বাংলাদেশে বেসরকারী এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের অবসরকালীন ভাতার জন্য কষ্টের নেই সীমা পরিসীমা !

বাংলাদেশে বেসরকারী এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের অবসরকালীন ভাতার জন্য কষ্টের নেই সীমা পরিসীমা !

ভয়েস অব পিপল ডেস্ক নিউজ:  বাংলাদেশে বেসরকারী স্কুল-কলেজে শিক্ষকতা করা যেন রীতিমতো এক অভিশাপ। কারণ সারা জীবন সরকারী অংশের ভাতার জন্য লালায়িত হয়ে প্রতি মাসে অপেক্ষা করতে হয়, তাও আবার সেই অংশের নাম হচ্ছে ‘বেনিফিট’। এটা সম্মানী হিসাবেও সরকার ঠিকমতো বিবেচনা করে না। এরপর অবসরে গেলে অবসরকালীন ভাতা পেতে পেতে অনেক শিক্ষকের জীবনপ্রদীপ পর্যন্ত নিভে যাওয়ার উদাহরণ আছে ভূরি ভূরি। অতচ শিক্ষাগত যোগ্যতায় অনেকেই সরকারী স্কুল বা কলেজের শিক্ষকের চেয়ে কোন অংশে কম নন তাঁরা।

বেসরকারী শিক্ষাক্ষেত্রে দীর্ঘদিন কাজ করা এমপিওভুক্ত শিক্ষকরা এখন অবসরকালীন ভাতার জন্য প্রতিনিয়ত সংগ্রাম করছেন। অনেকের জীবনযাপন কষ্টকর হয়ে উঠেছে, স্বাস্থ্য-সুরক্ষা ও পরিবারের দৈনন্দিন খরচ মেটানোই হয়ে গেছে বড় চ্যালেঞ্জ। চাকরি শেষের পর প্রাপ্য সুবিধা না পাওয়ায় শিক্ষকদের একের পর এক আর্থিক ও মানসিক জটিলতার মুখোমুখি হতে হচ্ছে। সারাজীবন পরের সন্তানদের মানুষ করতে গিয়ে অনেকের সন্তানরা বিপথেও চলে যায়।

রংপুরের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক আব্দুল মালেক দারিদ্র্যের সঙ্গে লড়ছেন। ২০২৩ সালে অবসরে গেছেন তিনি। মেয়ের বিয়ে, ছেলের পড়াশোনা এবং পরিবারের ওষুধ খরচ—প্রতি মাসে সাড়ে তিন হাজার টাকা বের হয়। চাকরিজীবনের স্বপ্ন, হজে যাওয়ার পরিকল্পনা, সবই থমকে গেছে। ঋণের বোঝা মাথায় নিয়ে তিনি এখন সংসারের দৈনন্দিন দায়িত্ব সামলাচ্ছেন।

বরিশালের ললিত রঞ্জন চৌধুরীও বার্ধক্যজনিত রোগে জর্জরিত। ৩২ বছর শিক্ষকতা সেবা শেষে তিনি অবসরকালীন সুবিধা না পেয়ে চিকিৎসা পর্যন্ত নিতে পারছেন না। তিনি জানান, “আমি চাকরিতে থাকাকালীন স্বাভাবিকভাবে আমার প্রাপ্য টাকা নিশ্চিত করতে পারিনি, আর এখন নিরুপায় হয়ে পড়েছি।”

এই দুই শিক্ষকের মতো এক লাখের বেশি বাংলাদেশের বেসরকারী এমপিওভুক্ত শিক্ষকও মানবেতর জীবনযাপন করছেন। অনেকের অবসরকালীন ভাতা না পেয়ে মৃত্যুর আগেই আর্থিক তিক্ততা ভোগ করতে হয়েছে। নীলক্ষেত থেকে ইস্কাটন পর্যন্ত শিক্ষকদের ভোগান্তি অব্যাহত।

তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালে এখনও ২০২২ সালের আবেদন সম্পূর্ণ হয়নি। সরকারি বরাদ্দের মধ্যে অনেক টাকা লোপাট হওয়ায় বিপুলসংখ্যক শিক্ষক বঞ্চিত হয়েছেন। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় অধ্যাপক ড. মামুন হোসেন বিষয়টি গুরুত্বসহকারে দেখার চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু দায়িত্ব পরিবর্তনের কারণে তা আর সুরাহা হয়নি।

বর্তমানে অবসর সুবিধা স্বাভাবিক করতে সরকারের প্রয়োজন প্রায় ৭,৫০০ কোটি টাকা। বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান শিক্ষক ও কর্মচারী কল্যাণ ট্রাস্ট এবং অবসর বোর্ড নিয়মিত অর্থ সংগ্রহ করছে—কিন্তু মাসিক চাহিদার তুলনায় জমা হওয়া অর্থ অপ্রতুল। প্রতি মাসে ৭৩ কোটি টাকা জমা হলেও প্রয়োজন ১১৫ কোটি, আর কল্যাণ ট্রাস্টে ৫২ কোটি জমা হলেও প্রয়োজন ৬৫ কোটি।

কল্যাণ ট্রাস্টের সচিব অধ্যাপক মো. হুমায়ুন কবির সেখ বলেন, “অর্থের ঘাটতির কারণে নিয়মিত সুবিধা দিতে পারছি না। সরকার যদি এককালীন অর্থ দেয়, তবে আমরা শিক্ষকরা তাদের প্রাপ্য টাকা দিতে পারব।”

বর্তমান শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন জানান, “বৃদ্ধ বয়সে শিক্ষকরা টাকার জন্য দ্বারে দ্বারে ঘুরছেন—এটি আমাকে কষ্ট দেয়। বিষয়টি সুরাহা করতে ইতোমধ্যে আলোচনা করেছি। আশা করি ধীরে ধীরে শিক্ষকরা এর সুফল পাবেন।”

এক কথায়, বাংলাদেশের বেসরকারী এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের অবসরভাতা এখনো স্বপ্নের মতো দূরে, নতুন সরকারের পদক্ষেপই তাদের একমাত্র আশা।