কলিকালের কলধ্বনি ।। ৮০ ।। বাংলা ভাষার হাজার বছরের ইতিহাস: আফ্রিকার আদিম ভাষা থেকে আজকের বাংলা ভাষা
এই কলামটি উৎসর্গ করা হলো—
ভাষা শহীদ সালাম, রফিক, বরকত, জব্বার এবং ১৯৫২ সালের সকল অমর শহীদকে,
যাদের রক্তে রাঙানো পথ ধরে বাংলা ভাষা আজ রাষ্ট্রভাষা ও বিশ্বভাষার মর্যাদা পেয়েছে

বাংলা ভাষার ইতিহাস আসলে মানুষের ইতিহাসেরই এক বিস্ময়কর অধ্যায়। পৃথিবীর ষষ্ঠ সর্বাধিক কথ্য ভাষা হিসেবে আজ যে বাংলা বিশ্বমঞ্চে দাঁড়িয়ে আছে, তার পেছনে রয়েছে হাজার বছরের বিবর্তন, ভাঙন, গঠন আর পুনর্জন্মের গল্প। ভাষা কখনো স্থির থাকে না; নদীর মতোই তার স্রোত বদলায়, বাঁক নেয়, নতুন পথ খুঁজে নেয়। বাংলা ভাষার ইতিহাসও সেই নদীর মতোই—অসংখ্য উপস্রোত, অসংখ্য উৎস, অসংখ্য রূপান্তরের সমষ্টি।
মানুষ প্রথম ভাষা ব্যবহার করে আজ থেকে প্রায় ৫০ হাজার থেকে ১ লক্ষ বছর আগে। প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণ বলছে—আফ্রিকার মানুষই প্রথম ভাষার ব্যবহার শুরু করে। সেখান থেকেই মানবজাতি পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে পড়ে, আর তাদের ভাষাও বদলাতে থাকে। এক ভাষা থেকে জন্ম নেয় আরেক ভাষা, তারপর আরও অনেক ভাষা। আজকের পৃথিবীর ভাষাগুলো তাই নানা ভাষাগোষ্ঠীতে বিভক্ত—ইন্দো-ইউরোপীয়, দ্রাবিড়ীয়, অস্ট্রো-এশীয়, চীনা-তিব্বতি, মালয়-পলিনেশীয়, নাইজার-কঙ্গো ইত্যাদি। কিন্তু সব ভাষারই মূল উৎস সেই আফ্রিকার আদিম উচ্চারণ। নোয়াম চমস্কির মতো ভাষাবিদরা মনে করেন—সব ভাষার পেছনে একটি সার্বজনীন ব্যাকরণ কাজ করে, যা ভাষার অভিন্ন উৎসের ইঙ্গিত দেয়।
বাংলা ভাষা যে পরিবারে জন্মেছে, তার নাম ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষাগোষ্ঠী। এই পরিবারে আছে ইংরেজি, ফরাসি, গ্রিক, ল্যাটিন, হিন্দি, নেপালি, ফারসি—এমনকি ডাচও। প্রায় ৪০০০–১০০০ বছর আগে মধ্য এশিয়ার প্রোটো ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষাভাষীরা পূর্ব–পশ্চিমে ছড়িয়ে পড়লে তাদের ভাষা বিভিন্ন শাখায় বিভক্ত হয়। এর একটি শাখা হলো ইন্দো-ইরানীয়, আর তারই একটি অংশ ইন্দো-আর্য—যেখান থেকে বাংলার জন্ম। ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষাগোষ্ঠী আবার দুই ভাগ—শতম ও কেন্টুম। শতম শাখা থেকে এসেছে ভারতীয় ভাষাগুলো, আর কেন্টুম শাখা থেকে ইউরোপের ভাষাগুলো।
ভারতীয় আর্যভাষার ইতিহাসে তিনটি স্তর দেখা যায়। প্রথম স্তর বৈদিক ভাষা—যা ছিল মূলত উচ্চবর্ণের ভাষা, সাধারণ মানুষের কাছে দুর্বোধ্য। এরপর আসে সংস্কৃত, যা পাণিনির হাতে নিয়মবদ্ধ হয়ে রাষ্ট্রীয় ও ধর্মীয় ভাষার মর্যাদা পায়। কিন্তু সাধারণ মানুষের মুখের ভাষা ছিল ভিন্ন—সেই ভাষা ছিল প্রাকৃত। প্রাকৃত ভাষা থেকে জন্ম নেয় অপভ্রংশ, আর অপভ্রংশ থেকেই জন্ম নেয় আধুনিক ভারতীয় ভাষাগুলো—বাংলা, হিন্দি, গুজরাটি, মারাঠি, পাঞ্জাবি ইত্যাদি।
