তথ্যনির্ভর ও বস্তুনিষ্ঠ সংবাদের জন্য—ভয়েস অব পিপল

লন্ডনে চালকবিহীন ট্যাক্সি নিয়ে উদ্বেগ, কর্মসংস্থান ও নিরাপত্তা নিয়ে বিতর্ক

লন্ডনে চালকবিহীন ট্যাক্সি নিয়ে উদ্বেগ, কর্মসংস্থান ও নিরাপত্তা নিয়ে বিতর্ক

লন্ডন, ২২ অক্টোবর : লন্ডনের রাস্তায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তিচালিত ট্যাক্সির যাত্রা শুরু হতেই কর্মসংস্থান, সড়কনিরাপত্তা ও যানজট নিয়ে বিতর্ক দেখা দিয়েছে। চালকবিহীন ট্যাক্সির বিস্তার নিজেদের জীবিকা হুমকির মুখে ফেলতে পারে বলে উদ্বেগ প্রকাশ করছেন উবারসহ বিভিন্ন ব্যক্তিগত ভাড়ার গাড়ির চালক। অন্যদিকে, প্রযুক্তিটির নিরাপত্তা ও নিয়ন্ত্রণ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে লন্ডন অ্যাসেম্বলির পরিবহন কমিটি।

গত ৩ সেপ্টেম্বর লন্ডনে উবার ও ব্রিটিশ প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান ওয়েভের যৌথ উদ্যোগে স্বয়ংক্রিয় গাড়িতে যাত্রী পরিবহন শুরু হয়। যুক্তরাজ্যে এ ধরনের যাত্রীসেবার প্রথম উদ্যোগ এটি। প্রাথমিক পর্যায়ে ১৫টি বৈদ্যুতিক ফোর্ড মুস্তাং মাক-ই গাড়ি দিয়ে কার্যক্রম শুরু হয়েছে। তবে গাড়িগুলো এখনো পুরোপুরি চালকবিহীন নয়; প্রতিটি গাড়িতে প্রশিক্ষিত ও লাইসেন্সধারী নিরাপত্তা চালক থাকছেন, যিনি প্রয়োজন হলে গাড়ির নিয়ন্ত্রণ নিতে পারেন।

কিংস ক্রসে চালকদের প্রতিবাদ

চালকবিহীন ট্যাক্সি চালুর প্রতিবাদে গত ১৭ অক্টোবর উত্তর লন্ডনের কিংস ক্রসে ওয়েভের কার্যালয়ের কাছে বিক্ষোভ করেন প্রায় ২০ জন ব্যক্তিগত ভাড়ার গাড়িচালক। তাঁদের আশঙ্কা, প্রযুক্তিটি দ্রুত বিস্তৃত হলে বহু চালক আয় হারাবেন এবং ভবিষ্যতে নতুন চালকদের জন্য এই পেশায় প্রবেশের সুযোগও কমে যেতে পারে।

বিক্ষোভে অংশ নেওয়া দীর্ঘদিনের উবারচালক আবদুরজাক হাদি নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তাঁর বক্তব্যের মর্ম হলো, নতুন প্রযুক্তির কাছে মানুষকে অপ্রয়োজনীয় হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে, অথচ চালকদেরও পরিবার রয়েছে এবং তাঁদের জীবিকা এই কাজের ওপর নির্ভরশীল।

চালকদের প্রতিনিধিত্বকারী অ্যাপ ড্রাইভার্স অ্যান্ড কুরিয়ার্স ইউনিয়ন বলছে, প্রযুক্তির পরিবর্তনের বোঝা যেন কেবল শ্রমিকদের ওপর চাপানো না হয়। স্বয়ংক্রিয় গাড়ির ব্যবহার বাড়লে ক্ষতিগ্রস্ত চালকদের জন্য ক্ষতিপূরণ, পুনঃপ্রশিক্ষণ ও বিকল্প কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করার দাবিও উঠেছে।

বাংলাদেশি চালকদের জন্য কেন গুরুত্বপূর্ণ?

