‘‘দেশ থেকে দেশান্তরে, ভয়েস অব পিপল সবার ঘরে’’

ইউরোপের আজকের কয়েকটি দেশের গুরুত্বপূর্ণ খবর একসাথে

ইউরোপের আজকের কয়েকটি দেশের গুরুত্বপূর্ণ খবর একসাথে

ইউরোপ প্রতিনিধি | ২৩ অক্টোবর:

ইউরোপের বিভিন্ন দেশে অর্থনৈতিক চাপ, রাজনৈতিক অস্থিরতা, অভিবাসন এবং ইউক্রেন যুদ্ধ ঘিরে নতুন পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে। ফ্রান্সে বিক্ষোভ ও সহিংসতার পর পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা চলছে। একই সময়ে ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেশগুলোর সরকারি ঋণ বাড়ছে। অন্যদিকে, স্পেন ও ইতালি সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নতুন সমঝোতায় পৌঁছেছে। ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধে কূটনৈতিক তৎপরতাও অব্যাহত রয়েছে। ইউরোপের জন্য গুরুত্বপূর্ণ এমন কয়েকটি খবর তুলে ধরা হলো।

ফ্রান্সে সহিংস বিক্ষোভের পর নিরাপত্তা জোরদার, ক্ষতিগ্রস্ত প্রায় তিন হাজার ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান

ফ্রান্সে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, শিক্ষা খাতের দুরবস্থা এবং সরকারি পরিষেবা নিয়ে অসন্তোষ থেকে শুরু হওয়া বিক্ষোভ সহিংসতায় রূপ নেওয়ার পর নিরাপত্তা জোরদার করেছে সরকার। রাজধানী প্যারিসসহ বিভিন্ন এলাকায় ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনায় ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলো বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়েছে।

গত সপ্তাহান্তের সহিংসতার পর প্রায় তিন হাজার দোকান ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে খুচরা ব্যবসায়ীদের সংগঠন জানিয়েছে। এ ঘটনায় প্রায় ২ হাজার ৪০০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদেরও ব্যাপক হতাহতের ঘটনা ঘটেছে।

পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সরকার কয়েকটি এলাকায় স্থানীয়ভাবে রাতের কারফিউ ও সমাবেশের ওপর বিধিনিষেধ আরোপ করেছে। নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে সরকারের ওপর চাপ বাড়লেও প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর পদত্যাগের প্রস্তাব গ্রহণ করেননি।

এই অস্থিরতা এমন সময়ে দেখা দিয়েছে, যখন ফ্রান্সকে বাজেট ঘাটতি কমানো এবং সরকারি ঋণ নিয়ন্ত্রণের কঠিন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হচ্ছে। ফলে রাজনৈতিক সংকটের পাশাপাশি অর্থনীতিতেও এর প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আস্থা হারাচ্ছে ফ্রান্স, বাড়ছে ঋণসংকটের ঝুঁকি

ফ্রান্সের সরকারি অর্থব্যবস্থা সামাল দেওয়া এবং রাজপথে অস্থিরতা নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা কঠিন হয়ে উঠছে। এর মধ্যে নতুন করে উদ্বেগ বাড়াচ্ছে দেশটির ঋণ ব্যবস্থাপনা। সরকারি ব্যয় মেটাতে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের ওপর ফ্রান্সের নির্ভরতা অনেক বেশি। অথচ রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা, বাজেট নিয়ে বিরোধ এবং বিশ্ববাজারে সুদের হার বৃদ্ধির কারণে এসব বিনিয়োগকারীর কাছে ফ্রান্সের ঋণপত্র আগের মতো আকর্ষণীয় থাকছে না। 

ফ্রান্সের জন্য পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে, কারণ বিদেশি বিনিয়োগকারীরা সরে গেলে তাদের জায়গায় নতুন ক্রেতা পাওয়া কঠিন হতে পারে। আগে তুলনামূলক বেশি মুনাফার আশায় বিদেশি তহবিলগুলো ফরাসি সরকারি বন্ড কিনত। এখন জাপানের মতো দেশেও সুদের হার বাড়ায় নিজ দেশের বাজারে বিনিয়োগের সুযোগ আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে। ফলে ফরাসি ঋণপত্রের চাহিদা কমার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। 

