ভয়েস অব পিপল ।। জনগণের কণ্ঠস্বর, বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি
কলিকালের কলধ্বনি ।। ১৩৬ ।। মুস্তাফা মনোয়ার: যে মানুষটি আমাদের শৈশবকে রঙিন করেছিলেন
উৎসর্গ
আমাদের শৈশবের রঙতুলির জাদুকর, শিল্পী মুস্তাফা মনোয়ারের অম্লান স্মৃতির প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধাঞ্জলি।

শিল্পী মুস্তাফা মনোয়ার
সাদাকালো পর্দার রঙিন মানুষ
কিছু মানুষের মৃত্যু শুধু একটি মানুষের বিদায় নয়, একটি সময়ের বিদায়। আজ ২৯ জুন সকালে ঘুম থেকে চোখ মেলেই শিল্পী মুস্তাফা মনোয়ারের মৃত্যুসংবাদ শুনে মনে হলো, যেন আমার শৈশবের একটি দরজা নিঃশব্দে বন্ধ হয়ে গেল। কারণ তিনি ছিলেন আমাদের সময়ের সাদা-কালো টিভি পর্দার রঙিন মানুষ। এখনও ভেসে ওঠে বাংলাদেশে ফেলে আসা শৈশবের সেই সাদাকালো টেলিভিশনের দিনগুলো। কিন্তু এই মৃত্যুসংবাদ আমার কাছে শুধু একজন শিল্পীর মৃত্যুর খবর হয়ে আসেনি। এটি যেন একেবারে ব্যক্তিগত এক শোক হয়ে এসেছে। কারণ ভাগ্যের এক অদ্ভুত পরিক্রমায়, আমি মুস্তাফা মনোয়ারের পরিবারের খুব কাছের একজন মানুষের সান্নিধ্যে পেয়েছি। সে কথায় আসছি পরে।
বাংলাদেশ টেলিভিশন ও এক সময়ের কল্পনার জগৎ

আজকের শিশুরা হয়তো কল্পনাও করতে পারবে না, একটি মাত্র বাংলাদেশ টেলিভিশনকে ঘিরে কী অসাধারণ আনন্দময় এক পৃথিবী ছিল। তখন চ্যানেল বদলানোর সুযোগ ছিল না, কিন্তু কল্পনার কোনো সীমাও ছিল না। সেই কল্পনার জগৎকে যাঁরা তৈরি করেছিলেন, তাঁদের অন্যতম মুস্তাফা মনোয়ার।
মুস্তাফা মনোয়ার প্রযোজিত "এসো গান শিখি", "নতুন কুঁড়ি", ছবি আঁকার অনুষ্ঠান—এসব ছিল শুধু টেলিভিশন অনুষ্ঠান নয়; এগুলো ছিল আমাদের বেড়ে ওঠার পাঠশালা। সেখানে প্রতিযোগিতার চেয়ে বড় ছিল সৃজনশীলতা, জয়ের চেয়ে বড় ছিল শেখা।
নতুন কুঁড়ির হারিয়ে যাওয়া বিকেল
ছবি আঁকার অনুষ্ঠানটি আমাদের ছোট্ট তিন ভাইয়ের জীবনে বিশেষ প্রভাব ফেলেছিল। বড় ভাই তখন বেশ বড়। অনুষ্ঠান দেখে বাসায় ফিরে আমি আমার দুই ছোট ভাইকে নিয়ে ছবি আঁকার প্রতিযোগিতা আয়োজন করতাম। ওদের বড় ভাই হওয়ার সুবাদে বিচারকের দায়িত্বও আমারই। আমি বলতাম, "এবার আঁকো একটা নদী।" কখনো বলতাম, "নদীতে একটা পালতোলা নৌকা থাকবে।" আবার কখনো বলতাম, "দিগন্তজোড়া আকাশ আর সবুজ মাঠ আঁকো।"
