দৈনিক কালের কন্ঠ পত্রিকার সৌজন্যে
ওই দেড় বছর আমি কোনো আলোচনায় নেই অথচ আমাকে নিয়ে চলে নানা চক্রান্ত— রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন
নোট: ভয়েস অব পিপল-এর পাঠকের কথা চিন্তা করে আমরা রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের এই সাক্ষাৎকারটি হুবুহু তুলে ধরলাম। এজন্য বাংলাদেশ থেকে বহুল প্রচারিত ‘দৈনিক কালের কণ্ঠ’ পত্রিকার প্রতি আমরা গভীরভাবে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি-সম্পাদক

বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিন
এ যেন এক প্রাসাদবন্দি রাষ্ট্রপতির রোমহর্ষক গল্প। টানা দেড় বছরের সেই বন্দিদশা আর নেই। আর সেই স্বস্তিতেই রুদ্ধকালের ঘটনাপঞ্জি প্রাণখুলে তুলে ধরলেন রাষ্ট্রপ্রধান মো. সাহাবুদ্দিন। গত শুক্রবার রাতে বঙ্গভবনে রাষ্ট্রপতির কার্যালয়ে তাঁর একান্ত সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন কালের কণ্ঠের নির্বাহী সম্পাদক হায়দার আলী ও বিশেষ প্রতিনিধি জয়নাল আবেদীন।
হায়দার আলী: আসসালামু আলাইকুম। কেমন আছেন মহামান্য?
রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন: সপ্তাহখানেক ধরে ভালো আছি বেশ।
হায়দার আলী: তার আগে ভালো ছিলেন না?
(রাষ্ট্রপতির মুখে রহস্যের হাসি)
হায়দার আলী: অন্তর্বর্তী সরকারের দেড় বছর বঙ্গভবনে আপনার কেমন কেটেছে?
রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন: (কিছুক্ষণ নীরব থেকে, তারপর একটি দীর্ঘ শ্বাস নিয়ে) ওই দেড় বছর আমি কোনো আলোচনায় নেই অথচ আমাকে নিয়ে চলে নানা চক্রান্ত।
কালের কণ্ঠ: একটু যদি বিস্তারিত বলেন।
রাষ্ট্রপতি: দেশের শান্তি-শৃঙ্খলা চিরতরে ধ্বংস করার এবং সাংবিধানিক শূন্যতা সৃষ্টি করার অনেক পাঁয়তারা হয়েছে। (এটুকু বলে মহামান্য নীরব)
কালের কণ্ঠ: সেসব কি সফল হয়েছে?
রাষ্ট্রপতি: আমি দৃঢ়চিত্তে আমার সিদ্ধান্তে অবিচল ছিলাম। যে কারণে কোনো ষড়যন্ত্রই সফল হয়নি। বিশেষ করে অসাংবিধানিক উপায়ে রাষ্ট্রপতিকে উপড়ে ফেলার অসংখ্য ছক ব্যর্থ হয়েছে। ফলে দেড় বছর বঙ্গভবনের অভিজ্ঞতা যে ভালো, তা বলা যাবে না। আমার ওপর দিয়ে যে ঝড় গেছে, এ রকম ঝড় সহ্য করার মতো ক্ষমতা অন্য কারো ছিল কি না আমি জানি না।
কালের কণ্ঠ: আপনার পদত্যাগ দাবিতে বিক্ষোভ হতে দেখেছি। বঙ্গভবন অভিমুখে মিছিল হয়েছে, আন্দোলন হয়েছে। সে পরিস্থিতিতে বঙ্গভবনের ভেতরের পরিবেশ কেমন ছিল? আপনার ভাবনা কী ছিল?
রাষ্ট্রপতি: আমাকে কতভাবে উপড়ে ফেলার চেষ্টা করা হয়েছে! কোনো পরিস্থিতিতেই আমি ভেঙে পড়িনি। আমি বলেছি, আমার রক্ত ঝরে যাবে বঙ্গভবনে। রক্ত ঝরে ঝরুক। আরেক ইতিহাসে আমি যোগ হব। কিন্তু আমি সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা রক্ষা করব—আমি এই সিদ্ধান্তেই অবিচল ছিলাম। আল্লাহর ইচ্ছা আর আমার দৃঢ়তা।
কালের কণ্ঠ: কে বা কাদের নেতৃত্বে ওই আন্দোলন হয়েছিল? কেনই বা আপনার প্রতি এত আক্রোশ ছিল তাদের?
রাষ্ট্রপতি: ২২ অক্টোবর ২০২৪, বঙ্গভবন ঘেরাও হলো। অমুকের দল, তমুকের দল, মঞ্চ, ঐক্য—কত কী! রাতারাতি সৃষ্টি! এগুলো একই টাইপের লোকজন সব বিভিন্ন ফোরামে, বিভিন্ন নামে। কোথায় তারা এত টাকা পেল?
