“যেখানে সময়ের শব্দে উঠে আসে সত্য”
কলিকালের কলধ্বনি ।। ১৬৬।। দেশে চাঁদাবাজি যখন বিশাল অর্থনৈতিক সেক্টর
উৎসর্গ
চাঁদাবাজির শিকার নিরীহ ব্যবসায়ী, শ্রমজীবী মানুষ ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো সাহসী নাগরিকদের প্রতি।

বাংলাদেশে চাঁদাবাজি আজ এক সর্বগ্রাসী রূপ নিয়েছে। গরুকে ঘাস খাওয়ানোর জায়গা থেকে শুরু করে ফুটপাতের ক্ষুদ্র ব্যবসা, বাজারের দোকান, ট্রাক-বাস, নৌযান, নির্মাণকাজ, ইন্টারনেট সেবা এবং বড় বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠান—অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের নানা স্তরে চাঁদা দাবির অভিযোগ উঠছে। কোথাও অল্প অঙ্কের দৈনিক টাকা, কোথাও মাসিক নির্দিষ্ট অর্থ, আবার কোথাও কোটি কোটি টাকা এককালীন দাবি করার অভিযোগ রয়েছে। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, চাঁদাবাজি যেন দেশের অর্থনীতির ওপর চেপে বসা এক অনানুষ্ঠানিক করব্যবস্থা। পার্থক্য শুধু এই যে, রাষ্ট্রের করের নির্দিষ্ট আইন, হিসাব ও জবাবদিহি আছে; চাঁদাবাজির আছে ভয়, হুমকি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ।
বাংলাদেশ থেকে প্রকাশিত বিভিন্ন সংবাদপত্রের প্রতিবেদন, ব্যবসায়ীদের অভিযোগ এবং জনপ্রতিনিধি ও সরকারি কর্মকর্তাদের বক্তব্যে চাঁদাবাজির নানা ধরন উঠে এসেছে। রাজধানীর গাবতলী ও মিরপুরে ইট-বালুর গদিঘর, পণ্যবাহী ট্রাক, নৌযান, বাজার ও পরিবহনকেন্দ্র ঘিরে অর্থ আদায়ের অভিযোগ রয়েছে। কারওয়ান বাজারে প্রতিদিন কোটি কোটি টাকা চাঁদা আদায়ের দাবিও সংবাদে এসেছে। চট্টগ্রাম বন্দরে অবৈধ অর্থ আদায়ের বিপুল অঙ্কের হিসাবও সরকারি পর্যায়ের বক্তব্যে উঠে এসেছে। অন্যদিকে গুলিস্তানের ফুটপাত, চট্টগ্রামের নির্মাণকাজ ও ইন্টারনেট ব্যবসা এবং নারায়ণগঞ্জের শিল্পপ্রতিষ্ঠান ঘিরেও চাঁদা দাবির অভিযোগ প্রকাশিত হয়েছে।
তবে এসব অভিযোগের সবগুলো প্রমাণিত নয়, আর প্রকাশিত অঙ্কগুলো যোগ করে সারা দেশে দৈনিক চাঁদাবাজির মোট পরিমাণ নির্ধারণ করাও সম্ভব নয়। কোনো অঙ্ক অভিযোগকারীর বক্তব্য, কোনোটি আনুমানিক হিসাব, আবার কিছু দাবি নিয়ে মতবিরোধ রয়েছে। ফলে চাঁদাবাজি কত বড় অর্থনৈতিক বোঝা হয়ে উঠেছে, তা বুঝতে হলে আবেগের পাশাপাশি দরকার নির্ভরযোগ্য তথ্য, তদন্ত ও হিসাব।

চাঁদাবাজি কি সমান্তরাল অর্থনীতি?