লন্ডনে বহু ব্রিটিশ-বাংলাদেশি উবার, বোল্ট ও অন্যান্য ব্যক্তিগত ভাড়ার গাড়ি চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করেন। কারও কাছে এটি পূর্ণকালীন পেশা, আবার কেউ পরিবার চালানোর জন্য অতিরিক্ত আয়ের উৎস হিসেবে কাজটি বেছে নিয়েছেন।

চালকবিহীন গাড়ির সংখ্যা বাড়লে এই চালকদের ওপর কী প্রভাব পড়বে, তা এখনই নিশ্চিত করে বলা সম্ভব নয়। তবে যাত্রী পরিবহনের একটি অংশ যদি স্বয়ংক্রিয় গাড়ির হাতে চলে যায়, তাহলে প্রচলিত চালকদের আয় ও কাজের সুযোগে চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

বিশেষ উদ্বেগের বিষয় হলো, একজন মানবচালককে গাড়ি চালানোর পাশাপাশি যাত্রীকে সহায়তা করতে, পরিস্থিতি বুঝে সিদ্ধান্ত নিতে এবং জরুরি অবস্থায় দায়িত্ব নিতে হয়। অন্যদিকে, প্রযুক্তিনির্ভর গাড়ি পরিচালনায় সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা বাড়তে পারে। এর ফলে চালকদের কাজের ধরন ও কর্মসংস্থানের কাঠামো বদলে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

তবে সব চালকের কাজ একসঙ্গে হারিয়ে যাবে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর মতো নির্ভরযোগ্য প্রমাণ এখনো নেই। প্রযুক্তির বিস্তার কত দ্রুত হবে এবং যাত্রীরা কতটা গ্রহণ করবেন, তার ওপরও পরিস্থিতি নির্ভর করবে।

নিরাপত্তা ও যানজট নিয়ে প্রশ্ন

লন্ডনের রাস্তায় চালকবিহীন গাড়ি চালানোর চ্যালেঞ্জ অন্য অনেক শহরের তুলনায় জটিল। সরু সড়ক, ব্যস্ত মোড়, রাস্তা মেরামতের কাজ, সাইকেল আরোহী, পথচারী এবং বৈদ্যুতিক ভাড়ার সাইকেলের উপস্থিতির মধ্যে গাড়িগুলোকে চলাচল করতে হয়।

লন্ডন অ্যাসেম্বলির পরিবহন কমিটি জানিয়েছে, স্বয়ংক্রিয় যাত্রীবাহী গাড়ির সম্ভাব্য সুবিধা নিয়ে এখনো যথেষ্ট অনিশ্চয়তা রয়েছে। বিশেষ করে সড়কনিরাপত্তা, প্রতিবন্ধী যাত্রীদের সুবিধা, যানজট এবং গণপরিবহনের ওপর প্রভাব নিয়ে আরও মূল্যায়ন প্রয়োজন।

কমিটির সুপারিশের মধ্যে রয়েছে, পূর্ণাঙ্গভাবে চালকবিহীন ট্যাক্সি চালুর আগে নিরাপত্তা ও নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করা এবং লন্ডনে কতগুলো গাড়ি চলতে পারবে, সে বিষয়ে ট্রান্সপোর্ট ফর লন্ডনের ক্ষমতা বাড়ানো।

লন্ডন অ্যাসেম্বলির এক জরিপেও জনসাধারণের সংশয় ফুটে উঠেছে। ২০২৬ সালের জুনে ১,০৫৩ জন লন্ডনবাসীর ওপর পরিচালিত জরিপে ৪২ শতাংশ উত্তরদাতা স্বয়ংক্রিয় যাত্রীবাহী গাড়ি চালুর বিরোধিতা করেন। সমর্থন জানান ২৯ শতাংশ। জরিপে ৪৮ শতাংশ উত্তরদাতা জরুরি পরিস্থিতিতে গাড়ির প্রতিক্রিয়া জানানোর সক্ষমতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। সড়কনিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন ছিলেন ৪১ শতাংশ এবং প্রযুক্তিগত ত্রুটি নিয়ে উদ্বেগ জানান ৩৯ শতাংশ।

নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা কার হাতে থাকবে?

