ভয়েস অব পিপল ।। জনগণের কণ্ঠস্বর, বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি
অভিবাসন নীতিতে কঠোর হচ্ছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন
ইউরোপ প্রতিনিধি, ২২ অক্টোবর:
ইউরোপীয় ইউনিয়নে (ইইউ) অভিবাসন নিয়ন্ত্রণে আরও কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। অনিয়মিত অভিবাসীদের শনাক্তকরণ, আশ্রয়ের আবেদন দ্রুত নিষ্পত্তি, প্রত্যাবাসন ত্বরান্বিত করা এবং সদস্যদেশগুলোর মধ্যে বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত কার্যকর করার সহযোগিতা বাড়াতে নতুন নিয়ম অনুমোদন করেছে জোটটি। এতে ইউরোপে আশ্রয়প্রার্থী ও বৈধ কাগজপত্র ছাড়া বসবাসকারীদের জন্য পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে।
বিশেষ করে বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার যেসব দেশ থেকে মানুষ কাজ, উন্নত জীবন কিংবা নিরাপত্তার আশায় ইউরোপে যাওয়ার চেষ্টা করেন, তাঁদের জন্য এসব পরিবর্তন গুরুত্বপূর্ণ। তবে নতুন নিয়মের অর্থ এই নয় যে ইউরোপে বসবাসরত সব বিদেশি নাগরিকের ভিসা বাতিল হবে কিংবা সবাইকে দেশে ফিরে যেতে হবে।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের কাউন্সিলের ১ অক্টোবর ২০২৬-এর ঘোষণা অনুযায়ী, যাঁদের জোটভুক্ত দেশগুলোতে থাকার আইনি অধিকার নেই, তাঁদের নিজ দেশে ফেরত পাঠানোর প্রক্রিয়া আরও কার্যকর করতে নতুন নিয়ম চূড়ান্ত অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এতে প্রত্যাবাসনের জন্য অভিন্ন পদ্ধতি, সদস্যদেশগুলোর মধ্যে তথ্য বিনিময় এবং নিরাপত্তার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে বিবেচিত ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে।

জুন থেকে কার্যকর হয়েছে নতুন অভিবাসন কাঠামো
ইউরোপীয় ইউনিয়নের অভিবাসন ও আশ্রয়বিষয়ক নতুন চুক্তি ২০২৬ সালের ১২ জুন থেকে কার্যকর হয়েছে। এর মাধ্যমে জোটভুক্ত দেশগুলোর সীমান্তে অনিয়মিতভাবে প্রবেশকারীদের নিবন্ধন, পরিচয় যাচাই, নিরাপত্তা পরীক্ষা এবং আশ্রয়ের আবেদন নিষ্পত্তির প্রক্রিয়ায় অভিন্ন নিয়ম চালু হয়েছে।
ইউরোপীয় কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, নতুন ব্যবস্থায় সীমান্তে প্রবেশকারী ব্যক্তিদের পরিচয়, স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তাসংক্রান্ত যাচাই করা হবে। পাশাপাশি কারা আশ্রয়ের নিয়মিত প্রক্রিয়ায় যাবেন, কারা দ্রুত নিষ্পত্তির আওতায় পড়বেন এবং কারা প্রত্যাবাসনের মুখোমুখি হবেন, তা নির্ধারণের ব্যবস্থা রয়েছে।
এ ব্যবস্থার আওতায় ইউরোপীয় ইউনিয়নের ইউরোড্যাক তথ্যভান্ডারের ব্যবহারও সম্প্রসারিত হয়েছে। এর মাধ্যমে আশ্রয়প্রার্থী ও অনিয়মিত অভিবাসীদের পরিচয়সংক্রান্ত তথ্য সংরক্ষণ এবং সদস্যদেশগুলোর মধ্যে তথ্য বিনিময় সহজ হবে।
যাঁদের থাকার অধিকার নেই, তাঁদের দ্রুত ফেরত পাঠানোর উদ্যোগ
ইউরোপীয় ইউনিয়নের নতুন নিয়মের অন্যতম লক্ষ্য হলো, যাঁদের থাকার অনুমতি নেই, তাঁদের প্রত্যাবাসনের সিদ্ধান্ত কার্যকর করা।
ইইউ কাউন্সিলের তথ্য অনুযায়ী, নতুন ব্যবস্থায় একটি অভিন্ন ইউরোপীয় প্রত্যাবাসন আদেশ চালুর বিধান রয়েছে। এতে প্রত্যাবাসনসংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ তথ্য এক জায়গায় নথিভুক্ত থাকবে। ফলে এক সদস্যদেশে দেওয়া প্রত্যাবাসনের সিদ্ধান্ত সম্পর্কে অন্য সদস্যদেশের কর্তৃপক্ষের তথ্য পাওয়া সহজ হবে।
নতুন নিয়মে কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সহযোগিতা না করলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির ওপর আর্থিক জরিমানা কিংবা জাতীয় আইনে অনুমোদিত ক্ষেত্রে অন্যান্য শাস্তির বিধানও থাকতে পারে। তবে এসব ব্যবস্থা সংশ্লিষ্ট দেশের আইন এবং ব্যক্তির পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করবে।
