আশিতেও হাসি হাসি ড্যাশিং হিরো সোহেল রানা
সিদ্দিকুর রহমান নির্ঝর: বাংলাদেশ চলচ্চিত্রের কিংবদন্তি নায়ক, প্রযোজক, পরিচালক ও মুক্তিযোদ্ধা সোহেল রানা ওরফে মাসুদ পারভেজ আজ পা রাখলেন জীবনের ৮০তম বছরে। বয়সের সংখ্যায় তিনি আশির ঘরে পৌঁছালেও তাঁর মুখের চিরচেনা হাসি, প্রাণশক্তি আর দেশপ্রেম এখনো আগের মতোই অটুট। চার দশকেরও বেশি সময় ধরে চলচ্চিত্রে অবদান রেখে যাওয়া এই তারকা আজও দর্শকের কাছে ‘ড্যাশিং হিরো’ নামেই পরিচিত। মহান ২১শে ফেব্রুয়ারিতে তাঁর জন্ম।
১৯৪৭ সালের এই দিনে ঢাকায় জন্ম নেওয়া সোহেল রানা কৈশোর থেকেই ছিলেন সংগ্রামী, সাহসী ও নেতৃত্বগুণে উজ্জ্বল। ১৯৬১ সালে ছাত্রলীগের রাজনীতিতে যুক্ত হয়ে ৬ দফা আন্দোলন থেকে শুরু করে বঙ্গবন্ধুর আদর্শ ছড়িয়ে দেওয়ার কাজে সক্রিয় ভূমিকা রাখেন তিনি। ১৯৭১ সালের ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণ তাঁকে অস্ত্র হাতে যুদ্ধের সিদ্ধান্তে দৃঢ় করে তোলে। মহান মুক্তিযুদ্ধে জীবন বাজি রেখে অংশ নেন তিনি। তাঁর ভাষায়—“আমরা যুদ্ধ করেছি একটি পতাকার জন্য, একটি স্বাধীন দেশের জন্য।”

স্বাধীনতার পরই চলচ্চিত্রে আসেন সোহেল রানা। মাত্র ২৫ বছর বয়সে প্রযোজনা করেন দেশের প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক চলচ্চিত্র ‘ওরা ১১ জন’ (১৯৭২)—যা আজও বাংলা সিনেমার ইতিহাসে মাইলফলক। এরপর ১৯৭৪ সালে ‘মাসুদ রানা’ ছবির মাধ্যমে একসঙ্গে নায়ক, প্রযোজক ও পরিচালক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন তিনি। মজার বিষয় হলো, ছবির নায়ক খুঁজতে গঠিত কমিটির সদস্য হয়েও শেষ পর্যন্ত নিজেকেই নির্বাচিত হতে হয় তাঁকে। আর সেই ছবির মাধ্যমেই জন্ম নেয় ঢাকাই ছবির নতুন নায়ক—সোহেল রানা।
এরপর ‘এপার ওপার’, ‘দস্যু বনহুর’, ‘রাজরানী’, ‘গোপন কথা’, ‘দোস্ত দুশমন’,‘আদালত‘, ‘মা’, ‘দাতা হাতেম তাই’,‘স্ত্রী’, ‘জীবন নৌকা’, ‘গুনাহগার’, ‘মিন্টু আমার নাম’, ‘আসামী হাজির’, ‘শরীফ বদমাশ’, ‘যাদু নগর’, ‘রাজবাড়ী’, ‘দাগী‘, ‘সুখ দু:খের সাথী’, চোখের পানি, মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা, ‘দুই প্রেমিক’, ‘পেনশন’, ‘সোহেল রানা’, ‘চ্যালেঞ্জ’, ‘জনি’, ‘বারুদ’, রাজা সূর্য খা, ‘আখেরি নিশান’, ‘লালু ভুলু’, ‘হাঙর নদী গ্রেনেড’, ‘বড় মা’,ভুল সবই ভুল, অস্বীকার, আসামি হাজির, আখেরি নিশান, জারকা, প্রতিহিংসা, প্রেমনগর, চ্যালেঞ্জ, নাম বদনাম, প্রেম বন্ধন, গাদ্দার, সেলিম জাভেদ’, ‘লালুভুলু’, রাইয়ান, অদৃশ্য শত্রু, প্রহরীসহ প্রায় পৌনে তিন শতাধিক ছবিতে অভিনয় করে দর্শকের হৃদয়ে জায়গা করে নেন তিনি। চারবার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার এবং আজীবন সম্মাননা তাঁর দীর্ঘ ক্যারিয়ারের স্বীকৃতি।

