তথ্যনির্ভর ও বস্তুনিষ্ঠ সংবাদের জন্য—ভয়েস অব পিপল
ফরাসি শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভে আলোচনায় ‘বিসমিল্লাহ, সে লে তেনেব্র’
ইউরোপ প্রতিনিধি, ২২ অক্টোবর:
ফ্রান্সে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভে ব্যঙ্গাত্মক স্লোগান হিসেবে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে ‘বিসমিল্লাহ, সে লে তেনেব্র’। আরবি ও ফরাসি ভাষার মিশ্রণে তৈরি অদ্ভুত এই বাক্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে ছড়িয়ে পড়েছে রাজপথে। এর মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা পুলিশের কথিত অনুপ্রবেশের চেষ্টা, নজরদারি এবং অভিবাসী বংশোদ্ভূত তরুণদের সম্পর্কে প্রচলিত পূর্বধারণাকে উপহাস করছেন।
ফরাসি সংবাদমাধ্যম টিভি৫মঁদ ও লে মোঁদ এবং আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা এএফপির প্রতিবেদন অনুযায়ী, অক্টোবরের শুরুতে স্লোগানটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। পরে ফ্রান্সের বিভিন্ন শহরে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভে হাতে লেখা প্ল্যাকার্ডেও এটি দেখা যায়।

কী অর্থ এই স্লোগানের?
আরবি ‘বিসমিল্লাহ’ শব্দের অর্থ ‘আল্লাহর নামে’। অন্যদিকে ফরাসি ‘সে লে তেনেব্র’ (C’est les ténèbres) কথাটির আক্ষরিক অর্থ ‘এটি অন্ধকার’ বা ‘এটি অন্ধকারাচ্ছন্ন’। তবে দুটি অংশ একসঙ্গে ব্যবহার করলে প্রচলিত ফরাসি ভাষায় কোনো সুস্পষ্ট অর্থ দাঁড়ায় না। এই অস্বাভাবিক শব্দের সমন্বয়ই স্লোগানটিকে হাস্যরসের উপাদানে পরিণত করেছে।
ফরাসি সংবাদমাধ্যমগুলোর বর্ণনা অনুযায়ী, ঘটনাটির সূত্রপাত স্ন্যাপচ্যাটে ছড়িয়ে পড়া একটি বার্তা থেকে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অবরোধ ও বিক্ষোভের আয়োজন নিয়ে আলোচনাকারী শিক্ষার্থীদের একটি গ্রুপে প্রবেশের চেষ্টা করা কয়েকটি অ্যাকাউন্ট থেকে বার্তা পাঠানো হয়েছিল বলে অভিযোগ ওঠে।
একটি বার্তায় লেখা ছিল, ‘বিসমিল্লাহ, সে লে তেনেব্র’, এরপর বলা হয়, কখন অবরোধ হবে এবং ‘আমরা সবকিছু ভেঙে ফেলব’। বার্তাটিতে আলজেরিয়ার পতাকার ইমোজিও ছিল। ‘মামাদু’ ছদ্মনাম ব্যবহারকারী একটি অ্যাকাউন্টের সঙ্গে বার্তাটি যুক্ত করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনা শুরু হয়।