২৪ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ ঋণের সুদ

বাজারে উদ্বেগের প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে সরকারি বন্ডের সুদে। ২২ অক্টোবর ফ্রান্সের ১০ বছর মেয়াদি সরকারি বন্ডের সুদ বেড়ে ৫ দশমিক ১১ শতাংশে পৌঁছায়। জার্মানির বন্ডের তুলনায় ফ্রান্সের ঋণের ঝুঁকির জন্য বিনিয়োগকারীরা যে অতিরিক্ত সুদ দাবি করছেন, তা ২০১১ সালের পর সর্বোচ্চ পর্যায়ে উঠেছে। 

ফ্রান্সের সরকারি ঋণ ২০২৬ সালে মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ১১৯ দশমিক ৩ শতাংশে পৌঁছাতে পারে বলে অর্থ মন্ত্রণালয়ের পূর্বাভাস। একই সময়ে বাজেট ঘাটতি কমানোর উদ্যোগও রাজনৈতিক বিরোধের মুখে পড়েছে। ২০২৭ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন সামনে থাকায় ব্যয় সংকোচনের মতো কঠিন সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন নিয়েও অনিশ্চয়তা রয়েছে।

বিদেশি বিনিয়োগকারীরা কেন গুরুত্বপূর্ণ

ফ্রান্সের সরকারি ঋণের অর্ধেকেরও বেশি বিদেশি ঋণদাতাদের হাতে রয়েছে। ফলে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা ফরাসি বন্ড কেনা কমিয়ে দিলে সরকারকে নতুন ঋণ নিতে বেশি সুদ দিতে হতে পারে। এতে পুরোনো ঋণের সুদ পরিশোধ এবং নতুন ব্যয়ের অর্থ জোগাড়—দুটিই কঠিন হয়ে উঠবে। 

সরকারের সামনে এখন প্রধান চ্যালেঞ্জ হলো বিশ্বাসযোগ্য বাজেট পরিকল্পনা উপস্থাপন, ঘাটতি নিয়ন্ত্রণ এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনা। পরিস্থিতির উন্নতি না হলে ঋণের ব্যয় আরও বাড়তে পারে, যা দেশের অর্থনীতি ও ব্যবসা-বাণিজ্যের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করবে।

ইউরোপীয় ইউনিয়নে সরকারি ঋণ বেড়ে জিডিপির ৮২.৯ শতাংশ

ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেশগুলোর সরকারি ঋণের বোঝা আরও বেড়েছে। ইউরোপীয় পরিসংখ্যান সংস্থা ইউরোস্ট্যাটের ২১ অক্টোবর প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের দ্বিতীয় প্রান্তিক শেষে ইইউর সরকারি ঋণ মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ৮২.৯ শতাংশে পৌঁছেছে। আগের প্রান্তিকে এ হার ছিল ৮২.৫ শতাংশ।

একই সময়ে ইউরোজোনের সরকারি ঋণ বেড়ে জিডিপির ৮৮.৮ শতাংশ হয়েছে, যা আগের প্রান্তিকে ছিল ৮৮.৪ শতাংশ।

দেশভিত্তিক হিসাবে সবচেয়ে বেশি ঋণের বোঝা রয়েছে গ্রিসের। দেশটির সরকারি ঋণ জিডিপির ১৪০.৮ শতাংশ। ইতালির ক্ষেত্রে এই হার ১৩৯.৯ শতাংশ এবং ফ্রান্সের ১১৯.১ শতাংশ। বেলজিয়ামেও সরকারি ঋণ জিডিপির ১১০.২ শতাংশে পৌঁছেছে।

সরকারি ঋণ বেশি হলে ঋণের সুদ পরিশোধে বাজেটের বড় অংশ ব্যয় করতে হয়। এতে স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, পরিবহন ও সামাজিক নিরাপত্তার মতো খাতে ব্যয় বাড়ানোর সুযোগ সীমিত হতে পারে।