ওরা মন দিয়ে ছবি আঁকত। কখনো একটা চুড়ি বসিয়ে ওরা নৌকা আঁকতো। কখনো হাতের কাছে যা পেতো তা-ই দিয়ে ওরা স্কেল হিসাবে ব্যবহার করতো। তারপর আমি মুস্তাফা মনোয়ারের মতো গম্ভীর মুখে প্রতিটি ছবি হাতে নিয়ে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখতাম। প্রতিটি ছবির জন্য ছিল ১০ নম্বর। বেশির ভাগ সময় ৬, ৭ কিংবা ৮ দিতাম।
বিশেষ করে যখন দেখতাম ওদের কেউ আমার বিচারের দায়িত্বে ঠিক খুশি হচ্ছে না বা আর ছবি আঁকতে চাইছে না, তখন ওদের ছবি আঁকায় ধরে রাখার জন্য, এবং ওদের মুখের নির্মল হাসি দেখার জন্য দশে ৯ কিংবা ১০-ও দিয়ে দিতাম।
ছবি আঁকাদলের একদম ছোট ভাইটি আজ আর দুনিয়াতে নেই, বড় ভাইও নেই। বুকটা প্রায় সময়ই মোচড় দিয়ে ওঠে ওদের জন্য। আমাদের সবার চেয়ে মিষ্টি আর ভারী সুদর্শন ছিল ছোট ভাইটি। তরুণ বয়সেই হঠাৎ চলে গেল। মৃত্যুর সময় তাকে না দেখতে পারার এই কষ্ট আমৃত্যু যাবে না। তাকে আমিই বেশি শাসন করতাম। অবশ্য ও প্রায় রাতেই ঘুমের ঘোরে স্বপ্নে ধরা দেয়। ওর বড়টি এখন একটি কলেজের অংকের শিক্ষক।
আজ ভাবি, আমি বিচারক হওয়ার অভিনয় করলেও, প্রকৃত বিচারক ছিলেন মুস্তাফা মনোয়ার। তিনি আমাদের শিখিয়েছিলেন—একটি ছবির পেছনে থাকে একটি শিশুর কল্পনা, আর সেই কল্পনাকে উৎসাহ দিতে হয়।
রংতুলির পাঠশালা

মুস্তাফা মনোয়ারের ছবি আঁকা শেখানোর ধরনটাই ছিল একেবারে অন্য রকম। তাঁর সামনে সারি করে সাজানো থাকত নানা রঙের জলরং। আমরা ভাবতাম, এবার নিশ্চয়ই তিনি নিয়ম মেনে ছবি আঁকবেন। কিন্তু না, মুস্তাফা মনোয়ার প্রথমেই সাদা কাগজের ওপর এলোমেলোভাবে নানা রঙ ছড়িয়ে দিতেন। তারপর তাঁর সেই চিরচেনা মিষ্টি, পাতলা ঠোঁটের কোমল কণ্ঠে বলতেন, "এই দেখো..."।
এরপর এক রঙের সঙ্গে আরেক রঙ মিশতে শুরু করত। ধীরে ধীরে সেই এলোমেলো রঙ যেন অলৌকিকভাবে রূপ নিতে থাকত—নীল আকাশ, উড়ে যাওয়া পাখি, নদীর বুকে পালতোলা নৌকা, ঘোমটা পরা বধূ, কিংবা সবুজ গ্রামের দৃশ্য। আমরা বিস্ময়ে তাকিয়ে থাকতাম। মনে হতো, মুস্তাফা মনোয়ার যেন রংতুলি নয়, জাদুর কাঠি দিয়ে ছবি আঁকছেন।
নতুন কুঁড়ির ডাক
আর "নতুন কুঁড়ি"! আজও কানে বাজে সেই অমর টাইটেল সংগীত—
"আমরা নতুন, আমরা কুঁড়ি, নিখিল বন-নন্দনে..."
