বাংলা সিনেমা এখন ছোট শহরে: ঢাকার বাইরে গড়েেউঠছে নাটক- চলচ্চিত্র তৈরির হাব
ভয়েস অব পিপল – বিনোদন ডেস্ক:
বাংলা চলচ্চিত্রের প্রথাগত কেন্দ্র ছিল ঢাকার বিএফডিসি তথা ‘ঢালিউড’। দীর্ঘদিন ধরে তরুণ নির্মাতারা ধরে নিয়েছিলেন, সিনেমা, নাটক বা কারিগরি দক্ষতা অর্জনের জন্য ঢাকামুখী হওয়া ছাড়া উপায় নেই। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে জেলা ও বিভাগীয় শহরগুলোয় গড়ে উঠছে নতুন প্রোডাকশন হাব, যা ঢাকার কেন্দ্রিক চলচ্চিত্র দুনিয়াকে ধাক্কা দিচ্ছে।

রাজশাহী থেকে শুরু করা মোহাম্মদ তাওকীর ইসলামের ‘দেলুপি’ সিনেমার শুটিং হয়েছে খুলনায়। তাওকীর নিজেও রাজশাহীতে বেড়ে উঠেছেন। তিনি জানিয়েছেন, পড়াশোনা শেষে দেশে ফিরে তিনি নিজের কমফোর্ট জোনে কাজ করতে রাজশাহীকে বেছে নেন। প্রথমে স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ‘কঙ্ক পুরাণ’ নির্মাণের মাধ্যমে শুরু হয় তার যাত্রা। এরপর রাজশাহীতেই বানানো হয়েছে ওয়েব সিরিজ ‘শাটিকাপ’ ও ‘সিনপাট’। স্থানীয় কলাকুশলী ও অভিনয়শিল্পীদের সঙ্গে একাধারে কাজ করে তিনি এখন রাজশাহীর চলচ্চিত্র সম্প্রদায়ের নেতৃত্ব দিচ্ছেন।
খুলনার ক্ষেত্রে শুরু করেছিলেন পরিচালক সুকর্ণ শাহেদ। খুলনা ফিল্ম সোসাইটির সঙ্গে যুক্ত থেকে ২০১৫ সালে প্রথম স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র নির্মাণের পর ২০২৩ সালে তিনি ঢাকায় কাজের কিছু অভিজ্ঞতা সংগ্রহ করে খুলনায় ফিরেন। তাঁর প্রতিষ্ঠান সোল কিচেন প্রোডাকশন হাউস থেকে তৈরি হচ্ছে ওয়েব সিরিজ ‘ফেউ’ এবং অন্যান্য প্রকল্প। খুলনার নিজস্ব গল্প, চরিত্র ও মানসিক শান্তি তাঁকে ঢাকার ব্যস্ত পরিবেশ থেকে মুক্তি দিচ্ছে।

দক্ষিণ বাংলার সিনেমার উন্নয়নে কাজ করছেন একদল নির্মাতা। বাগেরহাটের স্থানিক প্রেক্ষাপটে গড়ে উঠছে সাউথ বাংলা ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি। ‘সাহস’ ও ‘দুঃসাহস’ সিনেমার মাধ্যমে এই যাত্রা শুরু হয়েছে। পরিচালক কৌতূহল জানিয়েছেন, তারা ইতোমধ্যে শিল্পী ও কলাকুশলী তৈরিতে মনোযোগ দিয়েছেন। স্থানীয় বাজেট ও সংস্থান ব্যবহার করে কম খরচে সিনেমা নির্মাণ করা সম্ভব হচ্ছে।
গাজীপুরের নন্দীপুর গ্রামে যুবরাজ শামীম তার প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান তৈরি করেছেন। এখানে তৈরি হয়েছে ‘অতল’, ‘গন্ধম’, ‘এক ঋতুর অনন্তকাল’ সহ আরও একাধিক সিনেমা। শামীম মনে করেন, তিনি চলচ্চিত্রশিল্পী হিসেবে নিজের সৃজনশীলতা গ্রামীণ পরিবেশে আরও ভালোভাবে প্রকাশ করতে পারছেন।
সিলেট ধীরে ধীরে নাটক ও চলচ্চিত্র নির্মাণের একটি কেন্দ্রে পরিণত হচ্ছে, কারণ এখানকার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, স্থানীয় সংস্কৃতি এবং নতুন নির্মাতাদের আগ্রহের কারণে 'ভয়াল'-এর মতো চলচ্চিত্র এবং 'নানকার পালা'-র মতো নাটক তৈরি হচ্ছে, যা আঞ্চলিক শিল্পকে প্রসারিত করছে এবং একটি 'হাব'-এর সম্ভাবনা তৈরি করছে, যদিও এটি এখনও পুরোপুরি প্রতিষ্ঠিত হয়নি। তবে প্রতি মাসে প্রচুর টিভি নাটক তৈরি হচ্ছে। অবশ্য বেশিরভাগই আঞ্চলিক ভাষায়।
বরিশালের নির্মাতা সুব্রত সঞ্জীবও ঢাকার বাইরে কাজের প্রতি মনোযোগী। স্থানীয় অভিনেতা ও টিম নিয়ে তিনি বরিশালেই সিনেমা নির্মাণ করছেন। তাঁর মতে, বিভাগীয় শহরগুলো এবং পার্বত্য অঞ্চল, সিলেটের মতো জায়গাগুলোতে শিল্পচর্চার নতুন সুযোগ রয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই নতুন ধারার চলচ্চিত্রচর্চা শুধু স্থানিক বিনোদন সৃষ্টি করছে না, বরং দেশীয় গল্প ও চরিত্রকে কেন্দ্র করে শিল্পীদের বিকাশে সাহায্য করছে। ঢাকার বাইরে সিনেমা বানানো এখন এক ধরনের স্বাধীনতা ও নতুন সম্ভাবনার প্রতীক।
বাংলা সিনেমা এখন আর শুধুই ঢাকার প্রতিচ্ছবি নয়। রাজশাহী, খুলনা, বরিশাল, গাজীপুর, সিলেট ও দক্ষিণবঙ্গের ছোট শহরগুলোতে জন্ম নিচ্ছে নতুন চলচ্চিত্র জগত, যা আগামী প্রজন্মের নির্মাতাদের জন্য উৎসাহের ঝরনা।