যুক্তরাজ্যে অভিবাসীদের নতুন নিয়ম: ভাতা নিলে স্থায়ী হতে সময় বাড়তে পারে ২০ বছর

যুক্তরাজ্যে অভিবাসীদের নতুন নিয়ম: ভাতা নিলে স্থায়ী  হতে সময় বাড়তে পারে ২০ বছর

ভয়েস অব পিপল রিপোর্ট,  ২০ ফেব্রুয়ারি:  যুক্তরাজ্যে কর্মরত অভিবাসী পরিবারগুলো গুরুত্বপূর্ণ কর্মভিত্তিক ভাতা ছেড়ে দিতে বাধ্য হতে পারেন, যাতে সরকার ঘোষিত কঠোর অভিবাসন নীতির আওতায় “শাস্তি” এড়ানো যায়—এমন আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন বিশেষজ্ঞরা।

বর্তমানে যুক্তরাজ্যে বৈধভাবে বসবাসকারী দুই লক্ষাধিক মানুষ ১০ বছরের ‘সেটেলমেন্ট রুটে’ রয়েছেন। এ ব্যবস্থায় স্থায়ী বসবাসের অনুমতি (Indefinite Leave to Remain বা ILR) পেতে হলে ৩০ মাস মেয়াদি ভিসা চারবার নবায়ন করতে হয়। প্রতিবার স্বাস্থ্যসেবা ফিসহ খরচ হয় ৩,৯০৮.৫০ পাউন্ড।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী শাবানা মাহমুদের প্রস্তাব অনুযায়ী, কেউ কর্মরত অবস্থায় সরকারি তহবিল বা ভাতা ব্যবহার করলে স্থায়ী বসবাসের জন্য অপেক্ষার সময় দ্বিগুণ হয়ে ২০ বছর হতে পারে। শাবানা আরও বলেন,“আমরা একটি বহু-জাতি, বহু-ধর্মের গণতন্ত্র গড়েছি। স্থায়ীভাবে এই দেশের অংশ হতে হলে তা অধিকার নয়, বরং প্রাপ্যতা এবং যোগ্যতার বিষয়।”

অভিবাসনবিষয়ক দাতব্য সংস্থা Ramfel জানিয়েছে, প্রস্তাব কার্যকর হলে বহু পরিবার বাধ্য হয়ে চাইল্ড বেনিফিট, ইউনিভার্সাল ক্রেডিট, ট্যাক্স ক্রেডিট ও প্রতিবন্ধী ভাতার মতো সহায়তা নেওয়া বন্ধ করবে। সংস্থাটির ক্যাম্পেইন প্রধান নিক বিলস সতর্ক করে বলেন, এতে অভিভাবকদের ৮০ ঘণ্টা পর্যন্ত কাজ করতে হতে পারে এবং শিশু দারিদ্র্য আরও বাড়বে। তার ভাষায়, “মৌলিক রাষ্ট্রীয় সহায়তা নেওয়ার জন্য অভিবাসী বাবা–মায়েদের শাস্তি দেওয়া নির্মম ও হৃদয়হীন সিদ্ধান্ত, যা শিশুদের স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতিগ্রস্ত করবে।”

যুক্তরাজ্যের স্বাধীন পরামর্শদাতাদের বৃহত্তম নেটওয়ার্ক AdviceUK বলেছে, প্রস্তাবিত “ন্যায্য সেটেলমেন্ট পথ” অভিবাসী পরিবারগুলোর মধ্যে অনিশ্চয়তা ও বৈষম্য বাড়াচ্ছে।

প্রস্তাব অনুযায়ী, মূল যোগ্যতার সময়সীমা ১০ বছর ধরা হলেও সরকারি সহায়তা ১২ মাসের কম ব্যবহার করলে অতিরিক্ত পাঁচ বছর এবং ১২ মাসের বেশি ব্যবহার করলে আরও ১০ বছর যোগ হতে পারে। যদিও ইংরেজি দক্ষতা, করযোগ্য আয়, জনসেবায় কাজ বা ব্রিটিশ নাগরিকের অভিভাবক/সন্তান হওয়া বিবেচনায় সময় কিছুটা কমানো যেতে পারে, তবে অতিরিক্ত সময়ই প্রাধান্য পাবে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

AdviceUK–এর কাছে আসা একাধিক ঘটনায় দেখা গেছে, অনেকেই ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তায় ভুগছেন। ‘ববিতা’ (ছদ্মনাম), তিন সন্তানের জননী ও একজন সেবাকর্মী, স্থায়ী বসবাসের যোগ্যতা পাওয়ার মাত্র এক বছর আগে আছেন। তবে সুবিধা নেওয়ার কারণে অপেক্ষার সময় ২০ বছর বেড়ে যেতে পারে—এই আশঙ্কায় তিনি নিজের ও অটিজমে আক্রান্ত মেয়ের প্রাপ্য ভাতা বন্ধ করে দিয়েছেন। তার ভাষায়, “কম আয়ের কারণে ভাতা নিয়েছিলাম, এখন সেটাই আমার বিরুদ্ধে ব্যবহার হচ্ছে।”

Ramfel–এর এক জরিপে পশ্চিম আফ্রিকান, দক্ষিণ এশীয় ও ক্যারিবীয় বংশোদ্ভূত ৬৮ জন অভিভাবকের মধ্যে ৯০ শতাংশ জানিয়েছেন, শাস্তি এড়াতে তারা সরকারি সহায়তা ত্যাগ করবেন—যদিও এতে গৃহহীনতা, ঋণগ্রস্ততা ও সন্তানের মৌলিক চাহিদা পূরণে ব্যর্থতার ঝুঁকি রয়েছে। জরিপে উল্লিখিত ১৩৪ শিশুর অর্ধেকের বেশি ব্রিটিশ নাগরিক।

সমালোচকদের মতে, এ প্রস্তাব নিম্নআয়ের পরিবারগুলোর জন্য দ্বিস্তরীয় ব্যবস্থা তৈরি করবে এবং পরিবারগুলোকে তাৎক্ষণিক টিকে থাকা ও দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তার মধ্যে কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করবে।

গত নভেম্বরে পরামর্শ প্রক্রিয়া শুরুর সময় শাবানা মাহমুদ বলেন, “যুক্তরাজ্য বহুধর্মী ও বহুজাতিক গণতন্ত্র হলেও স্থায়ীভাবে এ দেশের অংশ হতে চাইলে অবদান ও একীভূত হওয়ার প্রমাণ দিতে হবে। এটি অধিকার নয়, অর্জনযোগ্য বিশেষাধিকার।”

পরামর্শ প্রক্রিয়া ১২ ফেব্রুয়ারি শেষ হয়েছে। প্রস্তাবিত পরিবর্তন এপ্রিল থেকেই কার্যকর হতে পারে এবং তা পূর্ববর্তী ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।