বিশেষ সম্পাদকীয় ।। ভাষার মাসে গণতন্ত্রের নতুন প্রত্যাশা
ফেব্রুয়ারি এলেই বাঙালির হৃদয়ে ফিরে আসে এক গভীর আবেগ, এক অনন্য ইতিহাস। এই মাস আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় সেই গৌরবময় সংগ্রামের কথা, যখন মায়ের ভাষার মর্যাদা রক্ষায় তরুণেরা বুকের তাজা রক্ত ঢেলে দিয়েছিলেন রাজপথে। ভাষার অধিকার আদায়ের সেই আন্দোলন কেবল একটি ভাষাকে রক্ষা করেনি; এটি বাঙালি জাতির আত্মপরিচয়ের ভিত্তি নির্মাণ করেছিল, জন্ম দিয়েছিল স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষার।
একুশে ফেব্রুয়ারির আত্মত্যাগ আমাদের শিখিয়েছে—অধিকার কখনো ভিক্ষায় মেলে না, তা অর্জন করতে হয় সংগ্রামের মাধ্যমে। সেই চেতনা থেকেই বাঙালি এগিয়েছে স্বাধিকার আন্দোলনের পথে, এবং শেষ পর্যন্ত অর্জন করেছে স্বাধীন রাষ্ট্রের স্বপ্নপূরণ।
আজ মহান একুশে ফেব্রুয়ারি শুধু বাংলাদেশের নয়, পুরো বিশ্বের সম্পদ। আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে এই দিনটি ভাষা বৈচিত্র্য, সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্য ও মানুষের মৌলিক অধিকারকে সম্মান করার বার্তা বহন করে। পৃথিবীর নানা প্রান্তে মানুষ যখন নিজ নিজ মাতৃভাষার মর্যাদা রক্ষার কথা বলে, তখন বাঙালির আত্মত্যাগ নতুন করে বিশ্ববাসীকে অনুপ্রাণিত করে।
এবারের ফেব্রুয়ারি মাস এসেছে বিশেষ এক প্রেক্ষাপটে। দীর্ঘ রাজনৈতিক অচলাবস্থা ও দমন-পীড়নের পর দেশ এগোচ্ছে নতুন রাজনৈতিক অধ্যায়ের দিকে। সামনে জাতীয় নির্বাচন—যা গণতন্ত্রে ফেরার পথে একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। জনগণের প্রত্যাশা, এই নির্বাচন হবে অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য; যার মধ্য দিয়ে দেশের মানুষ তাদের মতামত স্বাধীনভাবে প্রকাশের সুযোগ পাবে।
ভাষা আন্দোলনের মূল শিক্ষা ছিল মানুষের কথা বলার অধিকার নিশ্চিত করা। আজ সেই শিক্ষার আলোতেই আমাদের দেখতে হবে বর্তমান সময়কে। ভাষার মর্যাদা যেমন গণতন্ত্রের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে যুক্ত, তেমনি ভোটাধিকারও নাগরিক স্বাধীনতার অন্যতম ভিত্তি। তাই ভাষার মাসে দাঁড়িয়ে গণতন্ত্রের নতুন যাত্রা শুরু হওয়া জাতির জন্য একটি তাৎপর্যপূর্ণ বার্তা বহন করে।
আমরা আশা করি, আগামী দিনগুলোতে নির্বাচিত সরকার মানুষের জীবনমান উন্নয়নে কার্যকর উদ্যোগ নেবে, রাষ্ট্র পরিচালনায় জবাবদিহি ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করবে, এবং বৈষম্যহীন সমাজ গঠনে দৃঢ় পদক্ষেপ গ্রহণ করবে।
ফেব্রুয়ারি আমাদের শোকের মাস, আবার গৌরবেরও। এই মাস আমাদের মনে করিয়ে দেয়—ত্যাগের পথেই অগ্রগতি, সংগ্রামের মধ্যেই মুক্তি। ভাষার মাসে দাঁড়িয়ে সেই চেতনাকে ধারণ করেই আমরা প্রত্যাশা করি, বাংলাদেশ এগিয়ে যাবে গণতন্ত্র, ন্যায়বিচার ও সমৃদ্ধির পথে।