ইইউ কাউন্সিল জানিয়েছে, জোটে যাঁদের চলে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়, তাঁদের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ বাস্তবে ইউরোপ ছাড়েন না। নতুন নিয়মের অন্যতম উদ্দেশ্য হলো এই ব্যবধান কমানো।
ইউরোপের বাইরে প্রত্যাবাসনকেন্দ্র স্থাপনের সুযোগ
নতুন নীতির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাইরের দেশে প্রত্যাবাসনকেন্দ্র স্থাপনের সুযোগ।
এই ব্যবস্থায় যেসব ব্যক্তির ইউরোপে থাকার আইনি অধিকার নেই এবং যাঁদের প্রত্যাবাসনের সিদ্ধান্ত হয়েছে, তাঁদের নির্দিষ্ট চুক্তি বা সমঝোতার ভিত্তিতে ইউরোপের বাইরের কোনো দেশে অবস্থিত কেন্দ্রে পাঠানো যেতে পারে।
তবে এ ধরনের ব্যবস্থা বাস্তবায়নের জন্য সংশ্লিষ্ট দেশের সঙ্গে চুক্তি বা সমঝোতা প্রয়োজন। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক মানবাধিকার ও আন্তর্জাতিক আইনের নীতিমালা মেনে চলার শর্ত রয়েছে। একা থাকা অপ্রাপ্তবয়স্ক শিশুদের এ ধরনের ব্যবস্থার আওতার বাইরে রাখা হয়েছে।
এই উদ্যোগ নিয়ে মানবাধিকার সংগঠনগুলোর উদ্বেগ রয়েছে। তাদের আশঙ্কা, তৃতীয় দেশে পাঠানো ব্যক্তিদের আইনি সুরক্ষা ও ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে উঠতে পারে। অন্যদিকে, ইউরোপীয় কর্তৃপক্ষের যুক্তি, এ ব্যবস্থা প্রত্যাবাসন কার্যকর করতে এবং অনিয়মিত অভিবাসন নিরুৎসাহিত করতে সহায়তা করবে।
বাংলাদেশি অভিবাসনপ্রত্যাশীদের ওপর কী প্রভাব পড়তে পারে?
ইউরোপের নতুন অভিবাসননীতির প্রভাব বাংলাদেশিদের ক্ষেত্রে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। তবে এখানে বৈধ কর্মী, শিক্ষার্থী, পর্যটক, আশ্রয়প্রার্থী এবং অনিয়মিতভাবে বসবাসকারী ব্যক্তিদের পরিস্থিতি আলাদা করে দেখতে হবে।
প্রথমত, আশ্রয়ের আবেদন আরও কঠিন হতে পারে। নতুন ব্যবস্থায় সীমান্তে যাচাই এবং দ্রুত আবেদন নিষ্পত্তির সুযোগ বাড়ানো হয়েছে। বাংলাদেশ থেকে আসা আবেদনকারীদের ক্ষেত্রেও নির্ধারিত নিয়ম অনুসারে আবেদন যাচাই করা হতে পারে। কোনো দেশের আবেদনকারীদের আশ্রয় পাওয়ার হার কম হলে তাঁদের কিছু আবেদন দ্রুত নিষ্পত্তির প্রক্রিয়ায় পড়তে পারে। তবে প্রত্যেক আবেদনকারীর দাবি ও ব্যক্তিগত পরিস্থিতি বিবেচনার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ।
দ্বিতীয়ত, অবৈধভাবে বসবাসকারীদের ঝুঁকি বাড়তে পারে। যাঁদের ভিসা বা বসবাসের অনুমতির মেয়াদ শেষ হয়েছে এবং যাঁদের থাকার অন্য কোনো আইনি ভিত্তি নেই, তাঁদের বিরুদ্ধে প্রত্যাবাসনের সিদ্ধান্ত কার্যকর করার উদ্যোগ জোরদার হতে পারে। তবে মেয়াদোত্তীর্ণ কাগজপত্র থাকা মানেই প্রত্যেক ব্যক্তিকে একইভাবে ফেরত পাঠানো হবে, এমন নয়। আপিল, পারিবারিক পরিস্থিতি, মানবাধিকার এবং অন্যান্য আইনি বিষয় প্রাসঙ্গিক হতে পারে।
তৃতীয়ত, দালাল ও মানবপাচারকারীদের প্রলোভন থেকে সতর্ক থাকতে হবে। ইউরোপে প্রবেশের নিশ্চয়তা, ভুয়া চাকরির প্রস্তাব কিংবা জাল কাগজপত্রের মাধ্যমে বসবাসের অনুমতি দেওয়ার প্রতিশ্রুতিতে অর্থ ব্যয় করলে আর্থিক ক্ষতি ও আইনি জটিলতা তৈরি হতে পারে। বৈধ ভিসা, কাজের অনুমতি এবং অভিবাসনসংক্রান্ত তথ্য সংশ্লিষ্ট দেশের সরকারি কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে যাচাই করা উচিত।
চতুর্থত, বৈধভাবে বসবাসকারী বাংলাদেশিদের আতঙ্কিত হওয়ার কারণ নেই। যাঁদের বৈধ ভিসা, বসবাসের অনুমতি ও কাজের অধিকার রয়েছে, তাঁদের ক্ষেত্রে নতুন প্রত্যাবাসন বিধি স্বয়ংক্রিয়ভাবে প্রযোজ্য হয়ে তাঁদের দেশ ছাড়তে বাধ্য করে না। তবে ভিসা নবায়ন, চাকরির শর্ত এবং বসবাসের অনুমতির মেয়াদ সম্পর্কে সচেতন থাকা প্রয়োজন।
ফ্রান্স ও ইতালিতে কী পরিবর্তন আসতে পারে?
