ভয়েস অব পিপল ।। জনগণের কণ্ঠস্বর, বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি

কলিকালের কলধ্বনি ।। ১৫১ ।। একজন মানবিক হৃদয়ের বঙ্গবন্ধুর ৫১তম মৃত্যুবার্ষিকী আজ

কলিকালের কলধ্বনি ।। ১৫১ ।।  একজন মানবিক হৃদয়ের বঙ্গবন্ধুর ৫১তম মৃত্যুবার্ষিকী আজ

উৎসর্গ

স্বাধীনতার স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে—
ইতিহাসের আলো ও ছায়ায়, একজন মানুষ হিসেবে।

তিহাসের কিছু মানুষকে আমরা এত বেশি ভালোবাসি যে, একসময় তাঁদের মানুষ হিসেবে দেখতে ভুলে যাই। তাঁদের চারপাশে তৈরি করি কিংবদন্তির দেয়াল। তারপর সেই দেয়ালের ভেতরে তাঁরা আর রক্ত-মাংসের মানুষ থাকেন না—হয়ে ওঠেন প্রায় দেবতুল্য কোনো চরিত্র। অথচ মানুষের সবচেয়ে বড় পরিচয়ই হলো—তার আলো আছে, আবার অন্ধকারও আছে; তার মহত্ত্ব আছে, আবার ভুলও আছে।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানও তার ব্যতিক্রম নন।

আজ ১৫ আগস্ট। ১৯৭৫ সালের এই দিনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যা করা হয়। তাঁর স্ত্রী বেগম ফজিলাতুন নেছা মুজিব, তিন ছেলে শেখ কামাল, শেখ জামাল ও শিশু শেখ রাসেল, দুই পুত্রবধূ সুলতানা কামাল ও রোজী জামালসহ পরিবারের বহু সদস্যকে হত্যা করা হয়। একই হত্যাযজ্ঞে শেখ ফজলুল হক মনি ও তাঁর অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী আরজু মনি, আবদুর রব সেরনিয়াবাতের পরিবারের সদস্যসহ আরও অনেকে প্রাণ হারান। তাঁর দুই কন্যা শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা তখন বিদেশে থাকায় বেঁচে যান।

আজ সেই হত্যাকাণ্ডের ৫১ বছর।

কিন্তু ১৫ আগস্টকে শুধু শোকের দিন হিসেবে দেখলে বঙ্গবন্ধুকে পুরোপুরি দেখা হবে না। বরং এই দিনটি হতে পারে তাঁকে মূর্তি থেকে নামিয়ে মানুষ হিসেবে দেখার দিন

কারণ বঙ্গবন্ধু শুধু স্বাধীনতার স্থপতি নন; তিনি একজন বাবা, স্বামী, বন্ধু, রাজনৈতিক নেতা, ক্ষমতাসীন রাষ্ট্রপ্রধান এবং শেষ পর্যন্ত একজন ভুল করতে পারেন এমন মানুষও ছিলেন।

এই পূর্ণ মানুষটিকেই আমাদের দেখা দরকার।

যে মানুষটি মানুষকে আপন করে নিতে পারতেন

বঙ্গবন্ধুর মানবিক চরিত্রের কথা বলতে গেলে তাঁর সমকালীনদের স্মৃতিচারণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সাংবাদিক এবিএম মূসার স্মৃতিচারণমূলক লেখায় যে বঙ্গবন্ধুকে পাওয়া যায়, তিনি কেবল রাষ্ট্রনায়ক নন—তিনি রসিক, সহজে মানুষের সঙ্গে মিশে যেতে পারা এবং কাছের মানুষকে আপন করে নেওয়া এক ‘মুজিব ভাই’।

এই ‘ভাই’ সম্বোধনের মধ্যেই যেন বঙ্গবন্ধুর ব্যক্তিত্বের একটি বড় দিক লুকিয়ে আছে। তিনি মানুষের সঙ্গে দূরত্ব তৈরি করে রাজনীতি করতে পারতেন না। তাঁর রাজনীতির সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল মানুষের কাছে পৌঁছাতে পারা।