একজন ফুটপাতের দোকানদার প্রতিদিন কিছু টাকা দেন, একজন ট্রাকচালক পথে পথে অর্থ দেওয়ার অভিযোগ করেন, একজন বাজার ব্যবসায়ী মাসিক চাঁদার চাপে পড়েন, আর একজন শিল্পোদ্যোক্তার কাছে কোটি টাকা দাবি করা হয়—ঘটনাগুলোর মাত্রা আলাদা হলেও মূল সমস্যাটি একই: বৈধ ব্যবসা পরিচালনার বাইরে কাউকে অবৈধ অর্থ দিতে বাধ্য করার চেষ্টা।
এভাবে অর্থ আদায় দীর্ঘদিন চলতে থাকলে তা শুধু আইনশৃঙ্খলার সমস্যা থাকে না; এটি অর্থনীতির ওপর অতিরিক্ত ও অস্বচ্ছ ব্যয়ের বোঝা হয়ে দাঁড়ায়। ব্যবসায়ী তাঁর ক্ষতি পুষিয়ে নিতে পণ্যের দাম বাড়াতে পারেন, পরিবহন খরচ বাড়তে পারে, নতুন বিনিয়োগ নিরুৎসাহিত হতে পারে। শেষ পর্যন্ত চাঁদাবাজির চাপের একটি অংশ সাধারণ ক্রেতার পকেট থেকেই বেরিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে।
চাঁদাবাজি তাই এক ধরনের অদৃশ্য মূল্যবৃদ্ধির ঝুঁকি তৈরি করে। রাষ্ট্রকে কর দিতে হয় আইন মেনে; কিন্তু চাঁদা দিতে হয় এমন এক ব্যবস্থায়, যেখানে রসিদ নেই, নির্ধারিত হার নেই, আপিলের সুযোগ নেই, আর অর্থের বিনিময়ে বৈধ অধিকার নিশ্চিত হওয়ারও নিশ্চয়তা নেই। এটিকে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের ওপর অবৈধ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা হিসেবেও দেখা যায়।
সমস্যার শিকড় কোথায়?
চাঁদাবাজি কেবল কিছু অপরাধীর ব্যক্তিগত লোভের ফল—এভাবে দেখলে সমস্যার গভীরতা বোঝা যায় না। যেখানে ব্যবসার প্রবেশপথ, বাজারের জায়গা, পরিবহন রুট, নির্মাণকাজ কিংবা সরকারি সেবা পেতে প্রভাবশালী কারও অনুমোদন বা ‘ম্যানেজ’ করার প্রয়োজন তৈরি হয়, সেখানে অবৈধ অর্থ আদায়ের সুযোগ বাড়ে।
এর সঙ্গে যুক্ত হতে পারে রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা, স্থানীয় ক্ষমতার বলয়, দুর্বল নজরদারি, মামলার দীর্ঘসূত্রতা, সাক্ষীদের নিরাপত্তাহীনতা এবং অপরাধের অর্থ কোথায় যাচ্ছে তা শনাক্ত করতে না পারা। অভিযোগের মুখে থাকা ব্যক্তিদের রাজনৈতিক পরিচয় যাই হোক, তদন্তের মানদণ্ড হতে হবে একই। পরিচয় দেখে কাউকে ছাড় দেওয়া বা অভিযোগের ভিত্তিতেই কাউকে অপরাধী ঘোষণা করা—দুটিই আইনের শাসনের পরিপন্থী।
আরেকটি সমস্যা হলো, অনেক ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী অল্প অঙ্কের টাকা দিয়ে ঝামেলা এড়াতে চান। তাঁদের কাছে মামলা করা, সাক্ষ্য দেওয়া কিংবা ব্যবসা বন্ধ রেখে প্রতিবাদ করার খরচ অনেক বেশি। ফলে অনেকে নীরব থাকেন। এই নীরবতা অপরাধীদের সাহস জোগাতে পারে। তবে ভুক্তভোগীদের দোষারোপ করে লাভ নেই; নিরাপদে অভিযোগ জানানোর পরিবেশ তৈরি করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব।
সরকারকে যা করতে হবে
