বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো সচিবের প্রশ্ন: ‘আমাকে সরিয়ে দেশ-জাতির কী অর্জন হলো?’
ভয়েস অব পিপল ডেস্ক, ২১ ফেব্রুয়ারি: অন্তর্বর্তী সরকারের সময় বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সাবেক সচিব সাঈদ মাহমুদ বেলাল হায়দার নিজের জীবনের কঠিন বাস্তবতা তুলে ধরে প্রশ্ন তুলেছেন—“আমাকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠিয়ে দেশ ও জাতির কী অর্জন হলো?”
সরকারের সচিব হিসেবে পদোন্নতি পাওয়ার মাত্র আট মাসের মাথায় তাকে অবসরে পাঠানো হয়। এরপর থেকে তিনি বেকার, আর্থিক সংকটে জর্জরিত এবং অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। প্রায় আঠারো মাস পর, ‘প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূস সরকার’-এর বিদায়ের পর বুধবার (১৮ ফেব্রুয়ারি) নিজের ফেসবুকে একটি দীর্ঘ স্ট্যাটাস দিয়ে তিনি ক্ষোভ ও বেদনা প্রকাশ করেন।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের মেরিন সায়েন্স বিভাগ থেকে প্রথম শ্রেণিতে প্রথম স্থান অর্জনকারী এই কর্মকর্তা ১৩তম বিসিএসে উত্তীর্ণ হয়ে ১৯৯৪ সালে প্রশাসনে যোগ দেন। রাজশাহীতে কর্মজীবন শুরু করে কুমিল্লায় ম্যাজিস্ট্রেট, কক্সবাজার সদর উপজেলার ইউএনও, চকরিয়া ও টেকনাফে সহকারী কমিশনার (ভূমি) হিসেবে মাঠ প্রশাসনে দায়িত্ব পালন করেন। পরে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের উপসচিব, বাংলাদেশ সমুদ্র গবেষণা ইনস্টিটিউটের মহাপরিচালক এবং বাংলাদেশ মৎস্য উন্নয়ন কর্পোরেশনের চেয়ারম্যান হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।
সর্বশেষ তিনি মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সচিব পদে উন্নীত হন। কিন্তু মাত্র আট মাসের মাথায় তাকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়—যা নিয়ে তিনি ফেসবুকে লিখেছেন:
“স্যার, আপনি নির্দয় ও নিষ্ঠুরভাবে আমার মতো একজন নিরীহ কর্মচারীর ওপর জুলুম করেছেন। এক কলমের খোঁচায় আমার রিজিক কেড়ে নিয়েছেন। সামাজিক মর্যাদা, পারিবারিক মান-সম্মান এবং আর্থিকভাবে চরম ক্ষতিগ্রস্ত করেছেন। যে সময়ে দেশের জন্য অভিজ্ঞতা উজাড় করে কাজ করার কথা ছিল, সে সময়টাতে নেমে এসেছে অন্ধকার, হতাশা, যন্ত্রণা আর বেকারত্বের দমবন্ধ করা সময়। আমাকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠিয়ে কারো প্রতিহিংসা চরিতার্থ করা ছাড়া দেশ-জাতির কী অর্জিত হলো?”
তিনি আরও লিখেছেন—
“অতৃপ্ত আত্মার দীর্ঘশ্বাস নিয়ে আপনাকে অভিশাপ দিলাম। বিচারের ভার ছেড়ে দিলাম প্রকৃতির ওপর। প্রকৃতি একদিন তার আপন নিয়মেই বিচার করবে।”
স্ট্যাটাসের সঙ্গে তিনি শেয়ার করেছেন বাংলাদেশ প্রতিদিনের একটি ফটোকার্ড, যেখানে নোবেল বিজয়ী প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূসের ছবি দিয়ে লেখা—“দরিদ্র বাড়িয়ে বিদায় দারিদ্র্যের জাদুকরের।” পোস্টটিতে অনেকেই মন্তব্য করেছেন প্রফেসর ইউনূসের সমালোচনামূলক বক্তব্য দিয়ে।
এ বিষয়ে কালের কণ্ঠের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে সাঈদ মাহমুদ বেলাল বলেন,
“আমি শুধু প্রশাসক নই—একজন স্বীকৃত সমুদ্রবিজ্ঞানীও। আন্তর্জাতিক জার্নালে আমার ২০টি গবেষণা প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে। সামুদ্রিক সম্পদ, উপকূলীয় ব্যবস্থাপনা ও নীল অর্থনীতি নিয়ে আমার গবেষণা নীতিনির্ধারণী পর্যায়েও গুরুত্ব পেয়েছে।”
তিনি জানান, সচিব পর্যায়ে গিয়ে দেশের জন্য কাজ করার সুযোগ সবচেয়ে বেশি থাকে। কিন্তু মাত্র আট মাসের মধ্যে সেই সুযোগ থেকে তাকে বঞ্চিত করা হয়েছে।
চাকরি হারানোর পর তার পরিবারও কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি। স্কুল-কলেজে পড়ুয়া সন্তানদের লেখাপড়ার খরচ, ঢাকায় বাড়ি ভাড়া—সব মিলিয়ে জীবনযাপন কঠিন হয়ে পড়েছে। তিনি দাবি করেন, চাকরিজীবনে তার বিরুদ্ধে কোনো বিভাগীয় অভিযোগ, শোকজ নোটিশ বা দুর্নীতির অভিযোগ কখনোই ছিল না। তিনি একজন বীর মুক্তিযোদ্ধার সন্তান।
তার প্রশ্ন—
“একজন নির্দোষ, অভিজ্ঞ, গবেষণামুখী কর্মকর্তাকে সরিয়ে দিয়ে রাষ্ট্র আসলে কী পেল?”