বাংলাদেশ সংবাদ
১০ মন্ত্রণালয়ে উন্নয়ন ব্যয় শূন্য, প্রথম মাসেই ধীরগতির এডিপি
বাংলাদেশ প্রতিনিধি, ২৪ আগস্ট:
নতুন অর্থবছর শুরু হয়েছে প্রায় এক মাস, কিন্তু উন্নয়ন ব্যয়ের চিত্রে দেখা যাচ্ছে পুরোনো সেই ধীরগতির বাস্তবতা। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম মাস জুলাইয়ে সরকারের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি বা এডিপি থেকে ব্যয় হয়েছে মোট বরাদ্দের মাত্র শূন্য দশমিক ৬৯ শতাংশ। আর ১০টি মন্ত্রণালয় ও বিভাগ পুরো মাসে উন্নয়ন প্রকল্পে একটি টাকাও খরচ করতে পারেনি।
পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরে এডিপিতে বরাদ্দ রাখা হয়েছে প্রায় ৩ লাখ ৮ হাজার কোটি টাকা। এর বিপরীতে জুলাই মাসে ব্যয় হয়েছে মাত্র ২ হাজার ১২১ কোটি টাকা।
ব্যয় শূন্য থাকা মন্ত্রণালয় ও বিভাগগুলোর মধ্যে রয়েছে শিল্প, বাণিজ্য, ধর্ম, পররাষ্ট্র, বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন, পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়, স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ, স্বাস্থ্য শিক্ষা ও পরিবার কল্যাণ বিভাগ, সেতু বিভাগ এবং অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগ।
বিশেষভাবে উদ্বেগের বিষয় হলো—বড় অঙ্কের উন্নয়ন বরাদ্দ থাকা কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ খাতও অর্থবছরের প্রথম মাসে ব্যয়ের খাতা খুলতে পারেনি। স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের জন্য বরাদ্দ রয়েছে ৬ হাজার কোটি টাকার বেশি এবং স্বাস্থ্য শিক্ষা ও পরিবার কল্যাণ বিভাগের জন্য প্রায় সাড়ে ৫ হাজার কোটি টাকা। সেতু বিভাগের বরাদ্দ প্রায় ২ হাজার ৬০০ কোটি এবং বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন খাতে প্রায় ১ হাজার ৮৬৩ কোটি টাকা। কিন্তু জুলাইয়ের হিসাবে এসব খাতে উন্নয়ন ব্যয় শূন্য।
অন্যদিকে ব্যয়ের অঙ্কে সবচেয়ে এগিয়ে রয়েছে স্থানীয় সরকার বিভাগ। প্রায় ৩৩ হাজার ৩৭৪ কোটি টাকার বরাদ্দের বিপরীতে জুলাইয়ে তারা ব্যয় করেছে প্রায় ৯৫২ কোটি টাকা। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় ব্যয় করেছে প্রায় ২৬৬ কোটি, বিদ্যুৎ বিভাগ ২১০ কোটি এবং মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগ প্রায় ১৯৩ কোটি টাকা।
শতাংশের হিসাবে সবচেয়ে ভালো অবস্থানে রয়েছে বাংলাদেশ সরকারি কর্মকমিশন। প্রায় ৩০ কোটি টাকার বরাদ্দের মধ্যে জুলাইয়ে সংস্থাটি ব্যয় করেছে প্রায় সাড়ে ৭ শতাংশ। সংসদ সচিবালয়, মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ এবং দুর্নীতি দমন কমিশনও বরাদ্দের তুলনায় তুলনামূলক ভালো ব্যয় দেখিয়েছে।
পরিকল্পনা বিভাগের ব্যাখ্যা হলো, অর্থবছরের শুরুতে প্রকল্পের কার্যাদেশ, ক্রয় পরিকল্পনা এবং দরপত্র প্রক্রিয়ায় সময় লাগে। সেপ্টেম্বর থেকে প্রকল্প ব্যয়ের গতি বাড়ার কথা। প্রশাসনিক এই ব্যাখ্যায় যুক্তি থাকলেও প্রশ্ন থেকে যায়—প্রতি বছর একই কারণে অর্থবছরের শুরুতে উন্নয়ন ব্যয় পিছিয়ে থাকলে পরিকল্পনা ও প্রকল্প ব্যবস্থাপনায় কাঠামোগত দুর্বলতা রয়ে যাচ্ছে কি না।
বাংলাদেশে এডিপি বাস্তবায়নের একটি পরিচিত প্রবণতা হলো বছরের প্রথম দিকে ধীরগতি এবং শেষ দিকে হঠাৎ ব্যয়ের চাপ। এর ফলে প্রকল্পের কাজ তাড়াহুড়ো করে শেষ করার অভিযোগ ওঠে, মান ও ব্যয়ের দক্ষতা নিয়েও প্রশ্ন দেখা দেয়। অর্থবছরের প্রথম মাসের এই শূন্য ব্যয় তাই কেবল একটি হিসাবের সংখ্যা নয়; এটি উন্নয়ন প্রকল্প ব্যবস্থাপনার সক্ষমতারও একটি পরীক্ষা।
এখন দেখার বিষয়, সেপ্টেম্বর থেকে সত্যিই ব্যয়ের গতি বাড়ে কি না এবং বছর শেষে উন্নয়ন বরাদ্দ পরিকল্পিত ও মানসম্মতভাবে বাস্তবায়ন করা যায় কি না। কারণ কাগজে বরাদ্দ থাকলেই উন্নয়ন হয় না—বরাদ্দের অর্থ সময়মতো, স্বচ্ছভাবে এবং মানুষের প্রয়োজন অনুযায়ী ব্যয় হলেই তার সুফল পৌঁছে জনগণের কাছে।