ভয়েস অব পিপল ।। জনগণের কণ্ঠস্বর, বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি
সারা দেশে গ্যাসের চাপে থমকে গেছে শিল্পের চাকা, ঝুঁকিতে হাজার কারখানার উৎপাদন
বাংলাদেশ প্রতিনিধি, ১৫ আগস্ট:
গ্যাসের সংকট এখন আর শুধু জ্বালানির সমস্যা নয়—দেশের শিল্পকারখানার উৎপাদন ব্যবস্থাকেই ধীরে ধীরে অচল করে দিচ্ছে। চট্টগ্রাম, নারায়ণগঞ্জ ও হবিগঞ্জে গ্যাসের চাপ ভয়াবহভাবে কমে যাওয়ায় ভারী শিল্প, ইস্পাত, কাচ, টেক্সটাইল, ডাইং, স্পিনিং ও তৈরি পোশাকসহ বিভিন্ন খাতের কারখানায় উৎপাদন বন্ধ বা সীমিত হয়ে পড়েছে।
চট্টগ্রামভিত্তিক বিএসআরএম গ্রুপ রড উৎপাদনের অন্যতম প্রধান কাঁচামাল তৈরি করে। কিন্তু চলমান গ্যাস সংকটে প্রতিষ্ঠানটির কাঁচামাল উৎপাদন পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে। প্রতিদিন যেখানে গড়ে প্রায় ৮ হাজার টন পণ্য উৎপাদন হতো, সেখানে এখন কারখানার উৎপাদন কার্যত থেমে আছে।
শুধু বিএসআরএম নয়, চট্টগ্রামে গ্যাসনির্ভর অন্তত আরও ১০০টি ভারী শিল্পকারখানা একই ধরনের সংকটে পড়েছে। কোনো কোনো প্রতিষ্ঠান লোকসান কমাতে পুরো কারখানা বন্ধ রাখছে, আবার কেউ কেউ সীমিত শিফটে উৎপাদন চালানোর চেষ্টা করছে।
বিএসআরএম গ্রুপের উপব্যবস্থাপনা পরিচালক তপন সেন গুপ্ত বলেন, গ্যাসের চাপ কম থাকলে কারখানা চালু রাখা কঠিন হয়ে পড়ে। এতে যন্ত্রপাতি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কাও থাকে। এ কারণে অনেক প্রতিষ্ঠান বাধ্য হয়ে উৎপাদন বন্ধ রাখছে।
এইচএম স্টিলের পরিচালক সারওয়ার আলম জানান, তাদের গোল্ডেন ইস্পাত কারখানা বন্ধ রয়েছে। এইচএম স্টিলের দুটি ইউনিটের দিনের দুই শিফটও বন্ধ রাখতে হচ্ছে। রাতে গ্যাসের চাপ কিছুটা বাড়লে মাত্র একটি শিফটে উৎপাদন চালানোর চেষ্টা করা হচ্ছে।
টি কে গ্রুপের পরিচালক তারিক আহমেদ বলেন, কর্ণফুলী স্টিলের মাসিক উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় ১৮ হাজার টন। কিন্তু গ্যাস সংকটে কখনো সামান্য উৎপাদন হচ্ছে, আবার কখনো পুরোপুরি বন্ধ থাকছে। পরিস্থিতি কতদিন চলবে, সে বিষয়ে শিল্পোদ্যোক্তাদের কোনো স্পষ্ট ধারণা নেই।
সবচেয়ে বড় ঝুঁকিতে রয়েছে কাচশিল্প। কারণ কাচ তৈরির চুল্লি একবার চালু হলে তা দীর্ঘ সময় ধরে সচল রাখতে হয়। গ্যাসের অভাবে চুল্লি পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেলে সেটি আবার চালু করা সহজ নয়। অনেক ক্ষেত্রে পুরোনো চুল্লি ভেঙে নতুন চুল্লি বসাতে হয়, যার জন্য কয়েকশ কোটি টাকা পর্যন্ত নতুন বিনিয়োগ প্রয়োজন হতে পারে।
পিএইচপি ফ্লোট গ্লাস ইন্ডাস্ট্রিজের এক কর্মকর্তা জানান, পর্যাপ্ত গ্যাস না থাকায় সামান্য বিদ্যুৎ ব্যবহার করে শুধু বার্নার সচল রাখার চেষ্টা করা হচ্ছে। চুল্লি পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেলে পুনরায় উৎপাদনে ফিরতে দীর্ঘ সময় লাগতে পারে।