গানটি দূর থেকে ভেসে এলেই পাড়ার খেলাধুলা থেমে যেত। আমরা পড়িমরি করে দৌড়ে চলে আসতাম ঘরের ভেতরে, সেই ১৪ ইঞ্চির সাদাকালো টেলিভিশনের সামনে। মনে হতো, অনুষ্ঠানটি যেন শুধু আমাদের জন্যই তৈরি। গানটির গীতিকার ছিলেনমেুস্তফা মনোয়ারের বাবা কবি গোলাম মোস্তফা।
অনুষ্ঠান শুরুর আগেই এক ধরনের উৎসব তৈরি হতো—কে কোথায় বসবে, অ্যান্টেনা ঠিক আছে কি না, ছবি ঝাপসা হচ্ছে কি না—সবকিছুতেই উত্তেজনা। টাইটেল সংগীত বাজা মাত্র মনে হতো, যেন মুস্তাফা মনোয়ারই আমাদের ডাকছেন।

আমাদের শৈশবের অদৃশ্য শিক্ষক
মুস্তাফা মনোয়ারের সবচেয়ে বড় কৃতিত্ব ছিল তিনি শিশুদের কখনো ছোট করে দেখেননি। তিনি জানতেন, একটি জাতির ভবিষ্যৎ গড়ে ওঠে শিশুর কল্পনা, সৃজনশীলতা ও আত্মবিশ্বাসের ওপর। তাই মুস্তাফা মনোয়ার এমন অনুষ্ঠান নির্মাণ করেছিলেন, যা বিনোদনের পাশাপাশি শিক্ষা, সৌন্দর্যবোধ ও মানবিকতার পাঠও দিত।
আজ যখন শিশুদের হাতে মোবাইল ফোন, অসংখ্য চ্যানেল আর অন্তহীন ডিজিটাল বিনোদন, তখন মনে হয়—আমাদের শৈশব হয়তো অনেক দিক থেকেই বেশি সমৃদ্ধ ছিল। কারণ আমরা মুস্তাফা মনোয়ারের মতো একজন শিল্পীর সান্নিধ্য পেয়েছিলাম।
স্মৃতির ভেতর মুস্তাফা মনোয়ার
কবি গোলাম মোস্তফার কনিষ্ঠ সন্তান মুস্তাফা মনোয়ার কেবল একজন চিত্রশিল্পী ছিলেন না; তিনি ছিলেন আমাদের শৈশবের এক নির্মাতা। আমরা অনেকেই হয়তো কখনো তাঁর সঙ্গে দেখা করিনি, কিন্তু মুস্তাফা মনোয়ার আমাদের ঘরে ঘরে এসেছেন, আমাদের কল্পনায় রং ছড়িয়েছেন, আমাদের বেড়ে ওঠার অংশ হয়ে থেকেছেন।
আজ মুস্তাফা মনোয়ার নেই। কিন্তু যখনই কোনো শিশুর হাতে রংতুলি দেখি, কিংবা কাগজে নদী-নৌকা-আকাশ আঁকা দেখি, তখন মনে হয়—মুস্তাফা মনোয়ার এখনও আমাদের মাঝেই আছেন।
ব্যক্তিগত স্মৃতির সেতু
আমার লেখালেখির সুবাদে লন্ডনে একজন বিশিষ্ট লেখিকার সঙ্গে পরিচয় হয়। এই মুহূর্তে মিডিয়াতে তাঁর নাম প্রকাশে আপত্তি থাকায়, নাম প্রকাশ করছি না। তাঁর ৩২টি গ্রন্থ ইতোমধ্যে প্রকাশিত হয়েছে। একসময় তিনি বিবিসি লন্ডনে বাংলা সংবাদ পাঠ করতেন। বর্তমানে তাঁর বয়স ৮২ বছর। গত কয়েক বছর ধরে তিনি চোখে দেখতে পান না। নিজের আত্মজীবনী নিজ হাতে লিখতে পারবেন না বলেই তিনি আমাকে সেটি অনুলিখন করে দেওয়ার অনুরোধ করেন।
ভদ্রমহিলার আন্তরিকতা, আতিথেয়তা এবং জীবনের অসংখ্য অভিজ্ঞতার গল্প আমাকে গভীরভাবে মুগ্ধ করে। ধীরে ধীরে আত্মজীবনী লেখার কাজ করতে করতে আমাদের সম্পর্ক কেবল লেখক ও অনুলেখকের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি। তিনি আমাকে আপন ছোট ভাইয়ের আসনে বসিয়েছেন।
এরপরই জীবনের আরেকটি বিস্ময়কর অধ্যায়ের সঙ্গে পরিচয় হয়। জানতে পারি, তিনি মুস্তাফা মনোয়ারের আপন ভাগনি। সেই থেকে মুস্তাফা মনোয়ার আমার কাছেও শুধু একজন কিংবদন্তি শিল্পী নন; তিনি হয়ে ওঠেন পরিবারের একজন প্রবীণ মানুষ।