পুলিশের অনুপ্রবেশের অভিযোগ
বার্তাগুলোর ভাষা ও ভঙ্গি দেখে কয়েকজন শিক্ষার্থী সন্দেহ করেন, কোনো পুলিশ সদস্য হয়তো শিক্ষার্থীর ছদ্মবেশে আন্দোলনকারীদের গ্রুপে প্রবেশের চেষ্টা করেছিলেন। তাদের অভিযোগ, বার্তাগুলোতে অভিবাসী বংশোদ্ভূত তরুণদের কথাবার্তার একটি কৃত্রিম ও গতানুগতিক অনুকরণ দেখা যায়।
তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, বার্তাগুলোর প্রকৃত লেখক কে, তা স্বাধীনভাবে নিশ্চিত করা যায়নি। ফরাসি সংবাদমাধ্যমও এ বিষয়ে সতর্কতা অবলম্বন করেছে। ফলে কোনো পুলিশ সদস্যই যে বার্তাগুলো পাঠিয়েছিলেন, তা প্রমাণিত সত্য হিসেবে বলা যায় না।
শিক্ষার্থীরা অবশ্য এই অদ্ভুত বাক্যটিকেই ব্যঙ্গের অস্ত্র হিসেবে গ্রহণ করেন। তাদের কাছে এটি কর্তৃপক্ষের কথিত নজরদারি এবং তরুণদের ভাষা ও সংস্কৃতি বুঝতে ব্যর্থ হওয়ার প্রতীক হয়ে ওঠে।
বিক্ষোভের পেছনে শিক্ষাব্যবস্থার সংকট
স্লোগানটির জনপ্রিয়তার পেছনে রয়েছে ফ্রান্সের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে শিক্ষার্থীদের অসন্তোষ। গত সেপ্টেম্বর থেকে শুরু হওয়া আন্দোলনে শিক্ষার্থীরা পর্যাপ্ত শিক্ষক নিয়োগ, জরাজীর্ণ ভবন ও অবকাঠামোর উন্নয়ন, শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমানো এবং অতিরিক্ত শিক্ষাগত চাপ কমানোর দাবি জানিয়ে আসছেন।
লে মোঁদ ও ইউরোনিউজের প্রতিবেদন অনুযায়ী, আন্দোলনটি অল্প সময়ের মধ্যে বহু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছড়িয়ে পড়ে। শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভের পাশাপাশি কয়েকটি স্থানে ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ ও পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটে।
ইউরোনিউজের ৪ অক্টোবরের প্রতিবেদনে ফ্রান্সের শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের তথ্য উদ্ধৃত করে বলা হয়, আন্দোলনে ক্ষতিগ্রস্ত ৭৩৫টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ২৪টি স্কুলে আগুন দেওয়া হয়েছিল অথবা লুটপাট চালানো হয়েছিল। তবে এসব ঘটনার দায় সব বিক্ষোভকারীর ওপর চাপানো যায় না।
বিক্ষোভের সঙ্গে পুলিশের কঠোর পদক্ষেপ নিয়ে বিতর্কও বাড়ে। লে মোঁদ-এর ৮ অক্টোবরের প্রতিবেদনে বলা হয়, ২৮ সেপ্টেম্বর থেকে ৫ অক্টোবরের মধ্যে ৬ হাজার ৫৯ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল বলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হিসাব জানায়। পুলিশের আচরণ ও কিশোরদের ওপর বলপ্রয়োগের ঘটনা নিয়েও সমালোচনা তৈরি হয়।

বর্ণগত পূর্বধারণা নিয়ে বিতর্ক
ফ্রান্সের সাবেক উপনিবেশগুলো থেকে আসা পরিবারগুলোর সন্তানসহ আরব ও কৃষ্ণাঙ্গ বংশোদ্ভূত নাগরিকদের একটি অংশ দীর্ঘদিন ধরে বৈষম্যের অভিযোগ করে আসছেন। বিক্ষোভকারীদের একাংশের মতে, আলোচিত স্ন্যাপচ্যাট বার্তায় ভাঙচুরকারী তরুণদের আরব বা অভিবাসী বংশোদ্ভূত হিসেবে কল্পনা করার যে প্রবণতা ফুটে উঠেছে, তা বর্ণগত পূর্বধারণার উদাহরণ।
তাদের বক্তব্য, শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে প্রবেশের চেষ্টা হয়ে থাকলে সেটি শুধু নজরদারির প্রশ্ন নয়; তরুণদের ভাষা, পরিচয় ও সামাজিক বাস্তবতা সম্পর্কে কর্তৃপক্ষের ধারণা নিয়েও প্রশ্ন তোলে।
তবে বার্তার লেখক ও তাঁর পরিচয় নিশ্চিত না হওয়ায় এর ভিত্তিতে পুলিশ বিভাগকে সামগ্রিকভাবে বর্ণবাদী বলে সিদ্ধান্তে পৌঁছানোও তথ্যসম্মত হবে না।

ফ্রান্সের বাইরেও ছড়াচ্ছে স্লোগান
টিভি৫মঁদের ১৬ অক্টোবরের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ‘বিসমিল্লাহ, সে লে তেনেব্র’ ফ্রান্সের বাইরেও পরিচিতি পেয়েছে। বেলজিয়ামের বিক্ষোভেও স্লোগানটি ব্যবহারের খবর এসেছে। সুইডিশ পরিবেশবাদী কর্মী গ্রেটা থুনবার্গও শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের প্রতি সমর্থন জানানো একটি ভিডিওতে বাক্যটি পুনরাবৃত্তি করেন।
এভাবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের একটি অস্বাভাবিক বার্তা তরুণদের প্রতিবাদী সংস্কৃতির অংশ হয়ে উঠেছে। স্লোগানটি একই সঙ্গে হাস্যরস, কর্তৃপক্ষের প্রতি অবিশ্বাস এবং বৈষম্যবিরোধী ক্ষোভ প্রকাশের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।