ইউরোপ সংবাদ
মাত্র ১১ বন্দীর দেশ: ইউরোপের ছোট্ট রাষ্ট্র লিচেনস্টাইনের অবাক করা কারাগার
নিজস্ব প্রতিবেদক, ২৩ আগস্ট:
বিশ্বের বিভিন্ন দেশের কারাগারে বন্দীর সংখ্যা সামাল দিতে কর্তৃপক্ষকে হিমশিম খেতে হয়। কোথাও ধারণক্ষমতার কয়েক গুণ বেশি বন্দী, কোথাও নতুন কারাগার নির্মাণের পরিকল্পনা। কিন্তু ইউরোপের ক্ষুদ্র রাষ্ট্র লিচেনস্টাইনের চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। দেশটিতে রয়েছে মাত্র একটি কারাগার, আর ২০২৫ সালের শুরুতে সেখানে বন্দী ছিলেন মাত্র ১১ জন—তাঁদের সবাই বিদেশি নাগরিক।
সুইজারল্যান্ড ও অস্ট্রিয়ার মাঝখানে অবস্থিত লিচেনস্টাইনের আয়তন প্রায় ১৬০ বর্গকিলোমিটার। জনসংখ্যা প্রায় ৪১ হাজার। আয়তনে বিশ্বের অন্যতম ক্ষুদ্র হলেও অর্থনৈতিকভাবে এটি অত্যন্ত সমৃদ্ধ একটি রাষ্ট্র।
রাজধানীতেই একমাত্র কারাগার
দেশটির রাজধানী ভাদুজে অবস্থিত একমাত্র কারাগারটির ধারণক্ষমতা ২০ জন। ওয়ার্ল্ড প্রিজন ব্রিফের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের শুরুতে সেখানে বন্দীর সংখ্যা ছিল ১১। অর্থাৎ পুরো দেশের কারাগার ব্যবস্থাপনায় তখন ধারণক্ষমতার অর্ধেকেরও কম মানুষ বন্দী ছিলেন।
তবে এর অর্থ এই নয় যে লিচেনস্টাইনে গুরুতর অপরাধ ঘটে না। দীর্ঘমেয়াদি সাজাপ্রাপ্ত বন্দীদের ক্ষেত্রে দেশটি প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সহযোগিতা নেয়। চুক্তি অনুযায়ী, দুই বছরের বেশি কারাদণ্ডপ্রাপ্ত বন্দীদের অস্ট্রিয়া ও সুইজারল্যান্ডের কারাগারে পাঠানো হয়। ফলে নিজ দেশে বড় ও ব্যয়বহুল কারাগার অবকাঠামো গড়ে তোলার প্রয়োজন হয়নি।
সেনাবাহিনী ছাড়াই নিরাপত্তা
লিচেনস্টাইনের আরেকটি ব্যতিক্রমী বৈশিষ্ট্য হলো—দেশটির নিজস্ব স্থায়ী সেনাবাহিনী নেই। আইনশৃঙ্খলা রক্ষা ও অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার প্রধান দায়িত্ব পালন করে পুলিশ। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে দেশটির নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে সহযোগিতার ব্যবস্থাও রয়েছে।
কম জনসংখ্যা, তুলনামূলক কম অপরাধ, শক্তিশালী প্রশাসনিক কাঠামো এবং উন্নত জীবনমান—সব মিলিয়ে লিচেনস্টাইনকে ইউরোপের নিরাপদ দেশগুলোর একটি হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
নেই বিমানবন্দর, নেই সমুদ্রবন্দর
এত সমৃদ্ধ একটি রাষ্ট্রের নিজস্ব কোনো বিমানবন্দরও নেই। সমুদ্রবন্দর থাকার প্রশ্নই আসে না, কারণ দেশটি স্থলবেষ্টিত। আন্তর্জাতিক ভ্রমণের জন্য সাধারণত নিকটবর্তী সুইজারল্যান্ডের জুরিখ বিমানবন্দর ব্যবহার করা হয়।
আয়তনে ক্ষুদ্র এই দেশটির গল্প তাই শুধু ভূগোলের নয়; প্রশাসন ও রাষ্ট্রব্যবস্থারও এক ব্যতিক্রমী উদাহরণ। যেখানে বিশ্বের অনেক রাষ্ট্র কারাগারের অতিরিক্ত বন্দীসংখ্যা নিয়ে উদ্বিগ্ন, সেখানে একটি গোটা দেশে একটি কারাগারই যথেষ্ট—আর তার ভেতরেও খালি পড়ে থাকে বেশির ভাগ সেল।
লিচেনস্টাইনের এই চিত্র আবারও মনে করিয়ে দেয়, একটি দেশের নিরাপত্তা শুধু পুলিশ, সেনাবাহিনী বা কারাগারের সংখ্যা দিয়ে পরিমাপ করা যায় না; কার্যকর রাষ্ট্রব্যবস্থা, সামাজিক স্থিতিশীলতা এবং অপরাধ প্রতিরোধের সক্ষমতাও একটি নিরাপদ সমাজ গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।