স্ত্রী ডা: জিনাত পারভেজের সাথে নায়ক
চলচ্চিত্রের বাইরে রাজনীতিতেও সক্রিয় ছিলেন সোহেল রানা। বঙ্গবন্ধুর আদর্শে বিশ্বাসী এই অভিনেতা আজও মনে করেন—মুক্তিযোদ্ধাদের প্রাপ্য সম্মান রাষ্ট্রীয়ভাবে নিশ্চিত করা জরুরি। তাঁর মতে, “মুক্তিযোদ্ধার সম্মান পাওয়া অধিকার, দয়া নয়।”

একমাত্র সন্তান মাশরুর পারভেজ জীবরান এর সাথে নায়ক
ব্যক্তিজীবনে সোহেল রানা একজন শিক্ষিত, সংস্কৃতিমনা মানুষ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মনোবিজ্ঞানে এমএ পাস করেন। এলএলবি সম্পন্ন করলেও ৬ দফা আন্দোলনে যুক্ত থাকার কারণে ফাইনাল পরীক্ষা দিতে পারেননি। তাঁর স্ত্রী ডা. জিনাত পারভেজ এবং একমাত্র সন্তান মাশরুর পারভেজ জীবরান—যিনি চলচ্চিত্র পরিচালনা ও অভিনয়ের সঙ্গে যুক্ত। প্রযোজক-নায়ক রুবেল পারভেজ এবং সদ্য প্রয়াত কামাল পারভেজ তাঁর ভাই।
জন্ম ঢাকায় হলেও পৈতৃক নিবাস বরিশালে। জীবনের দীর্ঘ পথচলায় তিনি পেয়েছেন সাফল্য, সম্মান, ভালোবাসা—তবুও তাঁর একটাই অপূর্ণতা, বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা প্রতিষ্ঠিত হতে দেখা।

এই দীর্ঘ পথচলার সঙ্গে জড়িয়ে আছে সাংবাদিকদেরও অনেক স্মৃতি। এই প্রতিবেদক ১৯৯৬ সালে এফডিসিতে সোহেল রানার একটি দীর্ঘ সাক্ষাৎকার নিয়েছিলেন, যা প্রকাশিত হয়েছিল তৎকালীন দৈনিক বাংলা বাজার পত্রিকায়। শিরোনাম ছিল—“আমি মেয়েলি মার্কা অভিনয় করি না”। প্রকাশের পর সেই সাক্ষাৎকার বেশ আলোড়ন তুলেছিল। ঐ সাক্ষাৎকারটি দৈনিক সিলেটের ডাক পত্রিকায়ও প্রকাশিত হয়েছিল তখনই। এরপরও তাঁর অফিসে এবং উত্তরার ‘খেয়া’তে বহুবার দেখা হয়েছে। অত্যন্ত ভদ্র, শিক্ষিত, বিনয়ী এই নায়ক সে বছর হজব্রতও পালন করেছিলেন। জীবনের গভীরতম অভিজ্ঞতা, বিশ্বাস, সংগ্রাম—সবকিছুই অকপটে ভাগ করে নিয়েছিলেন তিনি।

গত বছর লন্ডনে দেখা হয়েছিল তাঁর একমাত্র ছেলে, চলচ্চিত্র পরিচালক মাশরুর পারভেজ জীবরানের সঙ্গে। বাবার মতোই বিনয়ী, সৃজনশীল, চলচ্চিত্রপ্রেমী।
আজ জন্মদিনে সোহেল রানার প্রতি এই প্রতিবেদকের প্রার্থনা—
নায়ক আজীবন ভালো থাকুন। সুস্থ থাকুন। তাঁর হাসি, তাঁর শক্তি, তাঁর দেশপ্রেম আরও বহু বছর আমাদের অনুপ্রাণিত করুক।