সীমান্ত থেকে শহর, পাড়া-মহল্লা থেকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান—মাদকের বিস্তার এখন জাতীয় উদ্বেগ

নেশার বাজারে হারিয়ে যাচ্ছে তারুণ্য

নেশার বাজারে হারিয়ে যাচ্ছে তারুণ্য

ভয়েস অব পিপল প্রতিবেদন, ১ সেপ্টেম্বর:

একটি ট্যাবলেট, এক পুরিয়া গাঁজা কিংবা কয়েক ফোঁটা তরল নেশা—শুরুটা হয়তো খুব ছোট। কিন্তু সেই ছোট শুরুই কখনো একটি পরিবারের দীর্ঘ কান্নার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। কেউ হারায় পড়াশোনা, কেউ কর্মজীবন, কেউ পরিবার; আবার কেউ নেশার টাকা জোগাড় করতে গিয়ে ঢুকে পড়ে অপরাধের জগতে।

বাংলাদেশে মাদকের বিস্তার এখন আর কোনো নির্দিষ্ট সীমান্তবর্তী জেলা বা বড় শহরের সমস্যা নয়। সীমান্তপথে প্রবেশের পর বিভিন্ন পরিবহন ও সরবরাহ নেটওয়ার্কের মাধ্যমে মাদক ছড়িয়ে পড়ছে দেশের নানা অঞ্চলে। সবচেয়ে বড় উদ্বেগের জায়গা হয়ে উঠেছে তরুণ ও কিশোররা।

সাম্প্রতিক জাতীয় গবেষণার হিসাবে দেশে প্রায় ৮২ লাখ মানুষ অবৈধ মাদক ব্যবহার করেন, যা মোট জনসংখ্যার প্রায় ৪ দশমিক ৮৮ শতাংশ। গবেষণায় দেখা গেছে, প্রায় ৩৩ শতাংশ ব্যবহারকারী ৮ থেকে ১৭ বছর বয়সে মাদক গ্রহণ শুরু করেছেন এবং ৫৯ শতাংশ শুরু করেছেন ১৮ থেকে ২৫ বছর বয়সে। অর্থাৎ মাদকের বাজারের একটি বড় অংশের সঙ্গে জড়িয়ে আছে অল্প বয়সী মানুষ।

আরেকটি তথ্য আরও গুরুত্বপূর্ণ। গবেষণায় গাঁজাকে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত অবৈধ মাদক হিসেবে পাওয়া গেছে—প্রায় ৬০ লাখ ৮০ হাজার মানুষ গাঁজা ব্যবহার করেন। এরপর রয়েছে ইয়াবা বা মেথামফেটামিন; ব্যবহারকারীর সংখ্যা প্রায় ২২ লাখ ৯৩ হাজার।

অর্থাৎ মাদক সমস্যা শুধু ইয়াবাকে ঘিরে নয়। গাঁজা, ইয়াবা, ফেনসিডিলসহ বিভিন্ন মাদক মিলিয়ে তৈরি হচ্ছে একটি বিস্তৃত বাজার।

সীমান্তে শুরু, দেশের ভেতরে বিস্তার

বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান মাদক পাচারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। দেশের বিভিন্ন সীমান্ত দিয়ে নানা ধরনের মাদক ঢোকার চেষ্টা হয়। এরপর সীমান্তবর্তী এলাকা থেকে তা চলে যায় জেলা শহর, উপজেলা, পরিবহনকেন্দ্র ও শেষ পর্যন্ত পাড়া-মহল্লায়।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিয়মিত অভিযানে বিভিন্ন সময়ে বিপুল পরিমাণ মাদক উদ্ধারের ঘটনা সেই সরবরাহ নেটওয়ার্কের অস্তিত্বেরই ইঙ্গিত দেয়।

তবে একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি—আইনশৃঙ্খলা বাহিনী যত মাদক উদ্ধার করে, সেটিই পুরো বাজারের পরিমাণ নয়। উদ্ধার হওয়া চালান দৃশ্যমান; যে চালান ধরা পড়ে না, তার হিসাব সাধারণত পাওয়া যায় না।

ফলে শুধু ‘কত কেজি বা কত পিস মাদক উদ্ধার হয়েছে’ দিয়ে দেশের মাদক পরিস্থিতির প্রকৃত চিত্র বোঝা সম্ভব নয়।

দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে মাদকের নতুন বাজার

দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সীমান্ত ও নদীপথও মাদক পাচারের ঝুঁকির বাইরে নয়। খুলনা, সাতক্ষীরা, যশোর, নড়াইল ও বাগেরহাটসহ বিভিন্ন এলাকায় ইয়াবা, ফেনসিডিল ও গাঁজার বিস্তার নিয়ে স্থানীয় পর্যায়ে উদ্বেগ রয়েছে।

স্থানীয় অভিযোগ অনুযায়ী, কোথাও গোপনে, কোথাও আবার প্রকাশ্যেই চলছে মাদক কেনাবেচা। মোবাইল ফোনে যোগাযোগ, পরিচিত ব্যক্তির মাধ্যমে সরবরাহ এবং নির্দিষ্ট স্থানে পৌঁছে দেওয়ার মতো পদ্ধতিও ব্যবহৃত হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

এখানে সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হলো—মাদক বিক্রির নেটওয়ার্ক যখন পাড়া-মহল্লার কাছাকাছি চলে আসে, তখন একজন কিশোরের জন্য মাদক পাওয়া কঠিন থাকে না।

সিলেটও ঝুঁকির বাইরে নয়

জাতীয় মাদক পরিস্থিতির সঙ্গে সিলেটের বাস্তবতাও আলাদা নয়। বরং ভারতের সঙ্গে সীমান্ত, পাহাড়ি ও নদীপথ এবং বিভিন্ন সীমান্তবর্তী জনপদের কারণে সিলেটকে মাদক পাচারের ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলগুলোর একটি হিসেবে দেখা হয়।