চালকবিহীন ট্যাক্সি পরিচালনার ক্ষেত্রে যুক্তরাজ্যের কেন্দ্রীয় সরকার ও লন্ডনের পরিবহন কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব নিয়েও বিতর্ক রয়েছে।

ট্রান্সপোর্ট ফর লন্ডন বা টিএফএল গাড়ি ও ব্যক্তিগত ভাড়ার পরিবহনসেবার লাইসেন্সিংয়ের দায়িত্ব পালন করে। অন্যদিকে, স্বয়ংক্রিয় গাড়ি পরিচালনার বৃহত্তর অনুমোদন ও নিয়ন্ত্রক কাঠামোয় কেন্দ্রীয় সরকারের ভূমিকা রয়েছে।

লন্ডন অ্যাসেম্বলির পরিবহন কমিটি চায়, রাজধানীতে স্বয়ংক্রিয় যাত্রীবাহী গাড়ির সংখ্যা ও পরিচালনা নিয়ন্ত্রণে টিএফএলকে আরও কার্যকর ক্ষমতা দেওয়া হোক। তাদের মতে, লন্ডনের সড়কব্যবস্থা ও পরিবহননীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে প্রযুক্তিটির ব্যবহার নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

অন্যদিকে, প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর যুক্তি হলো, স্বয়ংক্রিয় গাড়ি যাত্রীদের পরিবহনের নতুন সুযোগ তৈরি করতে পারে এবং ভবিষ্যতে প্রযুক্তি, প্রকৌশল ও সংশ্লিষ্ট খাতে নতুন কর্মসংস্থানের সম্ভাবনাও সৃষ্টি করতে পারে।

যাত্রীদের আগ্রহও বাড়ছে

চালকদের মধ্যে উদ্বেগ থাকলেও স্বয়ংক্রিয় গাড়িতে ভ্রমণের প্রতি আগ্রহ দেখা যাচ্ছে। উবার ও ওয়েভের তথ্য অনুযায়ী, লন্ডনে এই সেবা ব্যবহারের আগ্রহ জানিয়ে এক লাখের বেশি মানুষ অপেক্ষমাণ তালিকায় নাম লিখিয়েছেন। তবে আগ্রহ প্রকাশ করা আর নিয়মিত যাত্রী হওয়া এক বিষয় নয়।

প্রাথমিক পর্যায়ে উবারের নির্দিষ্ট কিছু সেবা ব্যবহারকারী যাত্রীকে স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তিসম্পন্ন গাড়ি দেওয়া হতে পারে। যাত্রী চাইলে সেই যাত্রা গ্রহণ করতে পারেন অথবা সাধারণ গাড়ি বেছে নিতে পারেন। বর্তমানে গাড়িতে নিরাপত্তা চালক থাকায় এটি সম্পূর্ণ চালকবিহীন পরিবহনব্যবস্থা নয়।

প্রযুক্তির অগ্রগতি, কিন্তু মানুষের জীবিকার কী হবে?

চালকবিহীন ট্যাক্সি নিয়ে বিতর্কের মূল প্রশ্ন শুধু প্রযুক্তি কতটা উন্নত, তা নয়। প্রযুক্তির সুবিধা কারা পাবেন এবং এর পরিবর্তনের মূল্য কাদের দিতে হবে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।

স্বয়ংক্রিয় গাড়ি যদি ভবিষ্যতে পরিবহনব্যবস্থার বড় অংশ হয়ে ওঠে, তাহলে চালকদের জন্য বিকল্প কর্মসংস্থান, পুনঃপ্রশিক্ষণ ও ন্যায্য রূপান্তরের পরিকল্পনা প্রয়োজন হবে। একই সঙ্গে নিরাপত্তা, ব্যক্তিগত তথ্যের সুরক্ষা, প্রতিবন্ধী যাত্রীদের সুবিধা এবং যানজটের ওপর প্রভাব নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করতে হবে।

লন্ডনের জন্য চ্যালেঞ্জ হলো, নতুন প্রযুক্তির সম্ভাবনা কাজে লাগানোর পাশাপাশি সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা ও কর্মসংস্থান রক্ষা করা। চালকবিহীন ট্যাক্সির ভবিষ্যৎ নির্ধারণে তাই প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর বাণিজ্যিক স্বার্থের পাশাপাশি চালক, যাত্রী, পরিবহন কর্তৃপক্ষ ও নগরবাসীর মতামতও গুরুত্ব পাওয়া প্রয়োজন।