তথ্যনির্ভর ও বস্তুনিষ্ঠ সংবাদের জন্য—ভয়েস অব পিপল

প্রাণী থেকে মানুষের শরীরে শ্যামোন্ডা ভাইরাস, ফ্রান্সে প্রথম সংক্রমণ শনাক্ত

প্রাণী থেকে মানুষের শরীরে শ্যামোন্ডা ভাইরাস, ফ্রান্সে প্রথম সংক্রমণ শনাক্ত

ভয়েস অব পিপল রিপোর্ট, ২৭ অক্টোবর:

প্রাণীদেহে সংক্রমণ ঘটানো শ্যামোন্ডা ভাইরাসের (Shamonda virus) প্রথম মানব সংক্রমণ শনাক্ত হয়েছে ফ্রান্সে। ২০২৬ সালের অক্টোবরে শনাক্ত হওয়া এই ঘটনা বিজ্ঞানীদের মধ্যে নতুন করে উদ্বেগ ও গবেষণার প্রয়োজনীয়তা তৈরি করেছে। এর আগে ভাইরাসটি মূলত গবাদিপশু ও অন্যান্য প্রাণীর মধ্যে সংক্রমণের জন্য পরিচিত ছিল। 

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) এবং ইউরোপীয় রোগ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্র (ইসিডিসি) পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে। সংক্রমণের উৎস, মানুষের শরীরে ভাইরাসটির প্রভাব এবং এটি কীভাবে ছড়াতে পারে, তা জানতে তদন্ত চলছে।

লিয়নে আক্রান্ত রোগীর মৃত্যু, চলছে তদন্ত

ফরাসি স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ৭ অক্টোবর গুরুতর অসুস্থ এক রোগীর শরীরে শ্যামোন্ডা ভাইরাসের সংক্রমণ শনাক্ত হওয়ার বিষয়ে স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা হয়। লিয়নের একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ওই রোগীর রোগ প্রতিরোধক্ষমতা মারাত্মকভাবে দুর্বল ছিল। তিনি গুরুতর স্নায়বিক সমস্যায়ও ভুগছিলেন।

পরবর্তী সময়ে রোগী মারা যান। তাঁর শরীরের বিভিন্ন জৈবিক নমুনায় ভাইরাসটির উপস্থিতি শনাক্ত করে সংক্রমণ নিশ্চিত করা হয়।

তবে ভাইরাসটি সরাসরি তাঁর মৃত্যুর কারণ ছিল কি না, নাকি আগে থেকেই থাকা গুরুতর অসুস্থতার পাশাপাশি মৃত্যুর ক্ষেত্রে ভূমিকা রেখেছিল, তা নিয়ে তদন্ত চলছে। ফরাসি কর্তৃপক্ষের প্রাথমিক মূল্যায়নে রোগীর স্নায়বিক জটিলতার সঙ্গে ভাইরাসটির সংক্রমণের সম্পর্ক থাকার সম্ভাবনা দেখা গেছে।

এটি মানুষের শরীরে শ্যামোন্ডা ভাইরাসের প্রথম নথিভুক্ত সংক্রমণ। রোগীর রোগ প্রতিরোধক্ষমতা অত্যন্ত দুর্বল থাকায় ঘটনাটিকে বিশেষ পরিস্থিতিতে ঘটে যাওয়া একটি ব্যতিক্রমী সংক্রমণ হিসেবে বিবেচনা করছেন বিশেষজ্ঞরা।

কী এই শ্যামোন্ডা ভাইরাস?

শ্যামোন্ডা ভাইরাস হলো Orthobunyavirus গণের একটি ভাইরাস, যা Peribunyaviridae পরিবারের অন্তর্ভুক্ত। এটি মূলত গবাদিপশুর মধ্যে সংক্রমণ ঘটায়। গরু, ভেড়া, ছাগল ও ঘোড়াসহ বিভিন্ন প্রাণীর শরীরে এই ভাইরাসের উপস্থিতি শনাক্ত হয়েছে।

১৯৬৫ সালে নাইজেরিয়ায় গরুর শরীর থেকে প্রথম ভাইরাসটি শনাক্ত করা হয়। পরবর্তী সময়ে আফ্রিকার বিভিন্ন দেশ ও জাপানে প্রাণীর মধ্যে এর সংক্রমণের খবর পাওয়া যায়।

২০২৬ সালের গ্রীষ্মে ইউরোপে প্রথমবারের মতো ভাইরাসটি শনাক্ত হয়। এরপর জার্মানি, সুইজারল্যান্ড, অস্ট্রিয়া, বেলজিয়াম, ফ্রান্সসহ ইউরোপের একাধিক দেশে গবাদিপশু ও অন্যান্য প্রাণীর মধ্যে এর উপস্থিতি পাওয়া যায়।

ইউরোপে ভাইরাসটির বিস্তার এবং মানুষের শরীরে প্রথম সংক্রমণ শনাক্ত হওয়ার ঘটনা নতুন করে গবেষণার প্রয়োজনীয়তা বাড়িয়েছে।

যেভাবে ছড়ায় ভাইরাসটি

বিশেষজ্ঞদের ধারণা, Culicoides গোত্রের ক্ষুদ্র রক্তচোষা উড়ন্ত পোকা বা মিজের কামড়ের মাধ্যমে শ্যামোন্ডা ভাইরাস প্রাণীর শরীরে ছড়ায়। সংক্রমিত প্রাণী থেকে সরাসরি সংস্পর্শের মাধ্যমে অন্য প্রাণীতে ভাইরাসটি ছড়ায়—এমন প্রমাণ এখনো পাওয়া যায়নি। তবে গর্ভাবস্থায় আক্রান্ত প্রাণী থেকে ভ্রূণে সংক্রমণ ঘটতে পারে।

