‘‘গল্পকাররা বিশ্ব শাসন করে’’
নির্ঝর এর ঝরঝরে অনুগল্প ।। ৩১ ।। চারিদিকে অন্ধকার
উৎসর্গ
বাংলাদেশের সেইসব মানুষকে,
যারা চারিদিকে অন্ধকার দেখেও
প্রতিদিন ভোরের অপেক্ষায় থাকে।
।। চারিদিকে অন্ধকার ।।

সকাল ছয়টা বাজতেই রফিকের ঘুম ভাঙে। ঘুম ভাঙার সঙ্গে সঙ্গে সে রান্নাঘরে যায়। চুলার নব ঘুরায়। কোনো শব্দ নেই।
সে আবার নব ঘোরায়।
গ্যাস নেই।
রফিকের স্ত্রী শিউলি পাশ থেকে বলে,
—আজও নেই?
রফিক কোনো উত্তর দেয় না। ইলেকট্রিক চুলাটা বের করে। সুইচে হাত দিতেই বিদ্যুৎ চলে যায়।
শিউলি কিছুক্ষণ চুপ করে থাকে। তারপর হেসে বলে,
—চিন্তা করো না। আজ লাকড়ি দিয়ে রান্না করব।
রফিক তাকিয়ে থাকে স্ত্রীর দিকে। তার হাসিটা দেখে মনে হয়, সংসারে আর কোনো সমস্যা নেই।
কিন্তু সে জানে, সমস্যা আছে।
অনেক সমস্যা আছে।
রফিক একটি ছোট দোকান চালায়। দোকানের সামনে প্রতিদিন কয়েকজন ছেলে এসে দাঁড়ায়। মাসের প্রথম সপ্তাহেই তারা এসে বলে যায়,
—ভাই, এলাকার খরচটা দিয়েন।
রফিক জানে, এই ‘খরচ’ না দিলে দোকানের শাটার রাতে নিরাপদ থাকবে কি না, তার নিশ্চয়তা নেই।
সে টাকা দেয়।
তারপর হিসাবের খাতায় লিখে—‘চাঁদা’।
এই শব্দটি লিখতে লিখতে তার হাত কাঁপে।
একদিন তার দোকানে পাশের এলাকার এক যুবক আসে। টাকা দিতে দেরি হওয়ায় তাকে ধমক দিয়ে যায়।
রফিক প্রতিবাদ করতে চায়।
কিন্তু তার পাশের দোকানের মালিক কানে কানে বলে,
—ভাই, বেশি কথা কইরেন না। পরিবার আছে।
রফিক চুপ করে যায়।
এই দেশে পরিবার থাকা কখনও কখনও প্রতিবাদ করার চেয়েও বড় দায়িত্ব হয়ে দাঁড়ায়।

রফিকের ছেলে নাঈম বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে। বয়স বাইশ।
নাঈম মেধাবী। কিন্তু তার চোখের নিচে কালো দাগ পড়ে গেছে।
চাকরি নিয়ে তার চিন্তা হয়।
বন্ধু সজীব কয়েক মাস ধরে মাদকের সঙ্গে জড়িয়ে যাচ্ছে। প্রথমে আড্ডা, তারপর নেশা, তারপর টাকা।
নাঈম কয়েকবার তাকে বোঝায়।
সজীব হাসে।
—জীবনে আনন্দ নাই রে। একটু নেশা করলে অন্তত সব ভুলে থাকা যায়।
নাঈম উত্তর দেয় না।
কারণ সজীবের কথার মধ্যে সে শুধু মাদকের গল্প শুনতে পায় না; শুনতে পায় হতাশার গল্প।
যে তরুণের সামনে নিশ্চিত ভবিষ্যৎ নেই, তার সামনে মাদক খুব সহজেই মিথ্যা আশ্রয় হয়ে দাঁড়ায়।

সেদিন বিকেলে নাঈম বাসে করে বাড়ি ফিরছে।
বাস ধীরে ধীরে এগোয়।
তারপর থেমে যায়।
সামনে বিশাল যানজট।
বৃষ্টি হচ্ছে।
রাস্তার পানি জমে আছে।
পাশেই উন্নয়নকাজের জন্য রাস্তা খোঁড়া।
বাসের ভেতরে মানুষ ঘামছে।
একজন বৃদ্ধ বিরক্ত হয়ে বলেন,
—এই শহরে মানুষ চলে না, মানুষ আটকে থাকে।
নাঈম জানালা দিয়ে তাকিয়ে থাকে।
তার মনে হয়, শুধু শহর নয়—সবকিছুই যেন আটকে আছে।
চাকরি আটকে আছে।
জীবন আটকে আছে।
সুশাসন আটকে আছে।
হঠাৎ সামনে চিৎকার শুরু হয়।
কয়েকজন মানুষ একজন যুবককে ধরে ফেলেছে।
কেউ বলছে,
—চোর!
কেউ বলছে,
—মার!
কেউ মোবাইল বের করে ভিডিও করছে।
যুবকটি কাঁদছে।
—আমি চোর না। আমাকে ভুল করছেন।
কেউ শুনছে না।
ভিড় বাড়ছে।
একজন বৃদ্ধ সামনে গিয়ে বলেন,
—পুলিশে দেন। নিজেরা বিচার করবেন না।
কেউ তার কথা শুনছে না।
নাঈম বাস থেকে নেমে যায়।
সে এগিয়ে গিয়ে বলে,
—ভাই, আগে পুলিশ ডাকেন।
একজন তাকে ধাক্কা দিয়ে বলে,
—আপনি বেশি বুঝেন?
নাঈম পিছিয়ে আসে।
তার চোখের সামনে মব দাঁড়িয়ে থাকে।
তার মনে হয়, আইন ভেঙে পড়লে মানুষ শুধু অপরাধীকে ভয় পায় না; মানুষ মানুষকেও ভয় পেতে শুরু করে।
রাতে রফিক বাড়ি ফেরে।
দরজার কাছে এসে দেখে কয়েকজন প্রতিবেশী দাঁড়িয়ে।
তার বুক কেঁপে ওঠে।
—কী হয়েছে?
একজন বলে,
—আপনার ছোট ভাইকে হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে।
রফিক দৌড়ে যায়।
রাস্তায় ছিনতাইয়ের সময় তার ভাই বাধা দিয়েছিল।
ছুরিকাঘাত হয়েছে।
হাসপাতালে গিয়ে রফিক দেখে, করিডোরে মানুষ।
কেউ আহত।
কেউ কাঁদছে।
কেউ চিকিৎসকের জন্য অপেক্ষা করছে।
শিউলি কিছুক্ষণ পর এসে বলে,
—ওষুধের টাকা লাগবে।
রফিক পকেট হাতড়ে দেখে।
টাকা কম।
সে বন্ধুকে ফোন করে।
—ভাই, একটু টাকা ধার দিতে পারবা?
ওপাশ থেকে উত্তর আসে,
—কত?
রফিক পরিমাণ বলে।
ওপাশে কিছুক্ষণ নীরবতা।
তারপর—
—কাল দিমু।
রফিক ফোন রেখে দেয়।
কাল পর্যন্ত কি মানুষ অপেক্ষা করতে পারে?
পরদিন সকালে শিউলি মেয়েকে স্কুলে পাঠাতে গিয়ে জানতে পারে, মেয়ের এক সহপাঠীকে কয়েকজন ছেলে রাস্তায় উত্ত্যক্ত করেছে।
মেয়েটি ভয়ে স্কুলে যেতে চায় না।
শিউলি মেয়েকে বুকে জড়িয়ে ধরে।
—তুই ভয় পাবি না।
কিন্তু কথাটি বলার সময় শিউলির নিজের গলাতেও ভয় লেগে থাকে।
নারীর নিরাপত্তা নিয়ে কথা বলতে বলতে সমাজ কখন যেন এমন জায়গায় এসে দাঁড়িয়েছে, যেখানে মেয়েকে সাহস দেওয়ার আগে মা নিজেকেই সাহস দেন।
এর মধ্যেই বাজারে দাম বাড়ে।
রফিকের দোকানে ক্রেতা এসে বলে,
—ভাই, আগের দামে দিতে পারবেন?
