পাগলা মসজিদে কোটি কোটি টাকার মানত: শিরক না পুণ্য—কী জমা হচ্ছে?

পাগলা মসজিদে কোটি কোটি টাকার মানত: শিরক না পুণ্য—কী জমা হচ্ছে?

কলিকালের কলধ্বনি: পর্ব ৫১

।। সিদ্দিকুর রহমান নির্ঝর ।।

আজকের কলাম মন দিয়ে পড়ার পর কারো কোন আপত্তি বা প্রশ্ন থাকলে ‘ভয়েস অব পিপল’-এ প্রকাশিত ফোনে মেসেজ দিতে পারে অথবা msnirjhor786@gmail.com -এ ইমেইলে আপনার মতামত লিখে জানাতে পারেন। যেকোন পাঠকের  মন্তব্য বা মতামত আমরা ‘ভয়েস অব পিপল’-এ তুলে ধরতে সচেষ্ট থাকবো। সম্পাদক। 

কিশোরগঞ্জের ঐতিহাসিক পাগলা মসজিদ আজ শুধু একটি উপাসনালয় নয়, এটি যেন এক বিশাল বিশ্বাসকেন্দ্র। সম্প্রতি মসজিদের দানবাক্স খুলে পাওয়া গেছে ৩৫ বস্তায় ১১ কোটি ৭৮ লাখ ৪৮ হাজার ৫৩৮ টাকা—এ যাবৎকালের সর্বোচ্চ রেকর্ড। এর সঙ্গে পাওয়া গেছে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা, স্বর্ণ ও রূপার অলংকার। প্রতি বছরই এভাবে কোটি কোটি টাকা, সোনা-রূপা, নানা সম্পদ জমা পড়ছে। আর এই দানের বড় অংশই আসে মানতের নামে। প্রতি বছর তিন মাস পর পর বস্তা খুলে খুলে এভাবে মানতের টাকা মসজিদ কর্তৃপক্ষ খুলে জমা করে বহু বছর ধরে। 

অনেকে বিশ্বাস করেন, এখানে দান করলে অসুখ সারে, চাকরি হয়, মামলা জেতা যায়, সন্তান আসে, ব্যবসা দাঁড়িয়ে যায়। এই বিশ্বাসকে শুধু সামাজিকভাবে মেনে নেওয়া হয়নি—বাস্তবে এটি রীতিমতো উৎসাহিতও করা হচ্ছে। প্রশাসনের উপস্থিতিতে, রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনায় দানবাক্স খোলা হয়, টাকা গণনা হয়, সংবাদ হয়। ফলে সাধারণ মানুষের মনে এটি আরও পোক্ত হয়—এ যেন এক স্বীকৃত, বৈধ, এমনকি প্রশংসনীয় ধর্মচর্চা।

শুধু পাগলা মসজিদে নয়, সিলেটের হযরত শাহজালাল বা শাহপরান বা খান জাহান আলী (রহ:) এঁদের কবরস্থান সংলগ্ন মসজিদে এভাবে অনেক মুসলমান সন্তান হবার জন্য, পরীক্ষা পাশের জন্য ইত্যাদি নানান বিষয়ে মানত করে টাকা পয়সা দান করে থাকেন সমানে। প্রতিবছর এই পদ্ধতিতে কোটি কোটি টাকা, সোনাদানা ও অন্যান্য মূল্যবান জিনিসপত্র মানুষ মানত করে দান করে চলেছে এবং দান নেওয়া ও গণনার দায়িত্বে যারা আছেন—মাদ্রাসার আলেম, ছাত্র এবং স্থানীয় প্রশাসনের কর্মকর্তা—তারা নিয়মিত এই কর্মকাণ্ডে সরাসরি অংশ নিচ্ছেন।

প্রশ্ন হলো: তারা কি জানেন, এভাবে জনগণকে মানতের প্রতি উৎসাহিত করা কতটা বিপজ্জনক এবং শিরকমূলক কাজ? নাকি এরা এমন আচরণ করছে, অথচ ইসলামের মৌলিক শিক্ষা সম্পর্কে কিছুই জানে না?