জিপিএইচ ইস্পাতের অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক আলমাস শিমুল বলেন, দীর্ঘদিন ধরে কম গ্যাসের চাপের মধ্যেও উৎপাদন কমিয়ে কারখানা চালানো হচ্ছিল। এখন পরিস্থিতি আরও খারাপ হওয়ায় উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি পণ্যের উৎপাদন ব্যয়ও বাড়ছে।
চট্টগ্রাম চেম্বারের সভাপতি আমিরুল হক মনে করেন, শিল্পে গ্যাস সরবরাহের এই সংকটের প্রভাব শুধু স্থানীয় অর্থনীতিতে সীমাবদ্ধ থাকবে না; জাতীয় অর্থনীতিতেও এর বড় ধরনের অভিঘাত পড়বে। তাঁর মতে, জ্বালানি ব্যবস্থাপনা নিয়ে মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা জরুরি।
এদিকে, গ্যাস সংকটের বড় ধাক্কা লেগেছে নারায়ণগঞ্জের তৈরি পোশাক ও লিংকেজ শিল্পে। স্থানীয় শিল্পসংশ্লিষ্টদের হিসাবে, গ্যাসের অভাবে প্রায় এক হাজার কারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হয়েছে। অনেক কারখানা পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে, আবার কোথাও সীমিত পরিসরে উৎপাদন চলছে।
ফতুল্লা গার্মেন্টসের পরিচালক মিনহাজুল হক জানান, গত ২৩ জুলাই থেকে তাদের ডাইং ইউনিট বন্ধ। কিছুদিন মজুত কাপড় দিয়ে উৎপাদন চালানো গেলেও সেই মজুত শেষ হয়ে যাওয়ায় এখন গার্মেন্টসের উৎপাদনও বন্ধ হয়ে গেছে।
বিকেএমইএর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, নারায়ণগঞ্জে তাদের প্রায় ৫০০ গার্মেন্টস রয়েছে। এর সঙ্গে রয়েছে সাব-কন্ট্রাক্ট গার্মেন্টস, ডাইং ও অন্যান্য লিংকেজ শিল্প। গ্যাসনির্ভর এসব প্রতিষ্ঠানের বড় অংশই উৎপাদন বন্ধ রেখেছে। পরিস্থিতির উন্নতি না হলে পোশাকশিল্পে বড় ধরনের ধস নামতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন তিনি।
বাংলাদেশ নিট ডাইং ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি আমজাদ হোসেন জানান, গ্যাসের অভাবে তাদের প্রায় ১৫০টি কারখানার অধিকাংশই বন্ধ হয়ে গেছে।
নারায়ণগঞ্জের লবণ মিলগুলোও রেহাই পায়নি। গ্যাসের অভাবে জেলার ছোট-বড় সাতটি লবণ কারখানায় উৎপাদন বন্ধ রয়েছে।
এদিকে দেশের রি-রোলিং মিলগুলোর বড় একটি অংশও নারায়ণগঞ্জে। বাংলাদেশ রি-রোলিং অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ মাহবুবুর রশিদ জুয়েল জানান, অধিকাংশ মিলই কয়েক দিন ধরে উৎপাদন বন্ধ রেখেছে।
গ্যাসের ঘাটতির সঙ্গে বাড়ছে বিদ্যুৎ সংকটও। ফলে বিদ্যুৎনির্ভর নিটিং শিল্পেও উৎপাদন কমে গেছে। কেউ কেউ জেনারেটর চালিয়ে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করলেও বাড়তি জ্বালানি ব্যয়ের কারণে সেই ব্যবস্থা দীর্ঘস্থায়ী করা কঠিন।