আহমদ ছফাও বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে লিখতে গিয়ে তাঁকে নিছক রাজনৈতিক পরিসংখ্যানের মানুষ হিসেবে দেখেননি। ছফার লেখায় বঙ্গবন্ধুর মধ্যে যে আবেগ, ভালোবাসা ও মানুষের সঙ্গে একাত্ম হওয়ার ক্ষমতা দেখা যায়, তা তাঁকে অন্য অনেক রাজনীতিকের চেয়ে আলাদা করে।

কিন্তু আহমদ ছফার গুরুত্ব এখানেই—তিনি বঙ্গবন্ধুকে অন্ধভাবে পূজা করেননি। তাঁকে মানুষ হিসেবেই বিচার করেছেন।

আমাদেরও সেই সাহস দরকার।

বঙ্গবন্ধুর ভেতরে ছিল এক সংবেদনশীল মানুষ

শিল্পী হাশেম খানের স্মৃতিচারণে বঙ্গবন্ধুর শিল্পরুচি ও মানবিকতার একটি চমৎকার যোগসূত্র পাওয়া যায়। তাঁর ভাষায়, বঙ্গবন্ধুর রুচি ছিল উন্নত এবং তাঁর শিল্পমানস ছিল আধুনিক—আর সেজন্যই তিনি ছিলেন মানবিক।

এখানে একটি গভীর সত্য আছে।

মানুষের কষ্ট বোঝার ক্ষমতা শুধু রাজনৈতিক বক্তৃতা দিয়ে তৈরি হয় না। একটি গান, একটি কবিতা, একটি ছবি, একটি মানুষের মুখ—এসবের মধ্যেও যে সমাজ ও মানুষের ইতিহাস থাকে, সেটি অনুভব করার ক্ষমতা একজন নেতাকে অন্য মাত্রায় নিয়ে যায়।

বঙ্গবন্ধুর মধ্যে সেই সংবেদনশীলতা ছিল।

সানজিদা খাতুনের স্মৃতিচারণে তাঁর বাংলা গান ও সংস্কৃতির প্রতি আকর্ষণের নানা দৃষ্টান্ত পাওয়া যায়। বাঙালির সাংস্কৃতিক পরিচয়কে তিনি রাজনৈতিক পরিচয়ের সঙ্গে যুক্ত করেছিলেন। ‘আমার সোনার বাংলা’ শুধু একটি গান নয়—বাঙালির আত্মপরিচয়ের এক আবেগময় প্রতীক হয়ে ওঠার পেছনে যে রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক চেতনা কাজ করেছে, বঙ্গবন্ধু তার অন্যতম প্রধান বাহক।

তিনি ছিলেন একজন আবেগপ্রবণ বাবা। বঙ্গবন্ধুকে বোঝার আরেকটি দরজা তাঁর পারিবারিক জীবন।

দীর্ঘ কারাজীবন একজন রাজনৈতিক নেতাকে যেমন কঠিন করেছে, তেমনি তাঁর ভেতরের কোমল মানুষটিকেও প্রকাশ করেছে। পরিবারের জন্য তাঁর উদ্বেগ, সন্তানদের জন্য আকুলতা, স্ত্রী ফজিলাতুন নেছা মুজিবের প্রতি নির্ভরতা—এসব স্মৃতিচারণে বারবার ফিরে আসে।

রাজনীতির মঞ্চে যে মানুষটি লাখো মানুষকে নির্দেশ দিতে পারেন, রাতের নির্জনতায় সেই মানুষটিই সন্তানের কথা ভেবে ব্যথিত হন।

এই দুই বঙ্গবন্ধু আসলে আলাদা কেউ নন।

একজনই।

আর ১৫ আগস্টের সবচেয়ে নির্মম দিক সম্ভবত এখানেই—রাজনৈতিক প্রতিশোধের নামে একটি পরিবারের শিশু পর্যন্ত রেহাই পায়নি।

দশ বছরের শেখ রাসেলকে হত্যা কোনো রাজনৈতিক যুক্তির মধ্যে পড়ে না। একটি শিশুর মৃত্যু সব রাজনৈতিক হিসাবকে অতিক্রম করে যায়। সেখানে শুধু একটি পরিবারের নয়, মানবতারও পরাজয় ঘটে।