ইসলামে কোথাও এমন বিধান নেই যে, কোনো মসজিদে বা পবিত্র স্থানে দান করলে আল্লাহ তাৎক্ষণিকভাবে পাপ মোচন বা মনোবাসনা পূর্ণ করবে। বরং মানত করে খয়রাত করা শিরক পর্যায়ের গুনাহ। কোরআন স্পষ্টভাবে সতর্ক করেছে:

“যে ব্যক্তি আল্লাহ ছাড়া অন্য কারও নামে কাজ করে, তার কাজ কবুল হবে না; সে চিরন্তন ক্ষতির মধ্যে আছে।” (সূরা আলে-ইমরান, ৩:৭৬)

সহিহ হাদিসেও বর্ণিত আছে, যে ব্যক্তি মানত বা শিরক করে মৃত্যু হয়, তার আখেরাতে নাজাত হবে না, যতই সে ভ্রান্তভাবে দান খয়রাত করুক।

কিন্তু পাগলা মসজিদের বাস্তবতা হচ্ছে: কোটি কোটি টাকা, সোনা, বৈদেশিক মুদ্রা নিয়মিতভাবে দানবাক্সে জমা হচ্ছে, এবং এটি সরকারের নিরবচেতনা ও স্থানীয় ধর্মীয় নেতাদের উদাসীনতার কারণে উৎসাহিতও করা হচ্ছে। প্রতিটি দান গণনা করার সময় শুধু হিসাব রাখা হয়, কিন্তু ইসলামের দৃষ্টিতে এই “পবিত্র কাজে” শিরকের ভয়াবহতা নিয়ে কোনও সচেতনতা নেই।

কিন্তু প্রশ্ন হলো—এই বিশ্বাস কি আদৌ ইসলামের আলোকে সঠিক? নাকি অজান্তেই আমরা এমন এক পথে হাঁটছি, যাকে ইসলাম স্পষ্ট ভাষায় শিরক বলে চিহ্নিত করেছে?

এই প্রশ্নের উত্তর আবেগ দিয়ে নয়, দিতে হবে কোরআন ও সহিহ হাদিসের আলোকে।

ইবাদত, মানত ও দোয়ার মালিক কে?

ইসলামে একটি মৌলিক নীতি হলো—সব ইবাদত একমাত্র আল্লাহর জন্য নির্দিষ্ট। নামাজ, রোজা যেমন ইবাদত, তেমনি মানত (নযর)-ও একটি ইবাদত। আর ইবাদতের ক্ষেত্রে সামান্যতম অংশও আল্লাহ ছাড়া অন্য কারও জন্য নির্ধারিত হলে তা শিরক হয়ে যায়।

আল্লাহ তায়ালা বলেন—

“তোমরা আল্লাহর সঙ্গে অন্য কাউকে ডাকো না।”
(সূরা আল-জিন, আয়াত ১৮)

আরেক স্থানে আরও স্পষ্টভাবে—

“নিশ্চয়ই মসজিদসমূহ আল্লাহরই জন্য। সুতরাং আল্লাহর সঙ্গে অন্য কাউকে ডেকো না।”
(সূরা আল-জিন, আয়াত ১৮)

এখানে “ডাকা” বলতে শুধু মুখে ডাকা নয়—আশা করা, ভরসা করা, বিনিময়ের প্রত্যাশা করা—সবই অন্তর্ভুক্ত।

মানত কাকে করা যায়?

