ভয়েস অব পিপল ।। জনগণের কণ্ঠস্বর, বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি
না ফেরার দেশে শিল্প-সংস্কৃতির উজ্জল নক্ষত্র ভাষাসৈনিক মুস্তাফা মনোয়ার
ভয়েস অব পিপল রিপোর্ট, ২৯ জুন:
বাংলাদেশের শিল্প-সংস্কৃতির অঙ্গনের অন্যতম পথিকৃৎ, খ্যাতিমান চিত্রশিল্পী ও পাপেট আন্দোলনের অগ্রদূত মুস্তাফা মনোয়ার আর নেই। সোমবার (২৯ জুন) সকালে রাজধানীর স্কয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৯০ বছর। ভয়েস অব পিপল এর পক্ষ থেকে আমরা তাঁর আত্মার মাগফেরাত কামনা করি।
তাঁর পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, দীর্ঘদিন ধরে তিনি নিউমোনিয়া ও প্রোস্টেট ক্যানসারে ভুগছিলেন। চলতি মাসের ১৪ তারিখে অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পর চিকিৎসকদের নিবিড় পর্যবেক্ষণে ছিলেন। সোমবার সকাল সাড়ে ৮টার দিকে তাঁর মৃত্যু হয়।
পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, হাসপাতাল থেকে তাঁর মরদেহ প্রথমে ধানমন্ডির তাকওয়া মসজিদে নেওয়া হবে। পরে ধানমন্ডির ১ নম্বর সড়কের বাসভবনে রাখা হবে, যাতে শুভাকাঙ্ক্ষীরা শেষ শ্রদ্ধা জানাতে পারেন। জানাজা ও দাফনের সময়সূচি পরে ঘোষণা করা হবে।
১৯৩৫ সালের ১ সেপ্টেম্বরে তাঁর জন্ম। মুস্তাফা মনোয়ার ছিলেন ‘বিশ্বনবী‘ খ্যাত কবি গোলাম মোস্তফার ছেলে। ছোটবেলা থেকেই ছবি আঁকা ও সংগীতের প্রতি তাঁর গভীর অনুরাগ ছিল। ভাষা আন্দোলনের সময় নবম শ্রেণির ছাত্র অবস্থায় প্রতিবাদী পোস্টার আঁকার কারণে এক মাস কারাবরণও করেন । সেই বয়সে পুলিশের দ্বারা প্রচুর শারিরীক নির্যাতনের শিকার হন। পরবর্তী সময়ে সেই দেশপ্রেমই তাঁর শিল্পচর্চার অন্যতম ভিত্তি হয়ে ওঠে।
বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের লাল সূর্যের অন্যতম নকশাকার হিসেবে তাঁর নাম ইতিহাসে অমর হয়ে আছে। শিশুদের জন্য সৃষ্টি করেছেন জনপ্রিয় চরিত্র 'পারুল', যুক্ত ছিলেন আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিত 'মীনা' প্রকল্পের সঙ্গে। তাঁর পরিকল্পনা ও নির্মাণে বাংলাদেশ টেলিভিশনের শিশুদের প্রতিভা বিকাশের জনপ্রিয় অনুষ্ঠান 'নতুন কুঁড়ি' দীর্ঘ সময় ধরে দেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গনকে সমৃদ্ধ করেছে। পাশাপাশি 'মনের কথা' অনুষ্ঠানও দর্শকদের কাছে ব্যাপক সমাদৃত হয়।
মুক্তিযুদ্ধের সময় শরণার্থী শিবিরে যুদ্ধবিধ্বস্ত শিশুদের মুখে হাসি ফোটাতে তিনি আয়োজন করেন জীবনের প্রথম পাপেট শো। স্বাধীনতার পর তাঁর হাত ধরেই বাংলাদেশে আধুনিক পাপেট শিল্পের বিকাশ ঘটে। এ কারণেই তিনি 'বাংলাদেশের পাপেটম্যান' নামে সুপরিচিত হয়ে ওঠেন।
পেশাজীবনে তিনি পূর্ব পাকিস্তান চারু ও কারুকলা মহাবিদ্যালয়ের প্রভাষক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। পরে বাংলাদেশ শিশু একাডেমি, বাংলাদেশ টেলিভিশন, বাংলাদেশ চলচ্চিত্র উন্নয়ন সংস্থা (বিএফডিসি) এবং বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমিসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে দায়িত্ব পালন করেন। শিক্ষক, প্রশাসক ও সংস্কৃতি সংগঠক—প্রতিটি পরিচয়েই তিনি রেখেছেন স্বতন্ত্র অবদান।
শিল্প ও সংস্কৃতিতে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ২০০৪ সালে তিনি একুশে পদকে ভূষিত হন। এছাড়া দেশ-বিদেশে বহু সম্মাননা অর্জন করেন তিনি।
সম্প্রতি তাঁকে নিয়ে নির্মিত প্রামাণ্যচিত্র 'শিল্প সারথি' নতুন প্রজন্মের কাছে তাঁর জীবন ও কর্মকে তুলে ধরার উদ্যোগ নেয়। চলচ্চিত্রটি নির্মাণ করেন আবীর শ্রেষ্ঠ এবং বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির উদ্যোগে এর প্রদর্শনীরও আয়োজন করা হয়েছিল।
মুস্তাফা মনোয়ারের মৃত্যুতে দেশের শিল্প, সাহিত্য, টেলিভিশন ও সংস্কৃতি অঙ্গনে গভীর শোকের ছায়া নেমে এসেছে। শিল্পপ্রেমীদের মতে, একজন মানুষ বিদায় নিলেও তাঁর সৃষ্টি, দর্শন ও সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার বাংলাদেশের শিল্পভুবনে প্রজন্মের পর প্রজন্ম আলো ছড়িয়ে যাবে।