তবে ঋণের অনুপাত বেশি হলেই কোনো দেশের তাৎক্ষণিক আর্থিক বিপর্যয় ঘটবে, এমন নয়। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, সুদের হার এবং সরকারের রাজস্ব আদায়ের সক্ষমতাও ঋণ ব্যবস্থাপনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

অভিবাসন সংকটের পর সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ তুলে নিচ্ছে স্পেন ও ইতালি

অভিবাসন নিয়ে বিরোধের জেরে তিন মাস আগে আরোপ করা পারস্পরিক সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ তুলে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে স্পেন ও ইতালি। বৃহস্পতিবার, ২২ অক্টোবর, দুই দেশের সরকারের এই সিদ্ধান্তের কথা জানা যায়।

স্পেনের উত্তর আফ্রিকান ভূখণ্ড সেউটায় অভিবাসীদের ব্যাপক আগমনের পর গত ৩১ জুলাই ইতালি স্পেনের সঙ্গে অবাধ সীমান্ত চলাচলের নীতি স্থগিত করে। ইতালির আশঙ্কা ছিল, সেউটায় প্রবেশ করা অভিবাসীদের কেউ কেউ পরে ইতালিতে চলে আসতে পারেন।

এর প্রতিক্রিয়ায় স্পেনও ইতালির বিরুদ্ধে অনুরূপ সীমান্ত বিধিনিষেধ আরোপ করে। স্পেনের পক্ষ থেকে এ পদক্ষেপের সমালোচনা করা হয়েছিল।

সর্বশেষ আলোচনার পর দুই দেশ সিদ্ধান্ত নিয়েছে, শেনজেন চুক্তির আওতায় সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ স্থগিত রাখার মেয়াদ আর বাড়ানো হবে না। তবে সীমান্ত নিরাপত্তা বজায় রাখতে দুই দেশের মধ্যে তথ্য বিনিময় আরও জোরদার করা হবে।

শেনজেন ব্যবস্থার আওতায় ইউরোপের অংশগ্রহণকারী দেশগুলোর মধ্যে সাধারণত অভ্যন্তরীণ সীমান্তে নিয়মিত পাসপোর্ট পরীক্ষা ছাড়াই চলাচল করা যায়। তবে নিরাপত্তা বা বিশেষ পরিস্থিতিতে সাময়িক নিয়ন্ত্রণ আরোপের সুযোগ রয়েছে।

এই সিদ্ধান্ত অভিবাসন ব্যবস্থাপনা ও ইউরোপের অভ্যন্তরীণ চলাচলের স্বাধীনতার মধ্যে ভারসাম্য রক্ষার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ।

ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধে আলোচনা চলছে, তবে প্রস্তাবে সন্তুষ্ট নয় রাশিয়া

ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধে কূটনৈতিক তৎপরতা অব্যাহত থাকলেও শান্তি প্রতিষ্ঠার পথে বড় বাধা রয়ে গেছে। রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফের বৈঠকের পর আলোচনায় অগ্রগতির আশা তৈরি হলেও মস্কো সাম্প্রতিক শান্তি প্রস্তাবগুলোকে যথেষ্ট কার্যকর বলে মনে করছে না।

বৃহস্পতিবার প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রাশিয়ার পক্ষ থেকে প্রস্তাবগুলোর পর্যাপ্ত বিষয়বস্তু নেই বলে মন্তব্য করা হয়েছে। অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আলোচনাকে যুদ্ধ শেষ করার প্রচেষ্টায় গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হিসেবে তুলে ধরেছেন।

এর আগে উইটকফ নরওয়ের অসলোতে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি ও ইউরোপীয় নেতাদের সঙ্গে আলোচনা করেন। যুদ্ধ-পরবর্তী নিরাপত্তাব্যবস্থা এবং সম্ভাব্য শান্তি আলোচনার কাঠামো এসব তৎপরতার গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

তবে কূটনৈতিক আলোচনা চললেও ইউক্রেন ও রাশিয়ার মধ্যে হামলা অব্যাহত রয়েছে। ফলে আলোচনার উদ্যোগ বাস্তবে যুদ্ধবিরতিতে রূপ নেবে কি না, তা এখনো অনিশ্চিত।