মানত মানে—কোনো কিছু পাওয়ার শর্তে কোনো কাজ করার অঙ্গীকার। ইসলামে এই মানত শুধু আল্লাহর জন্যই বৈধ।

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—

“যে ব্যক্তি আল্লাহর আনুগত্যের মানত করে, সে যেন তা পূরণ করে।”
(সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬৬৯৬)

অন্যদিকে তিনি কঠোরভাবে সতর্ক করেছেন—

“যে ব্যক্তি আল্লাহ ছাড়া অন্য কারও নামে মানত করে, সে শিরক করল।”
(মুসনাদে আহমাদ; সহিহ হিসেবে গ্রহণযোগ্য)

অর্থাৎ কেউ যদি মনে করে—
“এই মসজিদে মানত করলে আমার কাজ হবে”,
“এই জায়গায় দান দিলেই বিপদ কেটে যাবে”—
তাহলে সে আল্লাহর সঙ্গে সরাসরি সম্পর্ক না রেখে একটি স্থানকে ক্ষমতার উৎস বানাচ্ছে।

দান আর মানতের পার্থক্য

এখানে একটি মৌলিক পার্থক্য স্পষ্ট করা জরুরি।

দান (সদকা):
আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য, নিঃশর্তভাবে দেওয়া।
এর প্রতিদান আল্লাহ দেন, নিজের হিকমাহ অনুযায়ী।

মানতভিত্তিক দান:
কোনো কিছু পাওয়ার শর্তে দেওয়া।
প্রাপ্যতা নির্ভর করে একটি স্থান বা মাধ্যমের ওপর।

এই দ্বিতীয় প্রকারটাই ভয়াবহ।

আল্লাহ বলেন—

“তোমরা যা কিছু দান করো, তা আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্যই করো।”
(সূরা আল-বাকারা, আয়াত ২৭২)

তাহলে পাগলা মসজিদে দান কি হারাম?

না, মসজিদে দান করা নিজেই হারাম নয়।

কিন্তু শর্ত হলো—

দান হবে নিঃশর্ত

উদ্দেশ্য হবে আল্লাহর সন্তুষ্টি

কোনো স্থানের সঙ্গে অলৌকিক ক্ষমতা জুড়ে দেওয়া যাবে না

কিন্তু বাস্তবে কী হচ্ছে?

মানুষ বলছে—
“ওখানে না দিলে কাজ হয় না।”
“ওটা খুব পাওয়ারফুল জায়গা।”

এই বিশ্বাসই সমস্যার মূল।

সবচেয়ে গুরুতর প্রশ্ন: আলেম-উলামারা কোথায়?

এখানে সবচেয়ে অস্বস্তিকর প্রশ্নটি আসে।

এই কোটি কোটি টাকার মানত কে দিচ্ছে—আমরা জানি।
কিন্তু এই টাকা কে তুলছে, কে গুনছে, কে তত্ত্বাবধান করছে?

প্রতিবার দানবাক্স খোলার সময় দেখা যায়—এই কাজে যুক্ত থাকেন আলেম-উলামা, মাদরাসার শিক্ষক ও ছাত্ররা।
যারা কোরআন-হাদিস পড়েন, পড়ান, মুখস্থ করেন।

তাহলে প্রশ্ন ওঠে—

এরা কি জেনেশুনেই জনগণকে এই মানতনির্ভর দানে উৎসাহিত করছেন?
নাকি এ ধরনের মানতের আকিদাগত ভয়াবহতা সম্পর্কে তারা আদৌ জানেন না?

দুইটাই ভয়াবহ।

কারণ যদি জেনেশুনে নীরব থাকেন, তবে তা ইলম গোপন করা।
আর যদি না জানেন—তাহলে প্রশ্ন আসে,
এত কোরআন-হাদিস পড়েও এটা না জানাটা কীভাবে সম্ভব?

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন—

যে ব্যক্তি এমন ইলম গোপন করে, যা প্রকাশ করা জরুরি, কিয়ামতের দিন তাকে আগুনের লাগাম পরানো হবে।”
(সুনানে আবু দাউদ)

শিরকের ভয়াবহ পরিণতি

শিরক সম্পর্কে আল্লাহর ঘোষণা দ্ব্যর্থহীন—

“নিশ্চয়ই আল্লাহ তাঁর সঙ্গে শিরক করাকে ক্ষমা করেন না।”
(সূরা আন-নিসা, আয়াত ৪৮)

অর্থাৎ তওবা ছাড়া শিরকের কোনো ক্ষমা নেই।

করণীয় কী?