একজন শিল্পীর উত্তরাধিকার
অনুলিখনে আত্মজীবনী লিখতে বসলে প্রায়ই মনে হয়, আমি যেন শুধু একজন লেখিকার জীবন লিখছি না। প্রতিটি অধ্যায়ে বারবার ফিরে আসেন তাঁর নানা কবি গোলাম মোস্তফা, ফিরে আসেন মুস্তাফা মনোয়ার, পাইলট মোস্তফা আনোয়ার, সত্যজিৎ রায়, পূর্নেন্দু পত্রী, মৈত্রেয়ী দেবী, আবদুল্লাহ আবু সাঈদ স্যার, আব্বাস উদ্দিন নানা—সবাই।
এটি শুধু একজন মানুষের জীবন নয়; যেন একটি পরিবারের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক ইতিহাস লেখা হচ্ছে।
বাংলাদেশের পাপেটম্যান
মুস্তাফা মনোয়ারের অবদান শুধু টেলিভিশনের পর্দায় সীমাবদ্ধ ছিল না। কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের লাল সূর্যের অন্যতম নকশাকার হিসেবে তিনি ভাষা আন্দোলনের চেতনাকে শিল্পে রূপ দিয়েছেন।
মুক্তিযুদ্ধের সময় শরণার্থী শিবিরে শিশুদের মুখে হাসি ফিরিয়ে আনতে তিনি প্রথম পাপেট শোর আয়োজন করেন। সেই উদ্যোগই তাঁকে ‘বাংলাদেশের পাপেটম্যান’ হিসেবে পরিচিত করে।
স্বাধীনতার পর তিনি পাপেটকে শিক্ষা, মানবিক মূল্যবোধ ও সামাজিক সচেতনতার মাধ্যম হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেন। ‘পারুল’ চরিত্র সৃষ্টি করেন এবং ‘মীনা’ প্রকল্পের সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন।
বিদায়ের পরও যিনি থাকেন
তাঁর শিল্পকর্ম আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও প্রশংসিত হয়েছে। ‘রক্তকরবী’ মঞ্চায়ন দেখে সত্যজিৎ রায় তাঁর প্রশংসা করেছিলেন। ২০০৪ সালে তিনি একুশে পদক লাভ করেন। জীবনের শেষ পর্বে তাঁর জীবনী নিয়ে নির্মিত হয় ‘শিল্প সারথি’ প্রামাণ্যচিত্র।
মুস্তাফা মনোয়ার শুধু একজন শিল্পী নন, তিনি প্রজন্মের পর প্রজন্মের শিশু ও সংস্কৃতিপ্রেমীদের হৃদয়ে বেঁচে থাকা এক অনন্য সাংস্কৃতিক পথপ্রদর্শক।
শেষ শ্রদ্ধা
আজ যখন শুনলাম মুস্তাফা মনোয়ার আর নেই, তখন মনে হলো—শুধু একজন শিল্পী নন, আমারও একজন আত্মীয় চলে গেলেন।
আমরা হারিয়েছি এমন একজন সাংস্কৃতিক স্থপতিকে, যিনি বাংলাদেশের শিশু-কিশোরদের কল্পনা, নন্দনবোধ ও সৃজনশীলতার ভিত নির্মাণে জীবনভর কাজ করেছেন।
কিছু মানুষ মৃত্যুর পরও বেঁচে থাকেন। মুস্তাফা মনোয়ার ছিলেন তেমনই একজন মানুষ। তাঁর চলে যাওয়া শূন্যতা তৈরি করেছে, কিন্তু তাঁর আঁকা শৈশব কখনো মুছে যাবে না।
মুস্তাফা মনোয়ার, যিনি কোনো দিন আমাদের বাড়িতে আসেননি, তবু প্রতি সপ্তাহে আমাদের ঘরে ঘরে উপস্থিত হতেন শৈশবে—তাঁর স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা।
লেখক: সম্পাদক, কলামিস্ট, গল্পকার, বিশ্লেষক ও সাবেক অধ্যাপক
লন্ডন, ২৯ জুন ২০২৬