প্রথম নির্বাচনী সভায় কোন দলের নেতা কোথায় কি বললেন?
ভয়েস অব পিপল ডেস্ক নিউজ: ২২ জানুয়ারি থেকে বাংলাদেশে আনুষ্ঠানিকভাবে নির্বাচনী প্রচার শুরু হয়েছে। রাজনীতি আবার মাঠে নেমেছে—মাইক, মঞ্চ, স্লোগান আর স্মৃতির ঝাঁপি খুলে। তবে এবার বিষয়টা শুধু কে কোথা থেকে শুরু করল, সেই প্রশ্নে আটকে নেই। বরং প্রশ্ন হচ্ছে—প্রথম নির্বাচনী সভায় কোন দলের নেতা কোথায় কি বললেন?
তারেক রহমান শুরু করলেন সিলেট থেকে। হযরত শাহজালাল (র.)–এর মাজার জিয়ারত করে, তারপর জনসভা। ধর্মীয় আবহ, আবেগী স্মৃতি আর ব্যক্তিগত পরিচয়—সব একসঙ্গে। সিলেট শহরের সিলাম এলাকায় শ্বশুরবাড়ি, ফলে তিনি নিজেই নিজেকে প্রতিষ্ঠা করলেন ‘সিলেটের জামাই’ হিসেবে। এক ঢিলে দুই পাখি—আধ্যাত্মিকতা আর শ্বশুরবাড়ির আত্মীয়তা, দুটোই কাজে লাগালেন। এটি কেবল ধর্মীয় সৌজন্য নয়, এটি নিখুঁত রাজনৈতিক মঞ্চায়ন।
তারেক রহমানের বক্তব্যে সবচেয়ে লক্ষণীয় বিষয়—তিনি আর ‘উন্নয়নের প্রতিযোগিতা’য় নেই। তিনি হিসাব চাচ্ছেন। বলছেন, উন্নয়নের গল্প যতই বলা হোক, মানুষের যাতায়াত সহজ হয়নি, জীবন স্বস্তির হয়নি, ভোটের অধিকার তো দূরের কথা। তার ভাষায় রাষ্ট্র এখন নাগরিকের নয়, ক্ষমতাবানদের হাতে বন্দী। ‘টেক ব্যাক বাংলাদেশ’ তাই কোনো আবেগী স্লোগান নয়, এটি রাষ্ট্র পুনর্দখলের রাজনৈতিক ঘোষণা।
একই সঙ্গে তিনি ধর্মের প্রশ্নে সাবধানী। ইতিহাস টেনে এনে তিনি স্পষ্ট করে দেন—ধর্মের মালিক আল্লাহ, রাজনীতিক নয়। ঈমানকে ভোটের হাতিয়ার বানানোর চেষ্টা যে তিনি করবেন না, সে বার্তাও দেন। বিএনপি জানে, এই জায়গায় একচুল এদিক-ওদিক মানে বড় ক্ষতি।
এই অবস্থান থেকেই জামায়াতের রাজনীতির সঙ্গে তাদের সূক্ষ্ম সংঘর্ষ। জামায়াত সরাসরি বলছে—কার্ড দিয়ে দারিদ্র্য ঘোচে না। তারা নগদ সহায়তার রাজনীতিকে অবমূল্যায়ন করছে, তুলে ধরছে অবকাঠামো ও সেবার অভাব। এতে একটি নৈতিক উচ্চতা আছে, সন্দেহ নেই। কিন্তু প্রশ্ন হলো—এই নৈতিকতা কি ক্ষমতার বাস্তব কাঠামোতে রূপ নিতে পারবে, নাকি মঞ্চের বক্তৃতায় সীমাবদ্ধ থাকবে?
জামায়াতের ‘চাঁদা নেব না’ ঘোষণাও আসলে রাষ্ট্রের প্রতি মানুষের দীর্ঘদিনের ক্ষোভকে পুঁজি করে বলা কথা। মানুষ জানে, রাজনীতি ট্যাক্স নয়—চাঁদার ওপরই চলে। সেই জায়গায় শূন্য সহনশীলতার কথা বলা জনপ্রিয় শোনায়, কিন্তু বাস্তবতা কঠিন।
এর মাঝখানে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের অবস্থান আরও কট্টর। তারা বলছে, সমস্যার গোড়ায় আছে রাষ্ট্রের দর্শন। ৫৪ বছরে ন্যায়বিচার হয়নি, কারণ শাসনব্যবস্থা কুরআন-সুন্নাহভিত্তিক নয়। এই বক্তব্যে আবেগ আছে, বিশ্বাস আছে, কিন্তু সমাধানের পথটি অনির্দিষ্ট। কারণ রাষ্ট্র কেবল বিশ্বাসে চলে না, চলে জবাবদিহি আর ব্যবস্থায়।
এনসিপি এখানে সবচেয়ে অস্বস্তিকর প্রশ্নটি তোলে। তারা প্রতিশ্রুতির বিরোধিতা করে না, কিন্তু বাস্তব প্রয়োগ নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করে। কার্ড পেতে যদি ঘুষ লাগে, তাহলে সেই কার্ডের মানে কী? এই প্রশ্ন আসলে পুরো রাষ্ট্রযন্ত্রের প্রতি অনাস্থার প্রতিফলন। এটি নতুন রাজনীতির কণ্ঠ—যারা ক্ষমতা বদলাতে চায়, কিন্তু একই লুটেরাদের নতুন ব্যানারে দেখতে চায় না।
বাম ধারার রাজনীতি এই প্রচারে একধরনের নৈতিক অ্যালার্ম। তারা বলছে, মিথ্যার রাজনীতি শুধু গণতন্ত্র নয়, মানুষের বিশ্বাসকেও ধ্বংস করে। ধর্ম, গণভোট, স্লোগান—সবকিছুই যখন ক্ষমতার কৌশল হয়ে ওঠে, তখন রাজনীতি মানুষের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।
আর জোনায়েদ সাকির শুরুটা প্রতীকী হলেও তাৎপর্যপূর্ণ। তিনি কোনো উন্নয়ন তালিকা দেননি, দেননি আর্থিক প্রতিশ্রুতি। তিনি স্মৃতি নিয়ে দাঁড়িয়েছেন—শহীদের স্মৃতি, ফ্যাসিবাদবিরোধী লড়াইয়ের স্মৃতি। এটি সংখ্যার রাজনীতি নয়, এটি বিবেকের রাজনীতি।
সব মিলিয়ে বলা যায়, এবারের নির্বাচন আসলে প্রতিশ্রুতির নয়, বিশ্বাসের সংকটের নির্বাচন। মানুষ জানতে চায়—কে টাকা দেবে, তা নয়; কে ঠকাবে না। কে ধর্মের কথা বলবে, তা নয়; কে ধর্ম নিয়ে ব্যবসা করবে না। কে উন্নয়ন করবে, তা নয়; কে মানুষের ভোটকে সম্মান করবে।
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর কোনো মঞ্চে নেই। উত্তর লুকিয়ে আছে মানুষের মনে। আর সেখানেই এই নির্বাচনের আসল লড়াই।