নারায়ণগঞ্জের কাঁচপুর ও মেঘনাঘাট শিল্পাঞ্চলেও প্রায় ৩৫টি কারখানায় গ্যাসের সংকটে উৎপাদন বন্ধ রয়েছে। আমান ইকোনমিক জোনের একটি সিমেন্ট কারখানায় গ্যাসের অভাবে প্রতিদিন ৮ থেকে ১০ ঘণ্টা উৎপাদন বন্ধ রাখতে হচ্ছে। এতে উৎপাদন ৪০ থেকে ৪৫ শতাংশ পর্যন্ত কমে যাচ্ছে।
ভুলতার একটি স্পিনিং মিলের কর্মকর্তারা জানান, অনুমোদিত ১০ পিএসআই গ্যাসচাপের বিপরীতে পিক আওয়ারে চাপ নেমে আসছে মাত্র ১ থেকে ১ দশমিক ৫ পিএসআইয়ে। কখনো কখনো গ্যাস পুরোপুরিই চলে যাচ্ছে। এতে প্রতি পাউন্ড সুতায় উল্লেখযোগ্য লোকসান হচ্ছে।
চট্টগ্রাম ও নারায়ণগঞ্জের পর গ্যাস সংকটের তীব্র প্রভাব পড়েছে হবিগঞ্জের মাধবপুর ও শাহজীবাজার শিল্পাঞ্চলে। সেখানে গ্যাসের চাপ প্রায় শূন্যের কাছাকাছি নেমে যাওয়ায় সায়হাম গ্রুপের ডেনিম, কটন, টেক্সটাইল ও স্পিনিং মিলসহ একাধিক বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠান উৎপাদন বন্ধ রাখতে বাধ্য হয়েছে।
ঢাকা-সিলেট মহাসড়কসংলগ্ন এলাকায় প্রায় ৩৯টি শিল্পকারখানা এবং ৪২টি ক্যাপটিভ পাওয়ার প্ল্যান্টও গ্যাস সংকটে পড়েছে। এ অঞ্চলে দেশের বেশ কয়েকটি বড় শিল্পগোষ্ঠীর কারখানা রয়েছে।
স্কয়ার ডেনিমসের মহাব্যবস্থাপক আব্দুল মাজেদ জানান, বুধবার বিকেল থেকে গ্যাস সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে। প্রায় তিন হাজার শ্রমিকের কারখানা এখন শাটডাউন অবস্থায়।
প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের হবিগঞ্জ শিল্পপার্কের এক কর্মকর্তা জানান, গ্যাসের অভাবে নিজস্ব বিদ্যুৎকেন্দ্রও চালানো যাচ্ছে না। উৎপাদন দীর্ঘদিন বন্ধ থাকলে বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে।
ফারইস্ট স্পিনিং মিল সীমিত বিদ্যুৎ ও সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহার করে কার্যক্রম চালানোর চেষ্টা করছে। তবে সংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, গ্যাস সংকট দীর্ঘস্থায়ী হলে পুরো শিল্পাঞ্চলেই বড় ধরনের ক্ষতি হবে।
জালালাবাদ গ্যাস টিঅ্যান্ডডি সিস্টেম লিমিটেডের উপমহাব্যবস্থাপক মো. রুহুল করিম চৌধুরী জানিয়েছেন, আগামী তিন থেকে চার দিনের মধ্যে পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হতে পারে।
তবে শিল্পোদ্যোক্তাদের প্রশ্ন—কয়েক দিনের সাময়িক সংকট হিসেবে শুরু হওয়া এই গ্যাস সমস্যা যদি দীর্ঘস্থায়ী হয়, তাহলে উৎপাদন, কর্মসংস্থান, রপ্তানি এবং জাতীয় অর্থনীতির ক্ষতি কতটা গভীর হবে?
গ্যাসের অভাবে একের পর এক কারখানার চাকা থেমে যাওয়া এখন শুধু শিল্পের সমস্যা নয়; এটি দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্যও বড় সতর্কবার্তা হয়ে উঠছে।