তথ্যনির্ভর ও বস্তুনিষ্ঠ সংবাদের জন্য—ভয়েস অব পিপল

ব্রিটেনে আইএলআর পেতে ১৫ বছর অপেক্ষার প্রস্তাব, লেবার পার্টিতেই বিরোধ

ব্রিটেনে আইএলআর পেতে ১৫ বছর অপেক্ষার প্রস্তাব, লেবার পার্টিতেই বিরোধ

ভয়েস অব পিপল রিপোর্ট, ২২ অক্টোবর :

যুক্তরাজ্যে স্থায়ীভাবে বসবাসের অনুমতি (ইনডেফিনিট লিভ টু রিমেইন—আইএলআর) পেতে অভিবাসীদের অপেক্ষার সময় বাড়ানোর প্রস্তাব নিয়ে ক্ষমতাসীন লেবার পার্টির ভেতরেই বিরোধ দেখা দিয়েছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী শাবানা মাহমুদ নির্দিষ্ট কিছু শ্রেণির অভিবাসীর ক্ষেত্রে বর্তমান পাঁচ বছরের পরিবর্তে ১৫ বছর পর্যন্ত অপেক্ষার সময় নির্ধারণের প্রস্তাব দিয়েছেন। তবে প্রস্তাবটি কীভাবে কার্যকর হবে, তা নিয়ে সরকারের ভেতরে আলোচনা চলছে।

বুধবার (২১ অক্টোবর) ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ান ও দ্য ইন্ডিপেনডেন্টের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রস্তাবটি নিয়ে সরকারের জ্যেষ্ঠ কয়েকজন মন্ত্রী ও লেবার পার্টির সংসদ সদস্যদের মধ্যে উদ্বেগ রয়েছে। বিশেষ করে বিদেশি কেয়ার কর্মীদের ওপর এর সম্ভাব্য প্রভাব এবং দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাজ্যে বসবাস ও কাজ করা অভিবাসীদের সঙ্গে ন্যায্য আচরণের প্রশ্নটি সামনে এসেছে।

কী পরিবর্তন আনতে চায় সরকার?

সরকারের প্রস্তাবিত ‘আর্নড সেটেলমেন্ট’ বা অবদানের ভিত্তিতে স্থায়ী বসবাসের অনুমতি দেওয়ার কাঠামোয় অভিবাসীদের যুক্তরাজ্যে স্থায়ী হওয়ার যোগ্যতা অর্জনের শর্ত পরিবর্তনের পরিকল্পনা রয়েছে।

২০২৫ সালের নভেম্বরে প্রকাশিত সরকারি পরামর্শপত্রে সাধারণভাবে স্থায়ী বসবাসের যোগ্যতার সময়সীমা পাঁচ বছর থেকে বাড়িয়ে ১০ বছর করার প্রস্তাব দেওয়া হয়। পাশাপাশি নির্দিষ্ট নিম্নবেতনের ও কম দক্ষতাসম্পন্ন পেশায় কর্মরত অভিবাসীদের ক্ষেত্রে সময়সীমা ১৫ বছর করার বিকল্পও আলোচনায় রাখা হয়।

স্বাস্থ্য ও কেয়ার ভিসায় আসা কর্মীদের ক্ষেত্রেও দীর্ঘ অপেক্ষার সময় নির্ধারণের প্রস্তাব রয়েছে। সরকারের প্রস্তাব অনুযায়ী, পরিবর্তনগুলো কার্যকর হলে ইতিমধ্যে যুক্তরাজ্যে বসবাস করছেন, কিন্তু এখনো আইএলআর পাননি—এমন ব্যক্তিরাও এর আওতায় আসতে পারেন।

তবে কোন শ্রেণির অভিবাসীর ক্ষেত্রে ঠিক কী নিয়ম কার্যকর হবে, সে বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এখনো ঘোষণা করা হয়নি।

লেবার পার্টির ভেতরে কেন বিরোধ?

দ্য গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী শাবানা মাহমুদের প্রস্তাব নিয়ে জ্বালানিমন্ত্রী মিয়াট্টা ফাহনবুলেহ ও আবাসনমন্ত্রী অ্যাঞ্জেলা রেনারের মতো জ্যেষ্ঠ নেতারা উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।

তাঁদের উদ্বেগের অন্যতম কারণ, বিদেশি কর্মীরা যুক্তরাজ্যের অর্থনীতি ও জনসেবায় অবদান রাখার পরও যদি স্থায়ী বসবাসের অনুমতি পেতে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে বাধ্য হন, তাহলে তা তাঁদের ও তাঁদের পরিবারের ওপর অনিশ্চয়তা বাড়াতে পারে।