এখানে যখন ঘেরাও করল, সেনাবাহিনীর নবম ডিভিশন থেকে ফোর্স এসে তিন স্তরে নিরাপত্তা দিল। তারপর ওই যে মেয়েটা, লাফ দিয়ে কাঁটাতারের বেড়ার ওপরে উঠে ঝাঁপ দেয়। কী আশ্চর্যের ব্যাপার! এগুলো ভাড়াটিয়া। তারপর যখন সাউন্ড গ্রেনেড মারা হলো, লাফ দিয়ে পড়ল। পড়ার পর সে পড়েই থাকবে, ছবি তোলা হবে। সে ডাকছে ক্যামেরাম্যানকে, ‘ছবি তোলো, ছবি তোলো’। মানে এটা দিয়ে সে ব্ল্যাকমেইল করবে। তারপর তাকে মহিলা পুলিশ দিয়ে আর মহিলা আর্মি দিয়ে টেনেহিঁচড়ে তুলে আর্মির জিপে করে নিয়ে যায়।
ওই রাতটা আমার জন্য ছিল বিভীষিকাময়। ফ্লাইওভার দিয়ে পেছনে, ওদিকে ঠেলাগাড়ি, ভ্যান, কাভার্ড ভ্যান—সব জায়গায় ছিন্নমূল লোকজন আসে। গণভবনের মতো বঙ্গভবনও লুট করতে চেয়েছিল। আমরা তো ঘরেই ছিলাম। আমাদের তো আর কিছু নেই, এখান থেকে তো আমি পালাব না। তিন স্তরের নিরাপত্তা দিয়ে কভার করা হয়েছে। সেনাবাহিনী দৃঢ়তার সঙ্গে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নিয়েছে। রাত ১২টার সময় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতা নাহিদ ইসলাম ফোন করল, ‘এ রকম একটা খবর পাওয়া গেছে, ওরা আমাদের লোক না। আমরা ডিসপার্স করার চেষ্টা করছি।’
রাত ২টা পর্যন্ত আমরা জেগে আছি। বিভিন্ন জায়গায় তারা মিটিং করছে—‘রাষ্ট্রপতির অপসারণ চাই’। রাজু ভাস্কর্যের ওখানে, বিভিন্ন ছোট গ্রুপে।
কালের কণ্ঠ: সেই দুঃসময়ে কাউকে পাশে পেয়েছিলেন?
রাষ্ট্রপতি: আমি নির্দ্বিধায় বলতে পারি, ওই কঠিন সময়েও বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্ব আমার পাশে ছিলেন। বিশেষ করে বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে ঘিরে আমার কৌতূহল জমা ছিল। কিন্তু বুঝতে পারলাম, তিনি আন্তরিক। হি ওয়াজ সো কর্ডিয়াল! আমার দুঃসময়ে বিএনপির সহযোগিতা শতভাগ ছিল।
কালের কণ্ঠ: অন্তর্বর্তী সরকারের ভেতর থেকে রাষ্ট্রপতি অপসারণের উদ্যোগ কেন নেওয়া হয়েছিল, আর কারা এর ইন্ধন জুগিয়েছিল বলে মনে করেন?
রাষ্ট্রপতি: মূলত গণ-অভ্যুত্থানের কিছু নেতার চাপে আমাকে অপসারণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। রাজনৈতিক দলগুলো নিজেদের মধ্যে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেয়। পরে দেখা গেল দুটি গ্রুপ হয়ে গেল। একদিকে বিএনপি ও তাদের জোটসঙ্গীরা, আরেকদিকে অন্য দলগুলো। শেষ পর্যন্ত বিএনপির কারণে উদ্যোগ ব্যর্থ হয়।
কালের কণ্ঠ: এরপর নতুন করে আর কোনো উদ্যোগ ছিল আপনার বিষয়ে?
রাষ্ট্রপতি: হ্যা, শেষ সময় পর্যন্ত চেষ্টা চলেছিল—কিভাবে আমাকে উপড়ে ফেলা যায়। অন্তর্বর্তী সরকারের পক্ষ থেকেও পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল। একটি অসাংবিধানিক চেষ্টায় সাবেক প্রধান বিচারপতিকে আমার জায়গায় বসানোর ছক করা হয়। কিন্তু বিচারপতি রাজি হননি। উনি বললেন, ‘আমি রাষ্ট্রপতির জায়গায় অসাংবিধানিকভাবে বসতে পারি না।’ ফলে উদ্যোগ ব্যর্থ হয়।
কালের কণ্ঠ: আপনার সেই দৃঢ় মনোবলের নেপথ্যে কী ছিল? কেউ কি আপনাকে সাহস জুগিয়েছিল?
রাষ্ট্রপতি: সত্যি বলতে, একা আমার পক্ষে মনোবল ঠিক রাখা কঠিন হতো, যদি না বিএনপির সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে আশ্বাস না পেতাম। তিন বাহিনীর পক্ষ থেকেও সর্বোচ্চ সমর্থন পেয়েছি। তারা বলেছে, ‘মহামান্য, আপনার পরাজিত হওয়া মানে পুরো সশস্ত্র বাহিনীরই পরাজিত হওয়া’।
কালের কণ্ঠ: এ বিষয়ে প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে যোগাযোগ হয়েছিল কি?