১. দান করুন—কিন্তু বিশ্বাস শুদ্ধ করে
২. মানত হলে শুধু আল্লাহর নামে
৩. দোয়া সরাসরি আল্লাহর কাছে
৪. কোনো স্থান বা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ক্ষমতা জুড়ে দেবেন না
৫. অতীতে এমন করে থাকলে এখনই তওবা করুন

আল্লাহ বলেন—

“হে আমার বান্দারা, তোমরা আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না।”
(সূরা আয-যুমার, আয়াত ৫৩)

পাগলা মসজিদের দানবাক্সে জমা পড়া কোটি কোটি টাকা আমাদের উদারতার গল্প নয়, বরং আমাদের আকিদাগত বিভ্রান্তির আয়না।

ইসলাম আবেগের ধর্ম নয়—এটি জ্ঞানের ধর্ম।
বিশ্বাস যত গভীর হবে, তত শুদ্ধ হওয়া জরুরি।

নইলে দুনিয়ায় যে দানকে পুণ্য মনে করছি,
আখিরাতে সেটাই হতে পারে আমাদের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় অভিযোগ।

ইবাদত একমাত্র আল্লাহর জন্যই থাকুক
কোনো স্থান, কোনো মাধ্যম, কোনো প্রথা যেন কখনোই সেই জায়গা দখল না করে।

এবার ভাবুন—যারা এসব দান তুলে, গণনা করে এবং মসজিদের বিভিন্ন কাজে ব্যবহার করছে, তারা কি জানে যে তাদের এ কার্যক্রম মানতকে বৈধ হিসেবে স্বীকৃতি দিচ্ছে, যা ইসলামের মূল শিক্ষার পরিপন্থী? তারা তো কোরআন ও হাদিস বেশি পড়েছে, অথচ জনগণকে এমন শিরকমূলক আচরণে উৎসাহিত করছে। এটা কিভাবে সম্ভব?

এছাড়া, পাগলা মসজিদ কেন্দ্রিক একটি ১০ তলা বিশিষ্ট ইসলামিক কমপ্লেক্স নির্মাণের পরিকল্পনা চলছে। ভবনে থাকবে অনাথ-এতিমদের জন্য শিক্ষা ব্যবস্থা, ধর্মীয় শিক্ষা, মাদ্রাসা, পাঠাগার, ক্যাফেটেরিয়া এবং আইটি সেকশন। বিষয়টি অনেকে স্বাগত জানালেও প্রশ্ন থেকে যায়—এই প্রজেক্টের জন্য যে কোটি কোটি টাকা মানুষ দিচ্ছে, তা কি শিরক বা পূণ্য হিসেবে বিবেচনা করা যাবে? ইসলামের দৃষ্টিতে স্পষ্ট উত্তর হলো—শিরক।

মানব ইতিহাসে এমন নজির বিরল যে, এত বিশাল পরিমাণ অর্থ শিরকমূলক প্রচলনের জন্য একত্রিত হয়। পাগলা মসজিদে যে কোটি কোটি টাকা, সোনা ও বৈদেশিক মুদ্রা জমা হচ্ছে, তা যদি ইসলামের শিক্ষা অনুযায়ী মূল্যায়ন করা হয়, তবে এটি পূর্ণাঙ্গ শিরক, পূণ্য নয়। সচেতন হওয়া দরকার—আমরা কি চাই ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে ধর্মের নামে শিরকময় প্রচলনের কবলে ফেলা? নাকি সত্যিকারের ইসলামের শিক্ষার প্রতি জনগণকে সচেতন করে সত্যিকারের খয়রাত করার পথ দেখানো?

লেখক : সম্পাদক, কলামিস্ট, বিশ্লেষক ও সাবে অধ্যাপক

লন্ডন, ২৮ ডিসেম্বর ২০২৫।