বিশেষ করে কেয়ার খাতের বিদেশি কর্মীদের বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। যুক্তরাজ্যের বয়স্ক ও অসুস্থ মানুষের পরিচর্যায় বিদেশি কর্মীদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। তাঁদের স্থায়ী বসবাসের অনুমতি পেতে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হলে কর্মীদের ধরে রাখা এবং এই খাতে জনবলসংকট মোকাবিলা আরও কঠিন হতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন সমালোচকেরা।

দ্য ইন্ডিপেনডেন্টের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জ্বালানিমন্ত্রী মিয়াট্টা ফাহনবুলেহ অভিবাসনব্যবস্থার সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা স্বীকার করলেও শাবানা মাহমুদের প্রস্তাবিত ১৫ বছরের সময়সীমার প্রতি সরাসরি সমর্থন জানাননি। তিনি অভিবাসন নীতিতে মানবিকতা এবং মানুষের অবদানকে গুরুত্ব দেওয়ার ওপর জোর দিয়েছেন।

অন্যদিকে, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর পরিকল্পনার সমর্থকেরা বলছেন, স্থায়ী বসবাসের অনুমতি দেওয়ার ক্ষেত্রে অভিবাসীদের দীর্ঘমেয়াদি অবদান, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ও নিয়ম মেনে চলার বিষয়গুলো বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।

চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের আগে কী হবে?

যুক্তরাজ্য সরকারের তথ্য অনুযায়ী, ‘আর্নড সেটেলমেন্ট’ নিয়ে জনসাধারণ ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মতামত জানতে গত বছরের ২০ নভেম্বর থেকে চলতি বছরের ১২ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত পরামর্শ গ্রহণ করা হয়েছিল। এতে দুই লাখের বেশি মতামত জমা পড়ে। সরকার বর্তমানে সেগুলো পর্যালোচনা করছে।

১৯ অক্টোবর হাউস অব লর্ডসে দেওয়া এক লিখিত উত্তরে সরকার জানিয়েছে, মতামত বিশ্লেষণের ভিত্তিতে চূড়ান্ত কাঠামো নির্ধারণ করবেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। সিদ্ধান্ত প্রকাশের আগে প্রস্তাবগুলোর অর্থনৈতিক ও সমতা-সংক্রান্ত প্রভাবও মূল্যায়ন করা হবে।

সংসদীয় তথ্য অনুযায়ী, নতুন নিয়ম চূড়ান্ত না হওয়া পর্যন্ত বর্তমান দীর্ঘমেয়াদি বসবাস-সংক্রান্ত নিয়ম কার্যকর থাকবে। প্রস্তাবিত পরিবর্তন কবে থেকে কার্যকর হবে, সে বিষয়ে নির্দিষ্ট তারিখও এখনো ঘোষণা করা হয়নি।

ব্রিটিশ বাংলাদেশিদের জন্য কেন গুরুত্বপূর্ণ?

যুক্তরাজ্যে বসবাসরত বাংলাদেশিদের একটি অংশ কর্মসংস্থান, পরিবার ও দীর্ঘমেয়াদি ভবিষ্যতের পরিকল্পনা আইএলআর পাওয়ার সময়সীমাকে কেন্দ্র করে সাজান। তাই প্রস্তাবিত পরিবর্তন কার্যকর হলে যাঁরা এখনো স্থায়ী বসবাসের অনুমতি পাননি, তাঁদের পরিকল্পনায় প্রভাব পড়তে পারে।

তবে সবার ক্ষেত্রে একই নিয়ম প্রযোজ্য হবে—এমন সিদ্ধান্ত এখনো হয়নি। কোন ভিসার আওতায় থাকা ব্যক্তিরা পরিবর্তনের মুখে পড়বেন, তাঁদের জন্য কোনো ছাড় বা অন্তর্বর্তীকালীন সুরক্ষা থাকবে কি না এবং আগে থেকে যুক্তরাজ্যে বসবাসরত ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে নিয়ম কীভাবে প্রয়োগ করা হবে, তা চূড়ান্ত নীতিমালার ওপর নির্ভর করবে।

সব মিলিয়ে, আইএলআর পেতে ১৫ বছর অপেক্ষার বিষয়টি এখনো প্রস্তাবিত নীতির অংশ। এটি চূড়ান্ত আইন বা কার্যকর অভিবাসনবিধি নয়। সরকারের চূড়ান্ত ঘোষণা না আসা পর্যন্ত অভিবাসীদের বর্তমান নিয়ম সম্পর্কে সরকারি নির্দেশনা অনুসরণ করা এবং পরিবর্তন নিয়ে প্রকাশিত তথ্য যাচাই করে সিদ্ধান্ত নেওয়া জরুরি।