প্রথমত, চাঁদাবাজির প্রকৃত চিত্র নির্ণয় করতে হবে। সরকারকে পুলিশি অভিযোগ, মামলা, বাজার ও পরিবহন সমিতির তথ্য, বন্দর কর্তৃপক্ষের নথি এবং ব্যবসায়ীদের সাক্ষ্য নিয়ে খাতভিত্তিক একটি নির্ভরযোগ্য চিত্র তৈরি করতে হবে। কোন এলাকায় কোন ধরনের অর্থ আদায়ের অভিযোগ বেশি, কারা ক্ষতিগ্রস্ত, কত অভিযোগ তদন্তাধীন এবং কত মামলায় অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে—এসব তথ্য নিয়মিত প্রকাশ করা উচিত। যাচাই ছাড়া জাতীয় দৈনিক চাঁদার অঙ্ক ঘোষণা করলে সমস্যার সমাধানের বদলে বিভ্রান্তি বাড়বে।
দ্বিতীয়ত, রাজনৈতিক পরিচয়ের ঊর্ধ্বে থেকে আইন প্রয়োগ করতে হবে। ক্ষমতাসীন দল, বিরোধী দল কিংবা কোনো দলের পরিচয়হীন—কারও বিরুদ্ধে নির্ভরযোগ্য প্রমাণ পাওয়া গেলে একই আইনে তদন্ত ও বিচার নিশ্চিত করতে হবে। শুধু মাঠপর্যায়ের টাকা সংগ্রহকারীদের গ্রেপ্তার করে থেমে গেলে চলবে না; অভিযোগের সত্যতা প্রমাণিত হলে অর্থের মূল সুবিধাভোগী, পৃষ্ঠপোষক ও সংগঠিত নেটওয়ার্কের ভূমিকা খতিয়ে দেখতে হবে। একই সঙ্গে অভিযুক্ত ব্যক্তির ন্যায়সংগত আইনি অধিকারও অক্ষুণ্ণ রাখতে হবে।
তৃতীয়ত, বাজার, ফুটপাত, পরিবহন ও বন্দরের ব্যবস্থাপনা স্বচ্ছ করতে হবে। কোথায় বৈধ ফি দিতে হবে, কত দিতে হবে, কোন কর্তৃপক্ষ টাকা নেবে—এসব তথ্য প্রকাশ্যে টাঙিয়ে রাখতে হবে। সরকারি ও অনুমোদিত ফি ডিজিটাল পদ্ধতিতে নেওয়া, তাৎক্ষণিক রসিদ দেওয়া এবং লেনদেনের নিরীক্ষাযোগ্য রেকর্ড রাখা হলে অবৈধ আদায়ের সুযোগ কমতে পারে। ফুটপাতের ব্যবসায়ীদের উচ্ছেদ করাই একমাত্র সমাধান নয়; তাঁদের জন্য স্বচ্ছ বরাদ্দ, নির্ধারিত ফি ও কার্যকর অভিযোগব্যবস্থাও দরকার।
চতুর্থত, অভিযোগকারী ও সাক্ষীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। চাঁদা দিতে অস্বীকার করলে হামলা, ব্যবসা বন্ধের হুমকি কিংবা প্রতিশোধের আশঙ্কা থাকলে মানুষ অভিযোগ করবেন না। গোপনীয়তা রক্ষা করে অভিযোগ জানানোর ব্যবস্থা, দ্রুত সাড়া দেওয়ার জন্য নির্দিষ্ট দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা এবং ঝুঁকিতে থাকা সাক্ষীদের সুরক্ষা প্রয়োজন। অভিযোগ গ্রহণ করেই তা ফেলে রাখা হলে জনগণের আস্থা তৈরি হবে না।
পঞ্চমত, অপরাধলব্ধ অর্থের প্রবাহ অনুসন্ধান করতে হবে। বড় অঙ্কের চাঁদা আদায়ের অভিযোগের ক্ষেত্রে অর্থ কোথা থেকে এসেছে, কার কাছে গেছে, কীভাবে খরচ বা বিনিয়োগ হয়েছে—এসব অনুসন্ধান জরুরি। আইনসম্মত প্রক্রিয়ায় আর্থিক লেনদেন বিশ্লেষণ, সন্দেহজনক সম্পদের উৎস যাচাই এবং প্রমাণের ভিত্তিতে সম্পদ জব্দ বা বাজেয়াপ্ত করার ব্যবস্থা অপরাধের লাভ কমাতে পারে।
ষষ্ঠত, পুলিশ ও স্থানীয় প্রশাসনের জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। কোনো কর্মকর্তা চাঁদাবাজিতে সহযোগিতা করেছেন—এমন অভিযোগ উঠলে স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্ত হতে হবে। অভিযোগ সত্য হলে বিভাগীয় ও ফৌজদারি ব্যবস্থা নিতে হবে। আবার তদন্তে প্রমাণ না পাওয়া গেলে কাউকে অযথা হয়রানি করাও চলবে না। জবাবদিহি হতে হবে প্রমাণভিত্তিক, প্রচারনির্ভর নয়।

জনগণ কী করতে পারে?