কিন্তু মানবিক মানুষ মানেই ভুলহীন মানুষ নয়

এখানেই আমাদের একটু থামতে হবে।

বঙ্গবন্ধুকে ভালোবাসি বলে তাঁর সব সিদ্ধান্তকে সঠিক বলতে হবে—এমন কোনো ইতিহাস নেই।

স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধুর সামনে যে বাংলাদেশটি ছিল, সেটি ছিল যুদ্ধবিধ্বস্ত, অর্থনৈতিকভাবে বিপর্যস্ত, প্রশাসনিকভাবে দুর্বল একটি নতুন রাষ্ট্র। অবকাঠামো ধ্বংস, খাদ্য সংকট, আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক চাপ, বন্যা, দুর্নীতি ও প্রশাসনিক অদক্ষতা—সব মিলিয়ে পরিস্থিতি ছিল ভয়াবহ।

১৯৭৪-এর দুর্ভিক্ষ সেই সংকটের সবচেয়ে নির্মম প্রকাশ। গবেষণা দেখিয়েছে, ওই দুর্ভিক্ষের পেছনে শুধু খাদ্য উৎপাদনের ঘাটতি ছিল না; বন্যা, কর্মসংস্থান ও মজুরি, খাদ্যের বাজার ও বণ্টনব্যবস্থা, মূল্যস্ফীতি এবং নীতিগত ও প্রশাসনিক ব্যর্থতাও গুরুত্বপূর্ণ ছিল।

তবু রাষ্ট্রের প্রধান হিসেবে বঙ্গবন্ধু সেই ব্যর্থতার দায় থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত নন।

কারণ রাষ্ট্রের সাফল্যের কৃতিত্ব যেমন নেতৃত্বকে নিতে হয়, ব্যর্থতার দায়ও নেতৃত্বকে নিতে হয়।

এটাই ইতিহাসের নির্মোহ নিয়ম।

বাকশাল: বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে কঠিন প্রশ্ন

আরও বড় প্রশ্ন আসে ১৯৭৫ সালে।

চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে বাংলাদেশের সংসদীয় ব্যবস্থা বদলে রাষ্ট্রপতিশাসিত কাঠামো আনা হয়। এরপর বাকশালকে একমাত্র বৈধ রাজনৈতিক দল হিসেবে প্রতিষ্ঠার পথ তৈরি হয়। ১৯৭৫ সালের জুনে অধিকাংশ সংবাদপত্র বন্ধ করে চারটি দৈনিক চালু রাখার সিদ্ধান্তও নেওয়া হয়।

এই সিদ্ধান্তকে গণতন্ত্রের দৃষ্টিকোণ থেকে প্রশ্ন করার যথেষ্ট কারণ আছে।

একজন মানুষ যিনি দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রামে জনগণের ভোটের অধিকার, স্বায়ত্তশাসন ও রাজনৈতিক অধিকারের কথা বলেছেন, তাঁর শাসনের শেষ পর্যায়ে এসে রাজনৈতিক বহুত্ববাদ সংকুচিত হওয়া নিঃসন্দেহে একটি ঐতিহাসিক বৈপরীত্য।

কেউ বলতে পারেন, বঙ্গবন্ধু তখন রাষ্ট্রকে বাঁচাতে একটি নতুন ব্যবস্থা চেয়েছিলেন। কেউ বলতে পারেন, তিনি পরিস্থিতির চাপে ভুল রাজনৈতিক পথ বেছে নিয়েছিলেন। কেউ আরও কঠোর সমালোচনা করতে পারেন।

সব মতই ইতিহাসের আলোচনায় থাকতে পারে।

কিন্তু একটি বিষয় পরিষ্কার—বাকশালকে উপেক্ষা করে বঙ্গবন্ধুর পূর্ণ রাজনৈতিক মূল্যায়ন সম্ভব নয়।

তাঁর মহান অবদান যেমন সত্য, তাঁর এই বিতর্কিত সিদ্ধান্তও তেমনি ইতিহাসের সত্য।

তাহলে বঙ্গবন্ধু কে?

