বাংলাদেশ সংবাদ
কর্মসংস্থানের প্রতিশ্রুতি, উল্টো ৮ মাসে চাকরি হারিয়েছেন ৬২ হাজার শ্রমিক
বাংলাদেশ প্রতিনিধি, ২৪ আগস্ট:
এক কোটি নতুন কর্মসংস্থানের প্রতিশ্রুতি নিয়ে ক্ষমতায় আসা সরকারের সামনে এখন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে নতুন চাকরি সৃষ্টি তো দূরের কথা, বিদ্যমান কর্মসংস্থান ধরে রাখা। সরকারি পরিকল্পনা ও নানা উদ্যোগের কথা থাকলেও বাস্তবে শিল্প খাতে সংকট বাড়ছে। গত আট মাসে গাজীপুর, সাভার-আশুলিয়া এবং নারায়ণগঞ্জ-নরসিংদী শিল্পাঞ্চলের ৯৫টি কারখানা স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়ে সরাসরি ৬১ হাজার ৮৮১ শ্রমিক কর্মসংস্থান হারিয়েছেন বলে সিপিডির এক পর্যালোচনায় উঠে এসেছে।
এর আগে বিভিন্ন শিল্পসংগঠনের তথ্যেও কর্মসংস্থান সংকটের চিত্র পাওয়া গেছে। চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে তৈরি পোশাক খাতে অন্তত ২০ হাজার শ্রমিক চাকরি হারিয়েছেন। শিল্প পুলিশের হিসাবে, ২০২৪ সালের জুন থেকে চলতি বছরের জুন পর্যন্ত দেশে প্রায় ৪৫৭টি কারখানা বন্ধ হয়েছে। গ্যাস সংকটে ৯ শতাধিক টেক্সটাইল মিল বন্ধ থাকার তথ্য জানিয়েছে বিটিএমএ।
সরকারের নির্বাচনি প্রতিশ্রুতিতে পাঁচ বছরে এক কোটি নতুন কর্মসংস্থান তৈরির লক্ষ্য রয়েছে। চট্টগ্রামের আনোয়ারা ও মিরসরাইয়ের অর্থনৈতিক অঞ্চল, নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজার এবং বন্ধ পাটকল চালুর মাধ্যমে কর্মসংস্থান তৈরির পরিকল্পনাও রয়েছে। কিন্তু সরকারের প্রথম কয়েক মাসে এসব উদ্যোগ এখনো মূলত পরিকল্পনা ও আলোচনার পর্যায়েই রয়েছে।
কর্মসংস্থান পরিস্থিতির সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত বিনিয়োগেও দুর্বলতা স্পষ্ট। বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি নেমে এসেছে প্রায় ৪ দশমিক ৫ শতাংশে, যা দীর্ঘ সময়ের মধ্যে সর্বনিম্ন। সিপিডির হিসাবে নিট বিদেশি বিনিয়োগও ৬৬২ মিলিয়ন ডলার থেকে কমে ৫৯৪ মিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানির এলসি খোলার প্রবৃদ্ধি ১৪ দশমিক ৬ শতাংশ থেকে নেমেছে ঋণাত্মক ১৩ দশমিক ৬ শতাংশে।
শিল্প উৎপাদনের অবস্থাও উদ্বেগজনক। সিপিডির পর্যালোচনায় শিল্প উৎপাদন প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ৪ শতাংশ থেকে শূন্যে এবং উৎপাদন খাতের প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ৫ শতাংশ থেকে শূন্যে নেমে যাওয়ার তথ্য উঠে এসেছে। দীর্ঘস্থায়ী গ্যাস সংকটে টেক্সটাইল, ইস্পাত, কাগজ, সিরামিকসহ গ্যাসনির্ভর শিল্প ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
এদিকে বিদেশে কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রেও গতি কমেছে। সিপিডির হিসাবে মাসিক গড় বিদেশে কর্মসংস্থান ৯৫ হাজার ৫২১ জন থেকে কমে ৫১ হাজার ২৩৫ জনে দাঁড়িয়েছে। মালয়েশিয়া ও ওমানের শ্রমবাজার পুরোপুরি সচল না হওয়া এবং মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতি নতুন অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। সরকার অবশ্য জাপান ও ইউরোপের বাজার সম্প্রসারণ এবং মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার পুনরায় খোলার উদ্যোগের কথা জানিয়েছে।
সরকারের প্রস্তাবিত ‘এমপ্লয়মেন্ট এক্সচেঞ্জ’ নিয়েও এখনো চূড়ান্ত রূপরেখা হয়নি। কয়েক দফা বৈঠক হলেও কার্যকর ব্যবস্থা চালু করা সম্ভব হয়নি।
সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, নতুন সরকারের কাছে অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার ও সুশাসন প্রতিষ্ঠার বড় প্রত্যাশা থাকলেও কিছু ক্ষেত্রে অস্বস্তি তৈরি হয়েছে। তাঁর মতে, সরকার উত্তরাধিকারসূত্রে কাঠামোগত সমস্যা পেলেও দায়িত্ব নেওয়ার সময়কার অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে একটি সমন্বিত দলিল তৈরি না করা ছিল বড় দুর্বলতা।
তবে সব সূচকেই অবনতি হয়নি। সিপিডির হিসাবে মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমেছে, রপ্তানি প্রবৃদ্ধি নেতিবাচক অবস্থা থেকে ইতিবাচক হয়েছে এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ৩০ দশমিক ১ বিলিয়ন ডলার থেকে বেড়ে ৩২ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলারে উঠেছে। কর ব্যবস্থার ডিজিটালাইজেশন, ‘ইনভেস্ট বাংলাদেশ’ চালু ও কয়েকটি ব্যাংক পুনর্গঠনকেও ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হয়েছে।
অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ীদের মতে, বিনিয়োগ, জ্বালানি সরবরাহ ও শিল্প উৎপাদন দ্রুত ঘুরে না দাঁড়ালে সরকারের এক কোটি কর্মসংস্থানের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন কঠিন হবে। সবচেয়ে বড় আশঙ্কা হলো—নতুন চাকরি তৈরির আগে যদি বিদ্যমান চাকরিই হারাতে থাকে, তাহলে কর্মসংস্থানের সংকট আরও গভীর হতে পারে।