বাংলার জন্মভূমি ছিল পূর্ব ভারতের মাগধী প্রাকৃত। এই প্রাকৃত থেকে জন্ম নেয় পূর্বী অপভ্রংশ, আর সেই অপভ্রংশ থেকেই বাংলা, অসমিয়া ও ওড়িয়া ভাষার উৎপত্তি। ভাষাবিদ সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় মনে করেন—বাংলা, অসমিয়া ও ওড়িয়া একই উৎস থেকে এসেছে। অন্যদিকে ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ মনে করেন—বাংলার উৎস গৌড়ীয় প্রাকৃত। দুই মতের ভিন্নতা থাকলেও এক সত্য স্পষ্ট—বাংলা ভাষার শেকড় বহু গভীরে, বহু পুরোনো।
বাংলা ভাষার সর্বপ্রাচীন যে সাহিত্যিক নিদর্শন পাওয়া গেছে, তা হলো চর্যাপদ। এর আরও নাম আছে—চর্যাগীতিকোষ, দোহাকোষ, চর্যাশ্চর্যবিনিশ্চয়, চর্যাগীতিকা। ধারণা করা হয়, এটি পাল আমলে রচিত। ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহর মতে চর্যাপদের রচনাকাল ৬৫০–১২০০ খ্রিষ্টাব্দ, আর সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় মনে করেন এর সময়কাল ৯৫০–১২০০ খ্রিষ্টাব্দ। চর্যাপদ শুধু বাংলা ভাষার প্রাচীন নিদর্শন নয়—এটি বাংলার আদি সাহিত্য, আদি কাব্য, আদি কণ্ঠস্বর। চর্যাপদের ভাষায় আমরা পাই বাংলার প্রথম উচ্চারণ, প্রথম শব্দ, প্রথম ছন্দ—যা আজও আমাদের ভাষার ভেতর কোথাও না কোথাও বেঁচে আছে।
মুসলমানরা বাংলাদেশে আসার আগে এখানে প্রধানত বৌদ্ধধর্ম ও সনাতন ধর্ম প্রচলিত ছিল। সনাতন ধর্ম আবার শৈব, শাক্ত, বৈষ্ণব—এভাবে নানা ভাগে বিভক্ত ছিল। সমাজে ছিল বর্ণব্যবস্থার চার স্তর—ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য, শূদ্র। সাধারণ মানুষের কথোপকথনের জন্য আলাদা কথ্য ভাষা গড়ে উঠেছিল। কিন্তু ধর্মাচরণের জন্য বৌদ্ধরা পালি, আর সনাতন ধর্মালম্বীরা সংস্কৃত ব্যবহার করত। ফলে বাংলার কথ্য ভাষা ও ধর্মীয় ভাষার মধ্যে ছিল স্পষ্ট পার্থক্য। এই দ্বৈততা বাংলা ভাষার বিকাশে একদিকে বাধা সৃষ্টি করলেও অন্যদিকে কথ্য ভাষাকে আরও শক্তিশালী করে তোলে—কারণ সাধারণ মানুষের ভাষাই শেষ পর্যন্ত টিকে থাকে, বিস্তার লাভ করে, সাহিত্য সৃষ্টি করে।
মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্য ছিল ধর্মনির্ভর। দেব-দেবীর আরাধনা, প্রেম, ভক্তি—এসবই ছিল সাহিত্যের প্রধান উপাদান। বাংলা সাহিত্যের আদিমধ্যযুগে সর্বপ্রথম আখ্যানকাব্য শ্রীকৃষ্ণকীর্তন, রচয়িতা বড়ু চণ্ডীদাস। রাধা–কৃষ্ণের প্রেমকাহিনি নিয়ে রচিত এই কাব্য বাংলা ভাষার সাহিত্যিক বিকাশে এক নতুন দিগন্ত খুলে দেয়। চর্যাপদের আধ্যাত্মিক গূঢ়তা থেকে বেরিয়ে শ্রীকৃষ্ণকীর্তন বাংলা ভাষাকে দেয় মানবিক আবেগ, প্রেম, সম্পর্কের নতুন ভাষা।