ফ্রান্স ও ইতালি—দুই দেশই ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্য। ফলে নতুন অভিবাসন ও আশ্রয় কাঠামো বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে উভয় দেশকে অভিন্ন ইউরোপীয় নিয়ম অনুসরণ করতে হবে।
ইতালি দীর্ঘদিন ধরে ভূমধ্যসাগরীয় পথে আসা অভিবাসীদের চাপ সামলানোর বিষয়টি তুলে ধরে আসছে। অন্যদিকে, ফ্রান্সেও অনিয়মিত অভিবাসন, আশ্রয়ের আবেদন এবং প্রত্যাবাসন নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক রয়েছে।
নতুন নিয়মের ফলে দুই দেশের কর্তৃপক্ষ সীমান্তে পরিচয় যাচাই, আবেদন নিষ্পত্তি এবং প্রত্যাবাসনের সিদ্ধান্ত কার্যকর করার ক্ষেত্রে আরও সমন্বিত ব্যবস্থা পেতে পারে। তবে বাস্তব প্রয়োগে জাতীয় আইন, আদালতের সিদ্ধান্ত এবং ব্যক্তির আইনি অবস্থার গুরুত্ব থাকবে।
বাংলাদেশি প্রবাসীদের জন্য তাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ফ্রান্স বা ইতালিতে বসবাসের অনুমতি ও কাজের কাগজপত্র হালনাগাদ রাখা এবং কোনো আইনি সমস্যা দেখা দিলে অনুমোদিত আইনজীবী বা স্বীকৃত অভিবাসন সহায়তা সংস্থার পরামর্শ নেওয়া।
মানবাধিকার নিয়ে উদ্বেগ
অভিবাসন নিয়ন্ত্রণ জোরদার করার পাশাপাশি মানবাধিকার রক্ষার বিষয়টিও ইউরোপে বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে।
সমালোচকদের আশঙ্কা, দ্রুত প্রত্যাবাসন ও তৃতীয় দেশে অভিবাসীদের পাঠানোর ব্যবস্থা আশ্রয়প্রার্থীদের ন্যায়বিচার পাওয়ার সুযোগ সীমিত করতে পারে। বিশেষ করে যাঁরা নিজ দেশে নির্যাতন, নিপীড়ন কিংবা গুরুতর বিপদের আশঙ্কায় পালিয়ে এসেছেন, তাঁদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা জরুরি।
ইউরোপীয় ইউনিয়ন অবশ্য বলছে, নতুন নিয়ম বাস্তবায়নের ক্ষেত্রেও মৌলিক অধিকার ও আন্তর্জাতিক আইনের বাধ্যবাধকতা মানতে হবে। ফলে কঠোর অভিবাসননীতি এবং আশ্রয়প্রার্থীদের আইনি সুরক্ষা—দুই বিষয়ই আগামী দিনে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার অংশ হয়ে থাকবে।
আগামী দিনগুলোতে কি হতে পারে ?
ইউরোপীয় ইউনিয়নের নতুন অভিবাসননীতি এখন বাস্তবায়নের পর্যায়ে। সীমান্তে নিবন্ধন ও যাচাই, দ্রুত আশ্রয়-প্রক্রিয়া এবং প্রত্যাবাসনসংক্রান্ত সহযোগিতার প্রভাব আগামী মাসগুলোতে আরও স্পষ্ট হতে পারে। তবে সব বিধান একই সময়ে কার্যকর হবে না; কিছু বিধান বাস্তবায়নের জন্য প্রস্তুতির সময় প্রয়োজন।
বাংলাদেশি নাগরিকদের জন্য সবচেয়ে জরুরি হলো, বৈধ পথে ইউরোপে যাওয়া, বসবাস ও কাজের অনুমতি হালনাগাদ রাখা এবং আশ্রয়ের আবেদন করার ক্ষেত্রে সত্য ও যাচাইযোগ্য তথ্য দেওয়া।
ইউরোপের দরজা পুরোপুরি বন্ধ হচ্ছে না; বরং কে প্রবেশ করতে পারবেন, কে থাকতে পারবেন এবং কার প্রত্যাবাসন হবে—সেই সিদ্ধান্তের প্রক্রিয়া আরও কঠোর ও সমন্বিত করার দিকে এগোচ্ছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন।