ঢাকা কি সামলাতে পারবে ভয়াবহ সেই ধাক্কা?

ইন্দোনেশিয়ার মতো ৭.৭ মাত্রার ভূমিকম্প বাংলাদেশে হলে কী হবে?

ইন্দোনেশিয়ার মতো ৭.৭ মাত্রার ভূমিকম্প বাংলাদেশে হলে কী হবে?

ভয়েস অব পিপল রিপোর্ট, ১৫ আগস্ট:

ইন্দোনেশিয়ার ফ্লোরেস দ্বীপের উপকূলে ৭ দশমিক ৭ মাত্রার শক্তিশালী ভূমিকম্পের পর নতুন করে সামনে এসেছে বাংলাদেশের ভূমিকম্পঝুঁকির প্রশ্ন। কারণ ভূমিকম্পপ্রবণ অঞ্চলে অবস্থান করলেও বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা শুধু ভূমিকম্প নয়—ঘনবসতি, অপরিকল্পিত নগরায়ণ, দুর্বল ভবন, সরু সড়ক এবং জরুরি উদ্ধারব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা।

তবে একটি বিষয় শুরুতেই পরিষ্কার করা জরুরি: ইন্দোনেশিয়ায় ৭.৭ মাত্রার ভূমিকম্প হয়েছে বলেই বাংলাদেশে একই মাত্রার ভূমিকম্প হলে ঠিক কত মানুষ মারা যাবে বা কত ভবন ধসে পড়বে—এমন নির্দিষ্ট পূর্বাভাস দেওয়া বৈজ্ঞানিকভাবে সম্ভব নয়। ক্ষয়ক্ষতি নির্ভর করবে ভূমিকম্পের কেন্দ্র কোথায়, কত গভীরে, কতক্ষণ কম্পন স্থায়ী হচ্ছে, মাটির ধরন এবং ভবনগুলোর নির্মাণমানের ওপর।

তবু বাংলাদেশের জন্য বিভিন্ন গবেষণা ও ঝুঁকি-সমীক্ষার তথ্য যথেষ্ট উদ্বেগজনক।

৭.৭ মাত্রার কম্পন কেন ভয়াবহ হতে পারে?

ভূমিকম্পের মাত্রা এক ধাপ বাড়লে শক্তি কয়েক গুণ বেড়ে যায়। ফলে ৭.৭ মাত্রার একটি ভূমিকম্পকে সাধারণ মাঝারি মাত্রার ভূমিকম্পের সঙ্গে তুলনা করা যায় না।

বাংলাদেশের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় আশঙ্কা ঢাকা ও চট্টগ্রামের মতো ঘনবসতিপূর্ণ নগর এলাকায়। বিশ্বব্যাংক বহু বছর ধরেই ঢাকার ভূমিকম্পঝুঁকি নিয়ে সতর্ক করে আসছে। দ্রুত ও অপরিকল্পিত নগরায়ণ শহরের ভূমিকম্পজনিত ঝুঁকি আরও বাড়িয়েছে।

বাংলাদেশ একই সঙ্গে একাধিক সক্রিয় ভূতাত্ত্বিক কাঠামোর কাছাকাছি অবস্থান করছে। দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে ডাউকি ফল্ট এবং ঢাকার কাছাকাছি মধুপুর ফল্ট বিশেষভাবে আলোচিত। এ ছাড়া পূর্বাঞ্চলে ভারতীয় ও বার্মিজ প্লেটের সীমানার ভূ-গঠনও ভূমিকম্পের ঝুঁকি তৈরি করে।

ঢাকার জন্য সবচেয়ে ভয়ংকর তথ্য

রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ—রাজউকের ২০১৮-২০২২ সালের একটি সমীক্ষা নিয়ে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, টাঙ্গাইলের কাছে মধুপুর ফল্টে ৬.৯ মাত্রার ভূমিকম্প হলে ঢাকার প্রায় ৮ লাখ ৬৫ হাজার ভবন ধসে পড়তে পারে। দিনের বেলায় এমন ভূমিকম্প হলে সম্ভাব্য মৃত্যুর সংখ্যা প্রায় ২ লাখ ১০ হাজার এবং আহতের সংখ্যা ২ লাখ ২৯ হাজার পর্যন্ত হতে পারে বলে ওই মডেলিংয়ে উল্লেখ করা হয়েছে।

এটি কোনো নিশ্চিত ভবিষ্যদ্বাণী নয়; নির্দিষ্ট একটি ভূমিকম্প-পরিস্থিতি ধরে করা ঝুঁকি-সমীক্ষা। কিন্তু ৬.৯ মাত্রার একটি সম্ভাব্য ভূমিকম্প নিয়েই যখন এমন চিত্র উঠে আসে, তখন ৭.৭ মাত্রার ভূমিকম্পের সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে উদ্বেগের কারণ যে যথেষ্ট, তা বলার অপেক্ষা রাখে না।

আরও পুরোনো ‘Dhaka Profile and Earthquake Risk Atlas’ গবেষণায় ৭.৫ মাত্রার ভূমিকম্প ঢাকায় আঘাত করলে প্রায় ৫০ হাজার মানুষের মৃত্যু, ২ লাখ মানুষের আহত হওয়া এবং ৫.৭ বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত অর্থনৈতিক ক্ষতির আশঙ্কা তুলে ধরা হয়েছিল।

শুধু ভবন ধস নয়, বিপদ আসবে চারদিক থেকে

বড় ভূমিকম্প হলে বিপর্যয় শুধু ভবন ধসে সীমাবদ্ধ থাকবে না।

বিদ্যুৎ, গ্যাস, পানি ও টেলিযোগাযোগ ব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। কোথাও গ্যাসলাইন ছিঁড়ে আগুন লাগতে পারে, কোথাও বিদ্যুতের তার ছিঁড়ে অগ্নিকাণ্ড হতে পারে। রাস্তা ধ্বংস বা ধসে পড়া ভবনের ধ্বংসাবশেষে বন্ধ হয়ে যেতে পারে অ্যাম্বুলেন্স ও ফায়ার সার্ভিসের পথ।

ঢাকার সরু ও ঘনবসতিপূর্ণ এলাকাগুলোতে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হতে পারে। পুরান ঢাকার মতো এলাকায় পাশাপাশি দাঁড়িয়ে থাকা পুরোনো ভবনগুলোর একটি ধসে পড়লে আশপাশের ভবনও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।

গবেষণায় ঢাকার ভবনগুলোর ঝুঁকির ক্ষেত্রে দুর্বল নির্মাণ, অপর্যাপ্ত ভূমিকম্প-সহনশীল নকশা, ‘সফট স্টোরি’, দুর্বল কলাম, অপর্যাপ্ত ফাঁক এবং মাটির তরলীকরণ বা liquefaction-এর মতো বিষয়গুলোকে বড় ঝুঁকি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

মাটি যদি ‘তরল’ হয়ে যায়

বাংলাদেশের আরেকটি বড় সমস্যা হলো মাটির ধরন।

ঢাকার অনেক অংশ নদীবিধৌত নরম ও জলসিক্ত মাটির ওপর গড়ে উঠেছে। শক্তিশালী ভূমিকম্পে এ ধরনের মাটিতে liquefaction হতে পারে। তখন মাটির বহনক্ষমতা সাময়িকভাবে কমে গিয়ে শক্ত মাটি অনেকটা তরলের মতো আচরণ করতে পারে। ফলে ভবন কাত হয়ে যাওয়া, ভিত্তি বসে যাওয়া কিংবা মাটিতে ফাটল তৈরি হওয়ার ঝুঁকি বাড়ে। ঢাকার নদীবিধৌত এলাকায় সহজে তরলীকরণযোগ্য মাটির উপস্থিতি নিয়ে গবেষণাও হয়েছে।

অর্থাৎ একটি ভবন বাইরে থেকে মোটামুটি শক্তিশালী মনে হলেও নিচের মাটি দুর্বল হয়ে গেলে সেটিও বিপদে পড়তে পারে।

বাংলাদেশের ঝুঁকি শুধু ঢাকায় নয়

ভূমিকম্প হলে শুধু রাজধানী নয়, চট্টগ্রাম, সিলেট, ময়মনসিংহ, কুমিল্লা, টাঙ্গাইলসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চল ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। বিশেষ করে উত্তর-পূর্ব ও পূর্বাঞ্চল ভূতাত্ত্বিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ সক্রিয় কাঠামোর কাছাকাছি।

২০২৫ সালের একটি বাংলাদেশ-ভিত্তিক Global Earthquake Model (GEM) মূল্যায়নে দেশের প্রায় ২ কোটি ৯০ লাখ ভবন বিশ্লেষণ করে ভূমিকম্পঝুঁকিতে থাকা সম্পদের মূল্য সর্বোচ্চ প্রায় ৩৪৪ বিলিয়ন ডলার হতে পারে বলে হিসাব করা হয়েছে। গবেষণায় ঢাকা ও চট্টগ্রামের মতো বড় নগরাঞ্চলে ঝুঁকির ঘনত্ব এবং দেশের উত্তর ও পূর্বাঞ্চলে উচ্চ ভূমিকম্পঝুঁকির কথা উঠে এসেছে।

তাহলে ৭.৭ মাত্রার ভূমিকম্প হলে কী হবে?

যদি কোনো সক্রিয় ফল্টের কাছে বাংলাদেশে ৭.৭ মাত্রার একটি শক্তিশালী ভূমিকম্প ঘটে এবং তার কেন্দ্র ঢাকা বা অন্য কোনো ঘনবসতিপূর্ণ এলাকার তুলনামূলক কাছে হয়, তাহলে পরিস্থিতি জাতীয় পর্যায়ের দুর্যোগে পরিণত হতে পারে

হাজার হাজার ভবন ক্ষতিগ্রস্ত বা ধসে পড়তে পারে, ব্যাপক প্রাণহানি ও আহতের ঘটনা ঘটতে পারে, যোগাযোগব্যবস্থা ভেঙে পড়তে পারে এবং উদ্ধারকাজে ভয়াবহ চাপ তৈরি হতে পারে। হাসপাতালগুলোতে একসঙ্গে বিপুলসংখ্যক আহত মানুষ আসতে পারে। বিদ্যুৎ, পানি, গ্যাস ও মোবাইল নেটওয়ার্কে বিঘ্ন ঘটলে দুর্যোগের মাত্রা আরও বাড়বে।

তবে ৭.৭ মাত্রা মানেই পুরো ঢাকা ধ্বংস হয়ে যাবে—এমন কথা বলা ঠিক নয়। আধুনিক ভূমিকম্প-সহনশীল ভবন তুলনামূলক ভালোভাবে টিকে যেতে পারে। ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা নির্ভর করবে ভূমিকম্পের অবস্থান, গভীরতা, কম্পনের তীব্রতা, মাটির বৈশিষ্ট্য এবং ভবনের প্রকৌশলগত সক্ষমতার ওপর।

সবচেয়ে বড় প্রশ্ন প্রস্তুতি নিয়ে

বাংলাদেশে ভূমিকম্পের ঝুঁকি নতুন নয়। বরং গবেষণা ও বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি সমীক্ষায় বহু বছর ধরে সতর্ক করা হচ্ছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো—ভূমিকম্পের আগে আমরা কতটা প্রস্তুত?

রাজউকের সমীক্ষায় ঢাকার বিপুলসংখ্যক ভবনের ঝুঁকির যে চিত্র উঠে এসেছে, তা সতর্কবার্তার চেয়ে অনেক বেশি কিছু। ২০২৪ সালের একটি বিশ্লেষণে ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় জরিপ করা স্থাপনার বড় অংশ নির্মাণ ও নকশাগত শর্ত পূরণ করছে না বলেও উল্লেখ করা হয়েছে।

ভূমিকম্প ঠেকানোর কোনো প্রযুক্তি মানুষের হাতে নেই। কিন্তু ভূমিকম্পে ভবন ধসে পড়া, আগুন লাগা কিংবা উদ্ধারব্যবস্থা ভেঙে পড়ার ঝুঁকি অনেকটাই কমানো সম্ভব—ভবন নির্মাণবিধি কঠোরভাবে প্রয়োগ, ঝুঁকিপূর্ণ ভবন শনাক্ত ও সংস্কার, হাসপাতাল ও জরুরি স্থাপনা শক্তিশালী করা, প্রশস্ত উদ্ধারপথ নিশ্চিত করা এবং সাধারণ মানুষকে প্রশিক্ষণ দেওয়ার মাধ্যমে।

ইন্দোনেশিয়ার ৭.৭ মাত্রার ভূমিকম্প তাই শুধু একটি দূরদেশের দুর্যোগ নয়। বাংলাদেশের জন্য এটি যেন আবারও একটি আয়না—যে আয়নায় দেখা যাচ্ছে, বড় ভূমিকম্পের জন্য প্রস্তুত না থাকলে প্রকৃত বিপর্যয়টি ভূমিকম্পের চেয়েও বড় হতে পারে।