ফ্রান্সে আক্রান্ত ব্যক্তির সংক্রমণের সম্ভাব্য উৎস হিসেবে সংক্রমিত মিজের কামড়কে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। তবে ঠিক কোন প্রজাতির পোকা এই সংক্রমণের জন্য দায়ী, তা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

আক্রান্ত ব্যক্তির পরিবেশ, সাম্প্রতিক ভ্রমণ, প্রাণীর সংস্পর্শ এবং সম্ভাব্য বাহক পোকার উপস্থিতি খতিয়ে দেখা হচ্ছে। সংক্রমণের প্রকৃত উৎস নিশ্চিত করতে আরও পরীক্ষা-নিরীক্ষা প্রয়োজন।

মানুষের জন্য কতটা বিপজ্জনক?

এখন পর্যন্ত মানুষের শরীরে মাত্র একটি সংক্রমণ শনাক্ত হয়েছে। ফলে মানুষের মধ্যে এই ভাইরাসের সংক্রমণ কী ধরনের উপসর্গ সৃষ্টি করতে পারে, কতটা গুরুতর হতে পারে এবং কোন পরিস্থিতিতে সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়ে—এসব বিষয়ে বিজ্ঞানীদের কাছে পর্যাপ্ত তথ্য নেই।

ফ্রান্সের আক্রান্ত ব্যক্তির ক্ষেত্রে স্নায়বিক জটিলতা দেখা গিয়েছিল। তবে একজন রোগীর অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে ভাইরাসটি সাধারণ মানুষের মধ্যে একই ধরনের অসুস্থতা সৃষ্টি করবে, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই।

ফরাসি জনস্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, এখন পর্যন্ত মানুষ থেকে মানুষে সংক্রমণের কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। একই সঙ্গে সাধারণ জনগণের জন্য কোনো উল্লেখযোগ্য স্বাস্থ্যঝুঁকিও শনাক্ত হয়নি।

তবে প্রথম মানব সংক্রমণের ঘটনা হওয়ায় সতর্ক নজরদারি অব্যাহত রয়েছে। নতুন কোনো সংক্রমণ শনাক্ত হলে ভাইরাসটির প্রকৃতি ও সম্ভাব্য ঝুঁকি সম্পর্কে আরও স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যেতে পারে।

টিকা ও নির্দিষ্ট চিকিৎসা নেই

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, শ্যামোন্ডা ভাইরাসের বিরুদ্ধে বর্তমানে অনুমোদিত কোনো টিকা বা নির্দিষ্ট চিকিৎসা নেই। মানুষের শরীরে সংক্রমণের ঘটনা এত কম যে রোগটির চিকিৎসা ও ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে পর্যাপ্ত গবেষণালব্ধ তথ্যও পাওয়া যায়নি।

তাই ভাইরাসটির সংক্রমণপদ্ধতি, মানুষের শরীরে এর প্রভাব এবং সম্ভাব্য প্রতিরোধব্যবস্থা সম্পর্কে জানতে আরও গবেষণা প্রয়োজন।

একই সঙ্গে প্রাণীর মধ্যে ভাইরাসটির বিস্তার পর্যবেক্ষণ করাও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, প্রাণী ও মানুষের স্বাস্থ্য পরস্পরের সঙ্গে সম্পর্কিত। প্রাণীতে নতুন সংক্রমণ শনাক্ত করা গেলে সম্ভাব্য ঝুঁকি সম্পর্কে আগেভাগে ধারণা পাওয়া সম্ভব হতে পারে।

নজরদারিতে ইউরোপের স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ

ইউরোপে ভাইরাসটির বিস্তার এবং প্রথম মানব সংক্রমণ শনাক্ত হওয়ার পর সংশ্লিষ্ট স্বাস্থ্য সংস্থাগুলো পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে। ভাইরাসটি শনাক্ত করার পরীক্ষার সক্ষমতা বাড়ানো এবং সম্ভাব্য নতুন মানব সংক্রমণ খুঁজে বের করার বিষয়েও কাজ চলছে।

বিশেষজ্ঞদের সামনে এখন প্রধান প্রশ্ন তিনটি—মানুষ কীভাবে ভাইরাসটিতে আক্রান্ত হচ্ছে, এটি মানুষের শরীরে কী ধরনের রোগ সৃষ্টি করতে পারে এবং ভবিষ্যতে আরও সংক্রমণের আশঙ্কা রয়েছে কি না।

এসব প্রশ্নের উত্তর পেতে মানুষের স্বাস্থ্য, প্রাণীর স্বাস্থ্য এবং পরিবেশের ওপর সমন্বিত নজরদারি প্রয়োজন।

শ্যামোন্ডা ভাইরাসের প্রথম মানব সংক্রমণ নিঃসন্দেহে জনস্বাস্থ্য গবেষণার জন্য গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। তবে একটি সংক্রমণ শনাক্ত হওয়ার অর্থ এই নয় যে ভাইরাসটি ব্যাপকভাবে মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ছে। বর্তমান তথ্য অনুযায়ী, সাধারণ মানুষের জন্য উল্লেখযোগ্য স্বাস্থ্যঝুঁকি শনাক্ত হয়নি এবং মানুষ থেকে মানুষে সংক্রমণেরও প্রমাণ নেই। তাই আতঙ্কিত না হয়ে বৈজ্ঞানিক গবেষণা, নির্ভরযোগ্য তথ্য এবং স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষের পর্যবেক্ষণের ওপর গুরুত্ব দেওয়াই যুক্তিসংগত।