রফিক হাসে।
—আমি পারলে দিতাম।
ক্রেতা বলে,
—আমার বেতন তো বাড়ে নাই।
রফিক বলে,
—আমারও না।
দুজনেই কিছুক্ষণ চুপ থাকে।
তারপর ক্রেতা অর্ধেক পরিমাণ পণ্য নিয়ে চলে যায়।
এইভাবেই দেশের অর্থনীতি প্রতিদিন মানুষের রান্নাঘরে নতুন হিসাব লেখে।
দুপুরে আবার বিদ্যুৎ চলে যায়।
রফিকের দোকানের ফ্রিজ বন্ধ হয়ে যায়।
পাশের দোকানের মালিক গালি দিতে দিতে বলে,
—দেশটা কোথায় যাচ্ছে?
রফিক কোনো উত্তর দেয় না।
সে জানে, এই প্রশ্নের উত্তর তার কাছে নেই।

সন্ধ্যায় আকাশ কালো হয়ে আসে।
প্রচণ্ড বৃষ্টি নামে।
এক ঘণ্টার মধ্যে এলাকার রাস্তা পানিতে ডুবে যায়।
শিউলি দরজার সামনে দাঁড়িয়ে বলে,
—পানি তো ঘরের ভেতর ঢুকছে!
রফিক বালতি দিয়ে পানি তুলতে থাকে।
নাঈম ঘরের জিনিসপত্র উঁচু জায়গায় সরায়।
হঠাৎ বিদ্যুৎ চলে যায়।
অন্ধকার ঘরে শুধু মোবাইলের আলো।
শিউলি নিচু স্বরে বলে,
—একদিন যদি ভূমিকম্প হয়?
রফিক থেমে যায়।
এই শহরের এত ভবন। এত মানুষ। এত সরু রাস্তা।
ভূমিকম্পের কথা ভাবলেই তার বুকের ভেতর অজানা ভয় ঢুকে পড়ে।
সে বলে,
—ওসব ভাবিস না।
কিন্তু নিজের কথাতেই সে নিজে বিশ্বাস করতে পারে না।

দুপুর।
নাঈম বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকে।
সজীব ফোন করে।
—দোস্ত, বাইরে আয়।
—কোথায়? এখন তো প্রচন্ড বৃষ্টি হচ্ছে। পুরো ঢাকা শহর বন্যায় ভাসছে।
—আয় না। ঢাকা তো বন্যায় ঢাকা পড়বেই রে.. সব টেনশন ভুলে যাবি। চলে আয়..
নাঈম বুঝতে পারে, সজীব আবার নেশার দিকে যাচ্ছে।
সে ফোন কেটে দেয়।
তারপর অনেকক্ষণ অন্ধকার আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকে।
তার মনে হয়, দেশের তরুণদের শুধু মাদকের বিরুদ্ধে লড়াই করলেই হবে না; তাদের হতাশার বিরুদ্ধেও লড়তে হবে।
পরদিন সকালে রফিক দোকানে গিয়ে দেখে শাটারে তালা ভাঙার চেষ্টা হয়েছে।
সে বুঝতে পারে, আগের দিনের চাঁদার টাকা দিতে দেরি হয়েছিল।
পাশের দোকানদার এসে বলে,
—ভাই, পুলিশে যাবেন?
রফিক কিছুক্ষণ চুপ থাকে।
তারপর বলে,
—যাব।
এই প্রথম সে ‘যাব’ শব্দটি দৃঢ়ভাবে উচ্চারণ করে।
পাশের দোকানদার অবাক হয়ে তাকায়।
—ভয় করেন না?
রফিক বলে,
—ভয় করি। কিন্তু সারাজীবন ভয় করে থাকলে বাঁচব কিভাবে?
সেদিন রফিক একা যায় না।
নাঈম যায়।
পাশের দোকানের মালিক যায়।
আরও কয়েকজন ছোট ব্যবসায়ী যায়।
তারা অভিযোগ করে।
হয়তো সঙ্গে সঙ্গে সব বদলে যায় না।
হয়তো চাঁদাবাজিও একদিনে বন্ধ হয় না।
কিন্তু একটা পরিবর্তন হয়।
মানুষ বুঝতে শুরু করে—ভয় একা মানুষকে দুর্বল করে, কিন্তু অন্যায়ের বিরুদ্ধে কয়েকজন মানুষ একসঙ্গে দাঁড়ালে ভয়টা একটু ছোট হয়।
কয়েকদিন পর সজীব নাঈমের কাছে আসে।
চোখ লাল।
কণ্ঠ কাঁপছে।
—আমাকে বাঁচাবি?
নাঈম তার কাঁধে হাত রাখে।
—চল।
—কোথায়?
—ডাক্তার দেখাব। তারপর একটা কাজ খুঁজব।
সজীব হাসে না।
কাঁদে।
নাঈম তাকে নিয়ে হাঁটতে থাকে।
এক সকালে শিউলি আবার চুলার নব ঘোরায়।
এবার গ্যাস আসে।
সে অবাক হয়ে হাসে।
রফিক বলে,
—আজ তাহলে লাকড়ি লাগবে না।
শিউলি বলে,
—সমস্যা কি শেষ?
রফিক হাসে।
—না। কিন্তু আজকেরটা একটু কম।
দুজনেই হাসে।
এই হাসির মধ্যে কোনো আনন্দের উৎসব নেই।
আছে বেঁচে থাকার জেদ।
বাংলাদেশের মানুষ এভাবেই বেঁচে থাকে।
গ্যাস নেই—তবু রান্না হয়।
বিদ্যুৎ নেই—তবু সন্তান পড়ে।
যানজট—তবু মানুষ কাজে যায়।
চাঁদাবাজি—তবু দোকান খোলে।
ছিনতাই—তবু মানুষ রাস্তায় নামে।
মব—তবু কেউ কেউ আইনের কথা বলে।
ধর্ষণ—তবু মায়েরা মেয়েদের সাহস দেন।
মাদক—তবু কেউ বন্ধুর হাত ধরে টেনে আনে।
বন্যা—তবু কৃষক আবার জমিতে নামে।
ভূমিকম্পের আশঙ্কা—তবু মানুষ ঘর বানায়।
ভূরাজনীতির ঝড়—তবু প্রবাসী টাকা পাঠায়, শ্রমিক কারখানায় যায়, কৃষক মাঠে নামে।
কারণ এই দেশের মানুষ শুধু বেঁচে থাকার মানুষ নয়।
তারা বারবার ভেঙে পড়ে, আবার দাঁড়ায়।
কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়—
মানুষ কি সারাজীবন শুধু টিকে থাকার জন্যই বাঁচবে?
একটি রাষ্ট্রের দায়িত্ব মানুষকে শুধু বেঁচে থাকার সুযোগ দেওয়া নয়।
তাকে নিরাপদে বাঁচতে দেওয়া।
মর্যাদার সঙ্গে বাঁচতে দেওয়া।
ন্যায্য অধিকার নিয়ে বাঁচতে দেওয়া।
ভয় ছাড়া বাঁচতে দেওয়া।
রফিক সেদিন রাতে ছেলের দিকে তাকিয়ে বলে,
—তোদের জন্য একটা ভালো দেশ রেখে যেতে চাই।
নাঈম চুপ করে থাকে।
তারপর বলে,
—বাবা, দেশটা শুধু আমাদের রেখে যাওয়ার জিনিস না। আমাদেরও তো একটু ঠিক করতে হবে।
রফিক ছেলের দিকে তাকিয়ে থাকে।
বাইরে তখন আবার বৃষ্টি শুরু হয়।
বিদ্যুৎ চলে যায়।
ঘর অন্ধকার হয়ে যায়।
শিউলি মোমবাতি জ্বালায়।
ছোট্ট ঘরটি আলোয় ভরে ওঠে।
আলোটা খুব সামান্য।
কিন্তু অন্ধকারের মধ্যে সেটুকুই যথেষ্ট মনে হয়।
মানুষগুলো টিকে থাকে।
তবে শুধু টিকে থাকাই যেন তাদের নিয়তি না হয়—এই লড়াইটাই এখন সবচেয়ে জরুরি।
লন্ডন, ১৫ আগস্ট, ২০২৬