মরুভূমির বাতাস থেকে বিশুদ্ধ পানি: নোবেলজয়ী ওমর ইয়াগির যুগান্তকারী আবিষ্কার
তথ্য কণিকা ডেস্ক, ২২ ফেব্রুয়ারি: মরুভূমির তপ্ত বালু, শুষ্ক বাতাস আর পানির জন্য অন্তহীন হাহাকার—যে বাস্তবতা যুগ যুগ ধরে মানবসভ্যতার চ্যালেঞ্জ হয়ে আছে, সেখানেই এবার দেখা দিয়েছে নতুন আশা। বাতাস থেকেই মিলবে বিশুদ্ধ সুপেয় পানি। আর এই অবিশ্বাস্য উদ্ভাবনের পেছনে রয়েছেন রসায়নে ২০২৫ সালের নোবেলজয়ী বিজ্ঞানী অধ্যাপক ওমর ইয়াগি।
জানা গেছে, ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের এই অধ্যাপক আণবিক প্রকৌশল প্রযুক্তি ব্যবহার করে এমন এক বিশেষ উপাদান তৈরি করেছেন, যা বাতাসের আর্দ্রতা শোষণ করে তা থেকে পানি সংগ্রহ করতে পারে। চরম শুষ্ক পরিবেশেও এটি কার্যকর—যেখানে প্রচলিত পদ্ধতিতে পানি সংগ্রহ প্রায় অসম্ভব।
অধ্যাপক ইয়াগির প্রতিষ্ঠিত প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান অ্যাটোকোর তথ্য অনুযায়ী, ২০ ফুট দৈর্ঘ্যের একটি জাহাজ পরিবহন কনটেইনারের সমান একটি ইউনিট প্রতিদিন প্রায় এক হাজার লিটার বিশুদ্ধ পানি উৎপাদন করতে সক্ষম। মরুভূমি, খরা বা দুর্যোগকবলিত অঞ্চলে এটি হতে পারে টেকসই পানির নির্ভরযোগ্য উৎস।
এই উদ্ভাবনের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক হলো—এটি সম্পূর্ণ পরিবেশবান্ধব এবং কেন্দ্রীয় বিদ্যুৎ সংযোগ ছাড়াই কাজ করতে পারে। কেবল পরিবেশের তাপশক্তি ব্যবহার করেই যন্ত্রটি পানি উৎপাদন করে। ফলে হারিকেন, ভূমিকম্প বা খরার মতো দুর্যোগে যখন বিদ্যুৎ ও পানি সরবরাহ ব্যবস্থা ভেঙে পড়ে, তখন এই প্রযুক্তি জীবন রক্ষাকারী ভূমিকা রাখতে পারে।
অধ্যাপক ইয়াগি বলেন, ক্যারিবীয় দ্বীপপুঞ্জ বা ল্যাটিন আমেরিকার দেশগুলো প্রায়ই বেরিল বা মেলিসার মতো বিধ্বংসী ঝড়ের কবলে পড়ে। এসব দুর্যোগে হাজার হাজার মানুষ নিরাপদ পানির অভাবে পড়ে যায়। তার মতে, বাতাস থেকে পানি সংগ্রহের এই পদ্ধতি সমুদ্রের পানি লবণমুক্ত করার চেয়েও নিরাপদ, কারণ এতে পরিবেশের ওপর কোনো বিরূপ প্রভাব পড়ে না।
জর্ডানের একটি শরণার্থী শিবিরে বেড়ে ওঠা ওমর ইয়াগির শৈশব কেটেছে পানির তীব্র সংকটের মধ্যে। নোবেল পুরস্কার গ্রহণের ভাষণে তিনি আবেগভরা কণ্ঠে স্মৃতিচারণ করেন, “জর্ডানে সপ্তাহে মাত্র একবার পানি আসত। খবর ছড়িয়ে পড়লেই আমরা পাত্র হাতে দৌড়াতাম। সেই অভিজ্ঞতাই আমাকে এই গবেষণার পথে নিয়ে এসেছে।”
জাতিসংঘের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিশ্বে প্রায় ২২০ কোটি মানুষ এখনো নিরাপদ পানির সুবিধা থেকে বঞ্চিত। ২০২৬ সালের দিকে পৃথিবী যখন সম্ভাব্য ‘বিশ্ব পানি দেউলিয়াত্ব’-এর আশঙ্কার মুখে, তখন অধ্যাপক ইয়াগির এই অফ-গ্রিড প্রযুক্তি বৈশ্বিক পানি সংকট নিরসনে এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
মরুভূমির শুষ্ক বাতাসে যেখানে এক ফোঁটা পানিও স্বপ্নের মতো, সেখানে যদি বাতাসই হয়ে ওঠে জীবনের উৎস—তবে মানব উদ্ভাবনশক্তির সামনে অসম্ভব বলে আর কিছু থাকে না।