁছানোর পর যেভাবে এক শ্রেণির মানুষ মহাতাণ্ডব নৃত্যে নেমে সবকিছু ভাঙচুর শুরু করল, তা নজিরবিহীন।

মব তৈরি করে জ্বালিয়ে দেওয়া হলো উদীচীছায়ানট, ধানমন্ডির ৩২ নম্বর যাদুঘর। প্রশ্ন হচ্ছে—সংবাদপত্র অফিস, সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলো বা ইতোমধ্যে পুড়িয়ে দেয়া ‘বঙ্গবন্ধু যাদুঘর‘ হাদীর মৃত্যুর সঙ্গে কীভাবে জড়িত?

হাদীকে যে গুলি করেছে, সেই ফয়সল তো হাদীর সঙ্গেই ছিল। হাদীর নির্বাচনী কাজ করার জন্য ফয়সল তার সঙ্গে যোগাযোগ করে তার আশপাশেই অবস্থান করছিল। ফয়সল হাদীকে গুলি করে মাত্র ১২ ঘণ্টার মধ্যে দেশ ছেড়ে ভারতে পালিয়ে গেল—এটা কীভাবে সম্ভব? 

এর দায় কার?
সরকারের, পুলিশের, গোয়েন্দা সংস্থার।
সংবাদপত্র অফিস বা সাংস্কৃতিক সংগঠনের দায় এখানে কোথায়? 

এই অস্থিরতার প্রথম মঞ্চ ছিল ঢাকা।

কারওয়ান বাজারে দেশের দুটি শীর্ষ গণমাধ্যম—প্রথম আলোডেইলি স্টার–এর অফিসে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ। গণতন্ত্রের স্তম্ভ হিসেবে পরিচিত সংবাদমাধ্যমই যদি নিরাপদ না থাকে, তাহলে বাকিদের অবস্থান কোথায়?

এরপর ধানমন্ডির ছায়ানট ভবন—বাংলা সংস্কৃতির এক ঐতিহাসিক প্রতীক—সেখানে হামলা ও ব্যাপক ভাঙচুর। একই এলাকায় ধানমন্ডি ৩২ নম্বর বাড়িতে পুনরায় ভাঙচুর। সন্ধ্যার পর উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীর কার্যালয়ে অগ্নিসংযোগ।

লক্ষ করলে দেখা যায়—
নিশানায় ছিল গণমাধ্যম,
নিশানায় ছিল সংস্কৃতি,
নিশানায় ছিল ইতিহাস।

তালিকাটা পড়লেই একটি বিষয় স্পষ্ট হয়—এগুলো আবেগের বিস্ফোরণ নয়, বরং লক্ষ্যভিত্তিক ভাঙচুর।

তাহলে প্রশ্নটা এড়ানো যায় না।

ওসমান হাদীর মৃত্যু নিঃসন্দেহে একটি গুরুতর, দুঃখজনক এবং তদন্তসাপেক্ষ ঘটনা। কিন্তু এই মৃত্যুর সঙ্গে গণমাধ্যম অফিসে আগুন, সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানে হামলা, কূটনৈতিক স্থাপনায় ঢিল, রাজনৈতিক কার্যালয় গুঁড়িয়ে দেওয়ার সম্পর্কটা কোথায়?

ন্যায়বিচারের দাবিতে আন্দোলন হলে চাপ দেওয়া হয় আদালত, তদন্ত সংস্থা ও রাষ্ট্রীয় কাঠামোর ওপর।
কিন্তু এখানে চাপ দেওয়া হলো সংস্কৃতি, সংবাদমাধ্যম, ইতিহাস ও কূটনীতির ওপর।

তাহলে কি এটি ফেব্রুয়ারির নির্বাচন বানচালের একটি মেটিকুলাস ডিজাইন?

এই প্রশ্নটি অস্বস্তিকর, কিন্তু অপ্রয়োজনীয় নয়।

দেশ যখন নির্বাচনের পথে, তখন এমন সর্বব্যাপী অস্থিরতা—
আইনশৃঙ্খলার ভাঙন,
আন্তর্জাতিক উদ্বেগ,
রাষ্ট্রীয় স্থিতিশীলতার প্রশ্ন—

সব মিলিয়ে কি একটি বার্তা দেওয়া হচ্ছে না যে, এই দেশে এখন নির্বাচন সম্ভব নয়?

হাদীর মৃত্যু যদি হয় ট্রিগার, তবে পরবর্তী ভাঙচুরগুলো কি সেই ট্রিগারকে ব্যবহার করে বড় কোনো রাজনৈতিক অঙ্ক কষার চেষ্টা নয়?
এটি কি একটি রিহার্সাল—যেখানে একটি আবেগঘন হত্যাকাণ্ডকে কেন্দ্র করে পুরো দেশটাকেই অচল করে দেওয়ার মহড়া চলছে?

আজ যে আগুন অন্যের অফিসে জ্বলছে, কাল তা কার দরজায় যাবে—কেউ জানে না।
রাষ্ট্র যখন আবেগের কাছে আত্মসমর্পণ করে, তখন যুক্তি নির্বাসিত হয়।
আর যুক্তি নির্বাসিত হলে দেশ ধীরে ধীরে রসাতলে নামে।

হাদীর মৃত্যু ন্যায়বিচার চায়—ধ্বংস নয়।
দেশ চায় স্থিতি—রিহার্সাল নয়।

প্রশ্ন হলো—আমরা কি সত্য খুঁজব?
নাকি পরিকল্পিত ধ্বংসযজ্ঞের নীরব দর্শক হয়ে থাকব?

দেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, সরকার—সবকিছু আছে বলে আর মনে হয় না। তাই ভাবতে কষ্ট হয়, এই দেশ কি একদা আমার দেশ ছিল? আরও কষ্ট হয়, একদা এই দেশেই জন্মেছিলাম।

ভাবতে কষ্ট হয়—এই দেশের মানুষ এখন তুচ্ছ কারণে জীবন্ত মানুষকে পুড়িয়ে মারে।
ভাবতে কষ্ট হয়—মাত্র বিশ টাকার জন্য একজন মানুষ আরেকজনকে খুন করে ফেলতে পারে।

দেশটা চোখের সামনেই রসাতলে চলে গেল।
আর কিছু বাকি রইল বলে মনে হয় না।  নিজের জন্মদাত্রী মা মারা গেছেন এক যুগ আগে। অনেক কষ্টে মনটাকে প্রবোধ দিয়ে রাখছি এক যুগ ধরে। কিন্তু মায়ের পর, মাতৃভূমির এই রসাতলে যাওয়ার দু:খ রাখি কোথায়?

লেখক: সম্পাদক, কলামিস্ট, বিশ্লেষক, সাবেক অধ্যাপক

লন্ডন, ২০ ডিসেম্বর, ২০২৫