এক্সট্রা থেকে কিংবদন্তি: রাজ্জাকের চলচ্চিত্রযাত্রার অবিস্মরণীয় গল্প
বিনোদন ডেস্ক : বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে এমন কিছু চরিত্র আছে, যাদের নাম শুধু পরিচয় নয়—তাদের গল্প হয়ে ওঠে প্রেরণার চিরন্তন উৎস। নায়করাজ রাজ্জাক সেই গল্পের প্রধান নায়ক। আজ তাঁর জন্মবার্ষিকীতে দেখা যাক, কীভাবে এক সময়ের ছোটখাটো পারিশ্রমিকের “এক্সট্রা” হয়ে ওঠেন বাংলা সিনেমার মুকুটহীন সম্রাট।
নায়ক আবদুর রাজ্জাকের ক্যারিয়ার শুরু হয় একেবারেই সাধারণভাবে। ‘রতন লাল বাঙালি’ ছবিতে পকেটমারের চরিত্রে প্রথমবার ক্যামেরার সামনে দাঁড়ান। এরপর ‘শিলালিপি’ ছবিতে অতিরিক্ত শিল্পী হিসেবে পান মাত্র ২০ টাকা পারিশ্রমিক। সেই ছোটখাটো অর্থই তখন তাঁর আত্মবিশ্বাসের শক্তি।
১৯৪১ সালের ২৩ জানুয়ারি কলকাতার নাকতলা এলাকায় জন্ম নেন রাজ্জাক। তিন ভাইবোনের মধ্যে সবার ছোট ছিলেন তিনি। স্কুলজীবনেই নাটকের প্রতি আকর্ষণ জন্ম নেয়। সপ্তম শ্রেণিতে এক শিক্ষকের অনুরোধে মঞ্চনাটকে অভিনয় করে প্রথমবার সবার নজর কাড়েন। সহজ অভিনয় এবং সুদর্শন চেহারা তাঁকে দ্রুত থিয়েটারপাড়ায় জনপ্রিয় করে তোলে।
চলচ্চিত্রের স্বপ্নে একসময় পাড়ি জমান বম্বেতে। কিন্তু সাফল্য সেখানে হাতছাড়া। কলকাতায় ফিরে জীবনে আসে খায়রুন্নেসা—যিনি পরবর্তীতে তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় ভরসা হয়ে ওঠেন। মাত্র ১৯ বছর বয়সেই সংসার শুরু করতে হয় বাধ্য হয়ে। কারণ তাঁর পরিবার শর্ত দিয়েছিলেন যে, বিয়ে করলে তাঁকে নাটক করতে দেয়া হবে। ১৯৬৪ সালের সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার কারণে পরিবারসহ পূর্ব বাংলায় চলে আসতে বাধ্য হন।
ঢাকায় নতুন জীবন শুরু হয় কমলাপুরের ৮০ টাকা ভাড়ার ছোট বাসায়। অভাব ছিল নিত্যসঙ্গী। টিভি নাটকে অভিনয় করে সপ্তাহে আয় হতো মাত্র ৬০–৬৫ টাকা, যেখানে মাসিক খরচ প্রায় ৬০০ টাকা। অনেক সময় সন্তানদের জন্য দুধ জোগাতে নিজের খিদে ও আরামের ত্যাগ করতে হয়েছে। তবু স্বপ্ন ছাড়েননি রাজ্জাক।
চলচ্চিত্রাঙ্গনে প্রবেশ ঘটে পরিচালক আব্দুল জব্বার খানের সহযোগিতায় কামাল আহমেদের ‘উজালা’ ছবির সহকারী হিসেবে। ১৯৬৫ সালে ‘আখেরি স্টেশন’ ছবিতে সহকারী স্টেশনমাস্টারের চরিত্রে অভিনয়ের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু করেন।
এরপর আসে জহির রায়হানের ‘বেহুলা’। প্রথমবার নায়ক হিসেবে আত্মপ্রকাশ—এবার দর্শকরা দেখল এক নতুন নায়ক, যার সহজ অভিনয় এবং মুগ্ধকর উপস্থিতি সিনেমা প্রেক্ষাগৃহ ভরিয়ে দিতে সক্ষম। এরপর একের পর এক সফল চলচ্চিত্র—‘জীবন থেকে নেয়া’, ‘নীল আকাশের নিচে’, ‘রংবাজ’, ‘দুই পয়সার আলতা’, ‘চাঁপা ডাঙ্গার বউ’, ‘অশ্রু দিয়ে লেখা’—রাজ্জাককে বাংলা সিনেমার অমর নায়ক করে তোলে।
শুধু অভিনয় নয়, ১৬টি সিনেমার পরিচালনাও করেন তিনি। দীর্ঘ ক্যারিয়ারে পাঁচবার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারসহ দেশের সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় সম্মান স্বাধীনতা পুরস্কার অর্জন করেছেন।
২০ টাকার পারিশ্রমিক থেকে শুরু করে বাংলা সিনেমার মুকুটহীন সম্রাট হওয়া রাজ্জাকের গল্প আজও নতুন প্রজন্মের জন্য অনুপ্রেরণার প্রতীক। এটি শেখায়—সফলতা আসে ধৈর্য, অধ্যবসায় এবং স্বপ্নের প্রতি নিষ্ঠার মাধ্যমে।