ভাঙা স্বপ্ন আর উত্তাল সাগর: বাংলাদেশিসহ গ্রিস উপকূলে মৃত্যুর মুখ থেকে উদ্ধার ৫৪০ অভিবাসী

ভাঙা স্বপ্ন আর উত্তাল সাগর: বাংলাদেশিসহ গ্রিস উপকূলে মৃত্যুর মুখ থেকে উদ্ধার ৫৪০ অভিবাসী

ইউরোপ ডেস্ক, ২০ ডিসেম্বর :  লিবীয় সাগরের উত্তাল ঢেউয়ের মাঝে, একটি জীর্ণ মাছধরা নৌকায় গাদাগাদি করে বসে ছিলেন শত শত মানুষ। চোখে ছিল ইউরোপের স্বপ্ন, মনে ছিল অনিশ্চিত আগামীর ভয়। শুক্রবার রাতে গ্রিসের দক্ষিণাঞ্চলীয় দ্বীপ গাভদোসের কাছে সেই নৌকাটিই হয়ে উঠেছিল ৫৪০ মানুষের জীবন-মরণ পরীক্ষার মঞ্চ।

গ্রিক কোস্ট গার্ড জানায়, ১৯ ডিসেম্বর গাভদোস দ্বীপ থেকে প্রায় ১৬ নটিক্যাল মাইল দূরে নৌকাটি প্রথম শনাক্ত করে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সীমান্ত সংস্থা ফ্রন্টেক্সের একটি টহল জাহাজ। এরপর কোস্ট গার্ড, ফ্রন্টেক্স ও বাণিজ্যিক জাহাজ মিলিয়ে শুরু হয় দীর্ঘ ও ঝুঁকিপূর্ণ উদ্ধার অভিযান। শেষ পর্যন্ত মৃত্যুকে ফাঁকি দিয়ে সবাই বেঁচে ফিরেছেন—এটাই আপাতত স্বস্তির খবর।


উদ্ধার হওয়া অভিবাসীদের মধ্যে রয়েছেন বাংলাদেশ, মিসর ও পাকিস্তানের নাগরিকরা। এ ছাড়া ইরিত্রিয়া, সোমালিয়া, সুদান ও ফিলিস্তিনের মানুষও ছিলেন ওই নৌকায়। সবাইকে সুস্থ অবস্থায় উদ্ধার করে ক্রিট দ্বীপের আগিয়া গালিনি বন্দরে নেওয়া হয়েছে। এখন তাঁরা রেথিমনো শহরের একটি অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্রে, যেখানে চলছে স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও রাজনৈতিক আশ্রয়ের আবেদন প্রক্রিয়া।


কিন্তু এই উদ্ধারকাহিনির পেছনে লুকিয়ে আছে আরও নির্মম বাস্তবতা। উদ্ধারকৃতদের ভাষ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ, মিসর ও সুদানের অনেক অভিবাসীই ইউরোপে পৌঁছানোর আশায় পাচারকারী চক্রকে জনপ্রতি দুই থেকে পাঁচ হাজার ইউরো পর্যন্ত দিয়েছেন। কারও বিক্রি হয়েছে শেষ সম্বল, কারও জমি, কারও বা পরিবার এখন ঋণের বোঝায় জর্জরিত—সবই এক টুকরো নিরাপদ জীবনের আশায়।


গ্রিক কর্তৃপক্ষ বলছে, লিবিয়ার পূর্বাঞ্চলীয় শহর তোব্রুক থেকে পরিচালিত পাচারকারী চক্রগুলো এখন গাভদোস রুটকে বেশি ব্যবহার করছে। পরিসংখ্যান আরও উদ্বেগজনক—চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসেই ক্রিট ও গাভদোসে পৌঁছেছেন সাত হাজার ৩০০-এর বেশি অভিবাসী, যা গত বছরের পুরো সংখ্যাকেও ছাড়িয়ে গেছে।


এই প্রেক্ষাপটে গ্রিসের প্রধানমন্ত্রী কিরিয়াকোস মিতসোটাকিস জানিয়েছেন, ২০২৬ সালের মাঝামাঝি থেকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের নতুন অভিবাসন চুক্তি কার্যকর হবে। এতে আশ্রয়ের আবেদন বাতিল হলে দ্রুত নিজ দেশে ফেরত পাঠানোর বিষয়টি গুরুত্ব পাবে।
তবু প্রশ্ন থেকে যায়—দারিদ্র্য, যুদ্ধ, নিপীড়ন আর অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ থেকে পালিয়ে আসা এই মানুষগুলোর জন্য কি সত্যিই কোথাও নিরাপদ আশ্রয় আছে? লিবীয় সাগরের সেই রাতের মতোই, তাদের জীবনের পথ এখনো অন্ধকার ও ঢেউয়ে ভরা।