চাঁদাবাজি প্রতিরোধের দায়িত্ব শুধু সরকারের নয়, তবে জনগণের ওপর এমন দায়িত্ব চাপিয়ে দেওয়া যাবে না, যা পালনের জন্য তাঁদের নিরাপত্তা নেই। তাই জনগণের ভূমিকা হতে হবে সম্মিলিত, সতর্ক ও আইনসম্মত।
প্রথম কাজ হলো, নিরাপদ হলে চাঁদা দাবির সময়, স্থান, অর্থের পরিমাণ, ব্যবহৃত ফোন নম্বর, বার্তা, রসিদ বা অন্য প্রাসঙ্গিক তথ্য সংরক্ষণ করা। প্রত্যক্ষদর্শী ও ভুক্তভোগীদের বক্তব্য পরবর্তী তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। তবে প্রমাণ সংগ্রহের জন্য নিজেকে বিপদে ফেলা, সংঘর্ষে জড়ানো কিংবা ঝুঁকিপূর্ণ ব্যক্তির মুখোমুখি হওয়া উচিত নয়।
দ্বিতীয়ত, ব্যবসায়ী সমিতি, পরিবহন সংগঠন, বাজার কমিটি ও স্থানীয় নাগরিকদের সম্মিলিত অভিযোগব্যবস্থা গড়ে তোলা যেতে পারে। একজন ক্ষুদ্র দোকানদারের পক্ষে একা প্রতিবাদ করা কঠিন; কিন্তু নিরাপদ ও আইনসম্মত পদ্ধতিতে একাধিক ভুক্তভোগীর তথ্য একত্র হলে তদন্তের ভিত্তি শক্তিশালী হতে পারে। সংগঠনগুলোকে নিশ্চিত করতে হবে, তারা যেন নিজেরাই কোনো অনানুষ্ঠানিক আদায়ব্যবস্থার অংশ না হয়।
তৃতীয়ত, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অভিযোগ প্রকাশের আগে তথ্য যাচাই করতে হবে। কারও নাম, ছবি বা পরিচয় দিয়ে অপরাধী ঘোষণা করলে নিরপরাধ ব্যক্তির ক্ষতি হতে পারে এবং তদন্ত বাধাগ্রস্ত হতে পারে। প্রমাণযোগ্য তথ্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ও দায়িত্বশীল সংবাদমাধ্যমের কাছে দেওয়া বেশি কার্যকর। গণমাধ্যমেরও উচিত অভিযোগ ও প্রমাণের মধ্যে স্পষ্ট পার্থক্য রাখা এবং যাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ, তাঁর বক্তব্য নেওয়ার চেষ্টা করা।
চতুর্থত, নাগরিকদের এমন জনপ্রতিনিধি ও সংগঠনের কাছে জবাবদিহি দাবি করতে হবে, যারা বাজার, পরিবহন বা স্থানীয় ব্যবসার নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্বে রয়েছেন। চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে অবস্থান কেবল বক্তৃতায় সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না; অভিযোগের নিষ্পত্তি, তদন্তের অগ্রগতি ও আইনি পদক্ষেপের ফলাফল জানতে হবে।
তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কথা হলো, চাঁদা দিতে বাধ্য হওয়া ভুক্তভোগীকে অপরাধী বা সহযোগী হিসেবে দোষারোপ করা যাবে না। অনেকেই ব্যবসা, জীবিকা কিংবা পরিবারের নিরাপত্তা রক্ষার জন্য বাধ্য হয়ে টাকা দেন। তাঁদের নিরাপত্তা ও সহায়তা নিশ্চিত না করে শুধু ‘চাঁদা দেবেন না’ বললে বাস্তব সমস্যার সমাধান হবে না।
রাজনৈতিক সদিচ্ছা ছাড়া পরিবর্তন সম্ভব?
