লন্ডন শহরের ঐতিহাসিক বিয়ারের বন্যা !
তথ্য কণিকা ডেস্ক, ৬ জানুয়ারি : বন্যা মানেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে নদীর জল, প্রবল বৃষ্টি, ভাঙা বাঁধ আর ঘোলা স্রোত। কিন্তু ইতিহাস কখনও কখনও এমন ঘটনা হাজির করে, যা কল্পনাকেও হার মানায়। লন্ডন শহরের ইতিহাসে ঠিক তেমনই এক বিস্ময়কর ও ভয়াবহ অধ্যায়—বিয়ারের বন্যা। জল নয়, শহর একদিন ডুবে গিয়েছিল ফেনায় ওঠা বাদামি বিয়ারে।
ঘটনাটি ঘটে ১৮১৪ সালের ১৭ অক্টোবর। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের রাজধানী তখন শিল্পবিপ্লবের দাপটে বদলে যাচ্ছে। টটেনহ্যাম কোর্ট রোড এলাকায় অবস্থিত মিউক্স অ্যান্ড কোম্পানির হর্স শু ব্রিউয়ারি ছিল লন্ডনের বৃহত্তম ও ব্যস্ততম বিয়ার কারখানাগুলির একটি। এখানে বিশেষ ধরনের বাদামি মল্ট বিয়ার তৈরি হতো, যা সে সময় ভীষণ জনপ্রিয়।

এই ব্রিউয়ারিতে মজুত থাকত দৈত্যাকার কাঠের তৈরি ভ্যাট—প্রায় ২২ ফুট উঁচু। প্রতিটি ভ্যাটে লক্ষ লক্ষ লিটার বিয়ার রাখা হতো এবং সেগুলো শক্ত লোহার রিং দিয়ে বাঁধা থাকত। কিন্তু ওই বিকেলে হঠাৎ একটি লোহার রিং ভেঙে যায়। বিষয়টি তখন খুব একটা গুরুত্ব পায়নি। প্রায় এক ঘণ্টা পরে আচমকাই পুরো ভ্যাটটি ফেটে যায়।
এরপর যা ঘটে, তা যেন কোনো দুঃস্বপ্ন। প্রায় ১৪ লক্ষ লিটার বিয়ার একসঙ্গে বেরিয়ে আসে। প্রবল চাপে ব্রিউয়ারির পিছনের দেওয়াল ভেঙে পড়ে। একটির পর একটি কাঠের পিপে ফেটে গিয়ে বিয়ারের স্রোত রাস্তায় নামতে শুরু করে। মুহূর্তের মধ্যে টটেনহ্যাম কোর্ট রোড সংলগ্ন সেন্ট জাইলস এলাকা ডুবে যায় বিয়ারে।
সেন্ট জাইলস ছিল সে সময় লন্ডনের অন্যতম দরিদ্র ও ঘনবসতিপূর্ণ এলাকা। ছোট ছোট ঘর, দুর্বল দেওয়াল, নিচু বেসমেন্ট—সব মিলিয়ে এলাকা ছিল অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। বিয়ারের ঢেউ কোথাও কোথাও ১৫ ফুট পর্যন্ত উঁচু হয়ে ওঠে। একাধিক বাড়ির দেওয়াল ও বেসমেন্ট ভেঙে পড়ে। মানুষ প্রাণ বাঁচাতে আসবাবপত্রের উপর উঠে পড়েন।

এই অদ্ভুত বিপর্যয়ে মারা যান অন্তত আট জন। এক বাড়িতে মা ও মেয়ে বসে চা খাচ্ছিলেন—বিয়ারের ঢেউ তাঁদের ভাসিয়ে নিয়ে যায়। পাশের একটি বেসমেন্টে দুই বছরের এক শিশুর শোকসভা চলছিল। সেখানেই বিয়ারের স্রোতে পাঁচ জনের মৃত্যু হয়। পরে আরও এক শিশুর মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়। কয়েক দিন পর অতিরিক্ত মদ্যপানে আরও এক ব্যক্তির মৃত্যুর কথাও তৎকালীন সংবাদপত্রে উঠে আসে।
সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয়, এত বড় দুর্ঘটনার পরও ব্রিউয়ারির কোনও কর্মীর মৃত্যু হয়নি। যদিও অনেকেই আহত হন, কেউ কেউ ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়েছিলেন।
দুর্ঘটনার পরপরই আরেক অদ্ভুত দৃশ্য দেখা যায়। রাস্তায় ছড়িয়ে পড়া ‘বিনামূল্যের বিয়ার’ দেখে বহু মানুষ বালতি, হাঁড়ি, বোতল নিয়ে ছুটে আসেন। কেউ কেউ তো সরাসরি রাস্তা থেকেই বিয়ার পান করতে শুরু করেন। ভয়, উৎসব আর বিশৃঙ্খলা—সব মিলিয়ে এক অবিশ্বাস্য পরিস্থিতি তৈরি হয়।
বিয়ারের দুর্গন্ধে এলাকাটি মাসের পর মাস বাসের অযোগ্য হয়ে পড়ে। ধ্বংসস্তূপ দেখতে ভিড় জমে যায় কৌতূহলী মানুষের। এমনকি পাহারাদারেরা এক পয়সা করে টিকিট নিয়ে লোকজনকে ভ্যাটের ভাঙা অংশ দেখাতেন। সেই টাকাও নাকি নিহতদের শেষকৃত্যের জন্য দান করা হয়েছিল।
আর্থিক দিক থেকে ব্রিউয়ারির ক্ষতি হয়েছিল প্রায় ২৩ হাজার পাউন্ড—আজকের মূল্যে প্রায় ১২ লক্ষ পাউন্ডের সমান। তবে ব্রিটিশ সরকারের কাছ থেকে আবগারি শুল্ক ফেরত পাওয়ায় সংস্থাটি দেউলিয়া হওয়ার হাত থেকে রক্ষা পায়।
তদন্ত শেষে এই বিপর্যয়কে ঘোষণা করা হয় ‘ঈশ্বরের কাজ’ (Act of God)। অর্থাৎ, কারখানার গাফিলতি প্রমাণিত হয়নি। ফলে নিহতদের পরিবার কিংবা ক্ষতিগ্রস্ত বাসিন্দারা কোনও ক্ষতিপূরণ পাননি।
এই ঘটনার পর ব্রিউয়ারিগুলো কাঠের ভ্যাট ব্যবহার ধীরে ধীরে বন্ধ করে কংক্রিটের ট্যাঙ্কের দিকে ঝোঁকে। মিউক্স অ্যান্ড কোম্পানি আবার ব্যবসা শুরু করলেও ১৯২১ সালে সেই ব্রিউয়ারি বন্ধ হয়ে যায়। পরের বছর ভেঙে ফেলা হয় কারখানাটি। আজ সেই জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে ডোমিনিয়ন থিয়েটার।

লন্ডনের ব্যস্ত রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে আজ আর কেউ ভাবেও না—এই মাটির নিচে একদিন বইেছিল বিয়ারের বন্যা। ইতিহাসের পাতায় চাপা পড়ে থাকা এই ঘটনা মনে করিয়ে দেয়, সভ্যতার অগ্রগতির মাঝেও মানুষের তৈরি কাঠামো কখনও কখনও কী ভয়ংকর রূপ নিতে পারে। লন্ডনের সেই দিন প্রমাণ করেছিল—বন্যা শুধু জলেরই হয় না, কখনও কখনও তা হয় ফেনা ওঠা বিয়ারেও।