এই প্রশ্নের সহজ উত্তর নেই।

তিনি একই সঙ্গে ছিলেন—

একজন অসাধারণ গণনেতা এবং একজন সমালোচিত শাসক।

তিনি ছিলেন মানুষের অধিকার আদায়ের সংগ্রামের নেতা, আবার ক্ষমতায় এসে এমন কিছু সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন যা মানুষের রাজনৈতিক স্বাধীনতা সংকুচিত করেছিল।

তিনি ছিলেন বাঙালির স্বাধীনতার স্বপ্নের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক স্থপতি, আবার স্বাধীন দেশের প্রথম কয়েক বছরের প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক সংকট সামলাতে পারেননি অনেক ক্ষেত্রে।

তিনি ছিলেন পরিবারপ্রেমী, আবেগপ্রবণ, সংস্কৃতিমনা একজন মানুষ; আবার রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে কখনো কঠোর ও এককেন্দ্রিক হয়েছেন।

এই বৈপরীত্যই তাঁকে মানুষ করে।

আর সম্ভবত এ কারণেই বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে বিতর্ক কখনো শেষ হবে না।

মূর্তি নয়, মানুষকে স্মরণ করি

আমাদের সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো—আমরা ইতিহাসের মানুষদের হয় দেবতা বানাই, নয়তো শয়তান বানাই।

মাঝখানে মানুষটির জায়গা থাকে না।

বঙ্গবন্ধুর ক্ষেত্রেও তাই হয়েছে।

একসময় তাঁকে নিয়ে প্রশ্ন করা প্রায় অপরাধের মতো বিবেচিত হয়েছে। আবার আরেক সময়ে তাঁকে ইতিহাস থেকে মুছে ফেলার চেষ্টা হয়েছে। দুটো প্রবণতাই বিপজ্জনক।

কারণ ইতিহাস কারও ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়।

বঙ্গবন্ধু কোনো দলের একার নন। তিনি যেমন আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক উত্তরাধিকারের অংশ, তেমনি বাংলাদেশের রাষ্ট্রের জন্মের ইতিহাসেরও কেন্দ্রীয় চরিত্র। তাঁর অবদানকে অস্বীকার করলে বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাস অসম্পূর্ণ হয়। আবার তাঁর ভুলকে অস্বীকার করলে ইতিহাসও অসম্পূর্ণ হয়।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশে বঙ্গবন্ধুকে ঘিরে ইতিহাসের পুনর্মূল্যায়ন ও পুনর্লিখন নিয়ে তীব্র বিতর্ক তৈরি হয়েছে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমও উল্লেখ করেছে যে নতুন প্রজন্মের সামনে ১৯৭১-এর ইতিহাসকে একাধিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখার দাবি জোরালো হয়েছে।

এটি খারাপ নয়—যদি পুনর্মূল্যায়ন মানে সত্যকে খোঁজা হয়।

কিন্তু পুনর্মূল্যায়ন যদি প্রতিহিংসার নতুন নাম হয়, তাহলে সেটিও ইতিহাসের প্রতি অন্যায়।

বঙ্গবন্ধুর সবচেয়ে বড় শিক্ষা কী?

আমার কাছে বঙ্গবন্ধুর সবচেয়ে বড় শিক্ষা তাঁর কোনো একটি ভাষণ নয়।

তাঁর সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো—একজন মানুষ ইতিহাস পরিবর্তন করতে পারেন।

একজন গ্রামবাংলার ছেলে রাজনৈতিক সংগ্রামের মধ্য দিয়ে এমন জায়গায় পৌঁছাতে পারেন, যেখানে তাঁর কণ্ঠে কোটি মানুষের কণ্ঠস্বর প্রতিধ্বনিত হয়।

কিন্তু একই সঙ্গে তাঁর জীবন আমাদের আরও একটি শিক্ষা দেয়—ইতিহাস পরিবর্তন করতে পারা মানুষও ভুলের ঊর্ধ্বে নন।