এরপর বাংলা ভাষা প্রবেশ করে মুসলিম শাসনামলে, যেখানে ফারসি ভাষার প্রভাব বাংলা শব্দভান্ডারে নতুন মাত্রা যোগ করে। “দরবার”, “বাজার”, “হিসাব”, “কাজী”, “মেহমান”—এমন অসংখ্য শব্দ বাংলা ভাষায় স্থায়ীভাবে জায়গা করে নেয়। আবার মুঘল আমলে বাংলা লিপি আরও পরিণত হয়, গড়ে ওঠে প্রশাসনিক বাংলা, ব্যবসায়িক বাংলা, এমনকি আঞ্চলিক বাংলা উপভাষার বিস্তারও বাড়ে।
বাংলা লিপির ইতিহাসও কম বিস্ময়কর নয়। ব্রাহ্মী লিপি থেকে উদ্ভূত এই লিপি গুপ্ত লিপি, সিদ্ধম লিপি, গৌড়ীয় লিপি হয়ে আজকের বাংলা লিপিতে রূপ নেয়। বাংলা লিপির বাঁক, বক্রতা, বর্ণের গোলাকার গঠন—সবই এসেছে প্রাচীন তালপাতার লেখনপদ্ধতির প্রভাব থেকে। কলমের টানে যে গোলাকারতা তৈরি হতো, তা আজও বাংলা বর্ণমালার সৌন্দর্য বহন করে।
বাংলা ভাষার উপভাষার বৈচিত্র্যও বিস্ময়কর। রাঢ়ী, বরেন্দ্রী, বাগ্ড়ী, ঢাকাইয়া, চাটগাঁইয়া, সিলেটি, নোয়াখাইল্লা—প্রতিটি উপভাষা বাংলা ভাষাকে দিয়েছে নতুন রূপ, নতুন স্বর, নতুন শব্দ। সিলেটির ধ্বনি, চাটগাঁইয়ার টান, ঢাকাইয়ার ছন্দ—সব মিলিয়ে বাংলা ভাষা এক বিশাল ভাষাসমুদ্র।
আধুনিক বাংলা ভাষার রূপান্তর শুরু হয় উনিশ শতকে। বিদ্যাসাগরের ব্যাকরণ, বঙ্কিমের গদ্য, রবীন্দ্রনাথের ভাষাশৈলী—সব মিলিয়ে বাংলা ভাষা পায় নতুন কাঠামো, নতুন ছন্দ, নতুন দিগন্ত। এরপর নজরুলের বিদ্রোহী ভাষা, জীবনানন্দের নিসর্গ, শামসুর রাহমানের আধুনিকতা—সব মিলিয়ে বাংলা ভাষা হয়ে ওঠে বহুমাত্রিক, বহুস্বরিক, বহুবর্ণিল।
বাংলা ভাষার সাংস্কৃতিক প্রভাব এত গভীর, এত বিস্তৃত যে এটি শুধু একটি ভাষা নয়—এটি একটি সভ্যতার পরিচয়। বাংলা ভাষা বাঙালির সংস্কৃতির প্রতিটি স্তরে, প্রতিটি শাখায়, প্রতিটি অনুভূতিতে ছড়িয়ে আছে। বাঙালির গান, কবিতা, নাটক, গল্প, লোককথা, উৎসব—সবকিছুর কেন্দ্রে রয়েছে এই ভাষা। বাংলা ভাষার সবচেয়ে বড় শক্তি হলো এর আবেগ প্রকাশের ক্ষমতা। বাঙালি হাসে বাংলায়, কাঁদে বাংলায়, প্রেমে পড়ে বাংলায়, প্রতিবাদ করে বাংলায়। রবীন্দ্রনাথের “আমার সোনার বাংলা”, নজরুলের “চল চল চল”, জীবনানন্দের “রূপসী বাংলা”—এসব শুধু সাহিত্য নয়, এগুলো বাঙালির আত্মার ভাষা।
লোকসংস্কৃতিতেও বাংলা ভাষার প্রভাব অপরিসীম। ভাটিয়ালি, বাউল, জারি-সারি, পালাগান, মঙ্গলকাব্য—এসবের প্রতিটি শব্দ, প্রতিটি সুর বাংলার মাটি, নদী, মানুষ, জীবনযাত্রার সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। বাউল গানের দার্শনিকতা, ভাটিয়ালির নদীমাতৃক সুর, মঙ্গলকাব্যের পৌরাণিক আখ্যান—সবই বাংলা ভাষাকে দিয়েছে এক অনন্য সাংস্কৃতিক গভীরতা।