রাষ্ট্রপতি: ড. ইউনূসের কাছ থেকে কোনো ফোন পাইনি। আমার পক্ষে বা বিপক্ষে কোনো অবস্থানও তিনি নেননি।
কালের কণ্ঠ: প্রধান উপদেষ্টা আপনার সঙ্গে কতবার এসেছিলেন?
রাষ্ট্রপতি: একবারও আসেননি। বিদেশ সফরও আটকে দেওয়া হয়েছে—কসোভো, কাতারের সামিট। আমাকে কোনো তথ্য জানানো হয়নি। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের চিঠিতে শিষ্টাচারবহির্ভূত আচরণের তীব্র নিন্দা জানাই।
কালের কণ্ঠ: কেন আপনাকে বিদেশ সফরে যেতে দেওয়া হয়নি বলে মনে করেন?
রাষ্ট্রপতি: মূলত ওই সরকার চায়নি কোথাও আমার নাম আসুক। আমাকে অন্ধকারে ফেলে রাখার চেষ্টা করেছে। বিশ্ববিদ্যালয় সমাবর্তনেও যেতে দেয়নি।
একজন উপদেষ্টা বিদেশে গিয়ে আমার ছবি দেখতে পেয়ে হাইকমিশন থেকে সব ছবি সরিয়ে দিয়েছে। এটি ছিল আমাকে অপসারণের প্রথম ধাপ।
কালের কণ্ঠ: ওই ঘটনায় কোনো প্রতিবাদ করেননি?
রাষ্ট্রপতি: পররাষ্ট্র উপদেষ্টাকে চিঠি দিয়েছিলাম। আমার ক্ষোভের বর্ণনা দিয়েছি। এরপর উনি নিরুত্তর।
রাষ্ট্রপতি : একবার ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির নির্বাচনে জেতার পর পুরো কমিটির সদস্যরা আমার সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করতে এলেন। আমি সাংবাদিকবান্ধব মানুষ হিসেবে তাঁদের সঙ্গে দেখা করি। খুবই সাধারণ একটা সাক্ষাৎ ছিল। আমাদের মধ্যে সামান্য কথাবার্তা হয়েছিল, তারপর ফটোসেশন হয়। ওই ঘটনা পরদিন কয়েকটি পত্রিকায় প্রকাশ হলে প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং তা স্বাভাবিকভাবে নেয়নি। জোর করে উনারা খুঁজতে থাকল যে বঙ্গভবনের প্রেস উইংয়ের কে এই কাজটা করেছে। আসলে প্রেস উইংয়ের কেউ তো এই কাজ করেনি। আমি নিজেই সাংবাদিকদের চিঠি পেয়ে তাঁদের আসতে বলেছিলাম। কিন্তু তাঁরা অত্যন্ত নির্লজ্জভাবে তিনটা মানুষকে এখান থেকে অপসারণ করে নিয়ে গেল। প্রেস সেক্রেটারি, ডেপুটি প্রেস সেক্রেটারি এবং অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রেস সেক্রেটারি—তিনজনকেই নিয়ে গেল। পুরো উইংটাই প্রত্যাহার করে নিয়ে গেল।
কালের কণ্ঠ : আপনার এখন কোনো প্রেস উইং নেই?
রাষ্ট্রপতি : না। তিনজনকেই নিয়ে গেছে। এমনকি দুজন ফটোগ্রাফার ছিল, যারা ৩০ বছর এখানে কাজ করছিল ফটোগ্রাফার হিসেবে, তাদেরও প্রত্যাহার করে নিয়ে গেল। প্রেস উইং একদম নিল করে দিল। আমরা এখান থেকে কোনো প্রেস রিলিজ দিতে পারি না। বাংলাদেশের ক্রিকেট টিম কোথাও জিতলে অভিনন্দন জানিয়ে যে একটা প্রেস রিলিজ দেব, সেটাও পারি না। একদম প্রতিবন্ধী করে দিল। আমি রাষ্ট্রপতি হয়ে নিজে ক্যাবিনেট সেক্রেটারিকে বারবার ফোন করেছি, প্রিন্সিপাল সেক্রেটারিকে ফোন করেছি, এস্টাবলিশমেন্ট সেক্রেটারিকে ফোন করেছি। কেউই পাত্তা দেয়নি।
এসব করা হয়েছে বাংলাদেশের জনগণের কাছে আমার এক্সপোজারটা বন্ধ করার জন্য। এই যে দেশের বিভিন্ন জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ দিবসগুলোতে রাষ্ট্রীয় ক্রোড়পত্র প্রকাশিত হয়, সেখানে রাষ্ট্রপতির ছবি ও বাণী দেওয়া বন্ধ করে দেয় অন্তর্বর্তী সরকার। ক্রোড়পত্র ঠিকই প্রকাশিত হয়। তাতে আমার বাণী দেয় না। আপনারা খোঁজ নিয়ে দেখেন, গত দেড় বছরে আমার কোনো বাণী গেছে কি না। আগামীকালই (শনিবার) ইনশাআল্লাহ একুশে ফেব্রুয়ারিতে হয়তো আমার বাণী আসবে।