চাঁদাবাজি দমনের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হলো—আইন কি সবার জন্য সমানভাবে প্রয়োগ করা হচ্ছে? সরকার যদি শুধু বিরোধী পক্ষের বিরুদ্ধে অভিযোগে দ্রুত ব্যবস্থা নেয়, কিন্তু নিজ দলের কারও বিরুদ্ধে অভিযোগ এলে নীরব থাকে, তাহলে জনগণের আস্থা নষ্ট হবে। একইভাবে, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলেই প্রমাণ ছাড়াই তাকে অপরাধী হিসেবে উপস্থাপন করাও গ্রহণযোগ্য নয়।
চাঁদাবাজি বন্ধে সরকারের ঘোষণার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো বাস্তব ফলাফল: অভিযোগকারীরা নিরাপদ কি না, ব্যবসায়ীরা অবৈধ অর্থ দেওয়া থেকে মুক্তি পাচ্ছেন কি না, মামলার তদন্ত এগোচ্ছে কি না, আর প্রমাণিত অপরাধের অর্থনৈতিক সুবিধা বন্ধ হচ্ছে কি না। এসব প্রশ্নের উত্তর নিয়মিত প্রকাশ করা গেলে সরকার নিজেও তার কার্যক্রমের অগ্রগতি মূল্যায়ন করতে পারবে।
চাঁদামুক্ত অর্থনীতি শুধু আইনশৃঙ্খলার বিষয় নয়
বাংলাদেশে ব্যবসা-বাণিজ্য ও কর্মসংস্থান বাড়াতে হলে উদ্যোক্তাকে জানতে হবে—ব্যবসা চালানোর বৈধ খরচ কত, কোন অনুমতি কোথা থেকে নিতে হবে এবং কোন ফি সরকার নির্ধারণ করেছে। এর বাইরে কাউকে টাকা দিতে হবে—এমন ভয় থাকলে নতুন বিনিয়োগ নিরুৎসাহিত হতে পারে। ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, পরিবহনশ্রমিক ও সাধারণ ক্রেতার ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হয়।
চাঁদাবাজিকে তাই বিচ্ছিন্ন অপরাধ হিসেবে নয়, অর্থনৈতিক সুশাসনের সমস্যা হিসেবেও দেখতে হবে। স্বচ্ছ ফি-ব্যবস্থা, কার্যকর তদন্ত, নিরাপদ অভিযোগব্যবস্থা, স্বাধীন বিচারপ্রক্রিয়া এবং রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতার বিরুদ্ধে নিরপেক্ষ পদক্ষেপ—সবকিছুর সমন্বয় প্রয়োজন।
দেশের অর্থনীতি কোনো ব্যক্তি, গোষ্ঠী বা দলের ব্যক্তিগত আয়ের উৎস হতে পারে না। বাজারে ব্যবসা করতে, পণ্য পরিবহন করতে, নির্মাণকাজ চালাতে কিংবা শিল্পপ্রতিষ্ঠান পরিচালনা করতে হলে আইনসম্মত খরচ দিতে হবে—ভয় দেখিয়ে আদায় করা অর্থ নয়। সরকারকে সেই পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে, আর জনগণকে নিরাপদ ও আইনসম্মত উপায়ে জবাবদিহি দাবি করতে হবে।
চাঁদাবাজির শিকড় উপড়ে ফেলার জন্য তাই প্রয়োজন রাজনৈতিক সদিচ্ছা, প্রমাণভিত্তিক তদন্ত, স্বচ্ছ প্রশাসন এবং জনগণের আস্থা। এসব নিশ্চিত করা গেলে চাঁদাবাজির অনানুষ্ঠানিক অর্থনৈতিক বোঝা কমানো সম্ভব হবে। অন্যথায়, চাঁদার টাকা শেষ পর্যন্ত ব্যবসায়ীর ক্ষতি, শ্রমিকের অনিশ্চয়তা এবং সাধারণ মানুষের বাড়তি ব্যয় হয়েই ফিরে আসবে।
লেখক: সম্পাদক, কলামিস্ট, বিশ্লেষক, গল্পকার ও সাবেক অধ্যাপক
লন্ডন, ১৮ অক্টোবর, ২০২৬