বাংলা ভাষা শুধু সাহিত্য বা সংগীতে নয়—রাজনীতি ও সামাজিক আন্দোলনেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গ আন্দোলন, ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন, ১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান, ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ—সব আন্দোলনের স্লোগান, গান, কবিতা, ভাষণ—সবই বাংলায়। “জয় বাংলা”, “আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো”—এসব শুধু শব্দ নয়; এগুলো ইতিহাসের চিহ্ন।
বাংলা ভাষা বাঙালির উৎসব-সংস্কৃতিরও কেন্দ্রবিন্দু। পহেলা বৈশাখ, নববর্ষের মঙ্গল শোভাযাত্রা, নবান্ন, দুর্গাপূজা, ঈদ—সব উৎসবেই বাংলা ভাষা মানুষের আবেগকে এক সুতোয় গেঁথে রাখে। বাংলা ভাষা ছাড়া বাঙালির উৎসব কল্পনাই করা যায় না।
বাংলা ভাষার বিশ্বব্যাপী বিস্তারও আজ এক বাস্তবতা। বাংলাদেশ ও ভারতের বাইরে মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ, আমেরিকা, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর—সব জায়গায় গড়ে উঠেছে বাংলা ভাষাভাষী প্রবাসী সমাজ। লন্ডন, নিউইয়র্ক, টরন্টো, সিডনি—এসব শহরে বাংলা ভাষা শুধু ঘরের ভাষা নয়; এটি সাংস্কৃতিক পরিচয়ের প্রতীক। বাংলা ভাষার সংবাদমাধ্যম, টেলিভিশন, সাহিত্য, নাটক, সংগীত—সবই আজ বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়েছে।
প্রযুক্তির যুগে বাংলা ভাষার সম্ভাবনাও বিস্তৃত হচ্ছে। স্মার্টফোন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, অনলাইন শিক্ষা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা—এসবই বাংলা ভাষাকে নতুন প্ল্যাটফর্ম দিয়েছে। বাংলা কিবোর্ড, বাংলা ভয়েস-টাইপিং, বাংলা অনুবাদ—এসব প্রযুক্তি বাংলা ভাষাকে আরও সহজলভ্য করছে। ডিজিটাল যুগে বাংলা ভাষার ব্যবহার বাড়ছে দ্রুত, বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের মধ্যে।
তবে চ্যালেঞ্জও কম নয়। ইংরেজির প্রভাব, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ভাষার বিকৃতি, বানান ভুলের বিস্তার, উপভাষার অবমূল্যায়ন—এসবই বাংলা ভাষার সামনে নতুন প্রশ্ন ছুড়ে দিচ্ছে। আবার প্রযুক্তিতে বাংলা ভাষার উপস্থিতি এখনও সীমিত—বিশ্বের বড় বড় সফটওয়্যার, অ্যাপ, প্ল্যাটফর্মে বাংলা ভাষার সমর্থন অনেক ক্ষেত্রে অসম্পূর্ণ।
তবুও বাংলা ভাষার ভবিষ্যৎ উজ্জ্বল—যদি আমরা আমাদের ভাষাকে ভালোবাসি, শুদ্ধভাবে ব্যবহার করি, এবং নতুন প্রজন্মকে এর ইতিহাস শেখাই। কারণ ভাষা শুধু যোগাযোগের মাধ্যম নয়—এটি আমাদের ইতিহাস, পরিচয়, গর্ব, এবং অস্তিত্ব। ভাষা বাঁচলে জাতি বাঁচে, ইতিহাস বাঁচে, পরিচয় বাঁচে।
লেখক: সম্পাদক, কলাম লেখক, বিশ্লেষক ও সাবেক অধ্যাপক
লন্ডন, ২১ শে ফেব্রুয়ারি ২০২৬।