তাই বঙ্গবন্ধুকে ভালোবাসার সবচেয়ে পরিণত পদ্ধতি হলো তাঁর ভুলকে ঢেকে রাখা নয়।

বরং বলা—

হ্যাঁ, তিনি ভুল করেছেন।

হ্যাঁ, তাঁর শাসনে ব্যর্থতা ছিল।

হ্যাঁ, বাকশাল ছিল তাঁর রাজনৈতিক জীবনের গুরুতর বিতর্কিত অধ্যায়।

হ্যাঁ, ১৯৭৪-এর দুর্ভিক্ষের সময় রাষ্ট্রের ব্যর্থতা নিয়ে প্রশ্ন থাকবে।

কিন্তু এসবের কোনোটিই ১৯৭১-এর স্বাধীনতার আন্দোলনে তাঁর ঐতিহাসিক নেতৃত্বকে মুছে দিতে পারে না।

আবার ১৯৭১-এর মহত্ত্বও তাঁর পরবর্তী রাজনৈতিক ভুলগুলোকে সঠিক প্রমাণ করে না।

এই ভারসাম্যটাই ইতিহাস।

১৫ আগস্টের কাছে আমাদের ঋণ

আজ বঙ্গবন্ধুর ৫১তম মৃত্যুবার্ষিকী।

এই দিনে আমরা শুধু শোক করব কেন?

আমরা বরং প্রশ্ন করব—যে রাজনৈতিক হিংসা বঙ্গবন্ধুর পরিবারকে নিশ্চিহ্ন করেছিল, সেই হিংসার সংস্কৃতি কি বাংলাদেশ থেকে সত্যিই চলে গেছে?

আজও কি রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে মানুষ হিসেবে দেখার ক্ষমতা আমাদের আছে?

আজও কি আমরা মতের অমিলকে শত্রুতা না বানিয়ে বিতর্কে পরিণত করতে পারি?

আজও কি ক্ষমতায় থাকা মানুষকে প্রশ্ন করার অধিকারকে সম্মান করি?

যদি না পারি, তাহলে বঙ্গবন্ধুর মৃত্যু থেকে আমরা কী শিখলাম?

একজন মানুষকে হত্যা করা যায়।

কিন্তু একটি জাতির ইতিহাসকে হত্যা করা যায় না।

বঙ্গবন্ধুকে মুছে ফেলেও বাংলাদেশের জন্মের ইতিহাস মুছে ফেলা যাবে না। আবার বঙ্গবন্ধুর নাম উচ্চারণ করলেই বাংলাদেশের সব ব্যর্থতা ঢাকা পড়বে না।

তাঁকে তাই আমাদের প্রয়োজন মূর্তি হিসেবে নয়, মানুষ হিসেবে।

যে মানুষটি স্বপ্ন দেখেছিলেন, সংগ্রাম করেছিলেন, মানুষকে ভালোবেসেছিলেন, মানুষের হৃদয়ে জায়গা করে নিয়েছিলেন—আবার যে মানুষটি ভুলও করেছিলেন, ক্ষমতার প্রয়োগে বিতর্কিত সিদ্ধান্তও নিয়েছিলেন।

এই সম্পূর্ণ বঙ্গবন্ধুকেই আমাদের জানতে হবে।

কারণ—

মূর্তির কোনো ভুল হয় না।
শুধু মানুষেরই ভুল হয়।

আর বঙ্গবন্ধু ছিলেন মানুষ।

অসাধারণ এক মানুষ।

স্বাধীনতার ইতিহাসের এক অনিবার্য মানুষ।

মানবিকতার আলো ও রাজনৈতিক ভুলের ছায়া—দুটো মিলিয়েই তাঁর ইতিহাস।

তাঁকে সত্যিকার অর্থে শ্রদ্ধা করতে হলে তাই তাঁর ভালোকে ভালো বলতে হবে, ভুলকে ভুল বলতে হবে।

অন্ধ ভালোবাসা নয়—সত্যের প্রতি ভালোবাসাই হোক বঙ্গবন্ধুকে স্মরণ করার সবচেয়ে মানবিক পদ্ধতি।

লেখক: সম্পাদক, কলামিস্ট, বিশ্লেষক, গল্পকার ও সাবেক অধ্যাপক

লন্ডন,   ১৫ আগস্ট, ২০২৬