সাম্প্রতিক অভিযানগুলোতে সীমান্তবর্তী কোম্পানীগঞ্জ ও জৈন্তাপুরে ইয়াবার চালান ধরা পড়ার ঘটনা সামনে এসেছে। জুনে কোম্পানীগঞ্জে সিলেট জেলা গোয়েন্দা পুলিশের অভিযানে ৬০০ পিস ইয়াবা উদ্ধার এবং দুইজনকে আটকের তথ্য পুলিশ জানিয়েছে।

এর কিছুদিন পর জৈন্তাপুরে ডিবির অভিযানে ৫ হাজার পিস ইয়াবা উদ্ধারের খবর আসে। ওই ঘটনায় দুইজনকে গ্রেপ্তারের কথা জানানো হয়।

এই ঘটনাগুলো প্রমাণ করে না যে সিলেটে মাদকসেবীর সংখ্যা কত। কিন্তু এগুলো দেখায়, সীমান্তবর্তী এই অঞ্চলে মাদক পরিবহনের চেষ্টা এবং সরবরাহ নেটওয়ার্ক সক্রিয় থাকার ঝুঁকি রয়েছে।

সিলেটে মাদক পরিস্থিতির আরেকটি উদ্বেগের দিক হলো এর সঙ্গে তরুণদের সম্পৃক্ততা। তবে সিলেট বিভাগে ঠিক কতজন কিশোর বা তরুণ মাদক সেবন করছে—এমন নির্ভরযোগ্য সাম্প্রতিক বিভাগভিত্তিক সরকারি পরিসংখ্যান প্রকাশ্যে নেই। তাই অনুমানভিত্তিক কোনো সংখ্যা দেওয়া ঠিক হবে না।

সিলেটে ছয় মাসে ১০৮ হত্যা মামলা

সিলেটের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়েও সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান উদ্বেগ তৈরি করেছে। পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্যের ভিত্তিতে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত সিলেট বিভাগে ১০৮টি হত্যা মামলা হয়েছে। একই সময়ে সারাদেশে হয়েছে ১ হাজার ৭৭৮টি হত্যা মামলা।

তবে এই ১০৮টি হত্যাকাণ্ডকে মাদকের ফল হিসেবে দেখার কোনো ভিত্তি নেই। আধিপত্য বিস্তার, দখল, চাঁদাবাজি, ব্যক্তিগত বিরোধসহ নানা কারণে হত্যাকাণ্ড ঘটতে পারে। তাই মাদক ও হত্যার মধ্যে সরাসরি কারণ-ফল সম্পর্ক তৈরি করা হবে তথ্যগতভাবে ভুল।

তবে মাদক যখন অপরাধী নেটওয়ার্ক, কিশোর গ্যাং, অর্থের সংঘাত ও এলাকায় আধিপত্য বিস্তারের সঙ্গে যুক্ত হয়, তখন এটি সামগ্রিক অপরাধ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলতে পারে।

সিলেটের ক্ষেত্রে তাই মাদককে শুধু ‘নেশার সমস্যা’ হিসেবে না দেখে অপরাধ, সীমান্ত নিরাপত্তা ও তরুণ সমাজের ভবিষ্যতের সঙ্গে সম্পর্কিত একটি বিষয় হিসেবে দেখা প্রয়োজন।

কারা মাদকের দিকে যাচ্ছে?

জাতীয় গবেষণার তথ্য এখানে সবচেয়ে বড় সতর্কবার্তা দেয়। প্রায় এক-তৃতীয়াংশ মাদক ব্যবহারকারী ৮ থেকে ১৭ বছর বয়সে মাদক গ্রহণ শুরু করেছেন। আরও ৫৯ শতাংশ ১৮ থেকে ২৫ বছর বয়সে শুরু করেছেন।

অর্থাৎ মাদকাসক্তি তৈরি হওয়ার বয়স অনেকটাই তরুণ বয়স।

কেন তারা মাদকের দিকে যাচ্ছে—তার একক কোনো উত্তর নেই। বন্ধুর প্রভাব, কৌতূহল, পারিবারিক সমস্যা, মানসিক চাপ, সহজলভ্যতা, অপরাধী চক্রের প্রলোভন এবং সামাজিক পরিবেশ—বিভিন্ন কারণ কাজ করতে পারে।

তবে মাদক সহজলভ্য না হলে প্রথমবার গ্রহণের সুযোগও কমে যায়। তাই চাহিদার পাশাপাশি সরবরাহ বন্ধ করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

মাদক শুধু অপরাধ নয়, জনস্বাস্থ্যের সংকট

মাদক নিয়ে আমাদের আলোচনায় একটি বড় ঘাটতি হলো—আমরা প্রায়ই শুধু ‘মাদক ব্যবসায়ী ধরো’ বলেই থেমে যাই।

অথচ একজন মাদকাসক্ত মানুষকে চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের সুযোগ না দিলে তাকে শুধু গ্রেপ্তার করে দীর্ঘমেয়াদি সমাধান পাওয়া কঠিন।

সাম্প্রতিক জাতীয় গবেষণায় দেখা গেছে, মাদক ব্যবহারকারীদের মাত্র ১৩ শতাংশ চিকিৎসা বা পুনর্বাসনসেবা পেয়েছেন। অর্ধেকের বেশি ব্যবহারকারী মাদক ছাড়ার চেষ্টা করেছেন, কিন্তু পর্যাপ্ত সহায়তার অভাবে অনেকেই সফল হননি।

এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ তথ্য।

কারণ একজন মানুষ নেশা ছাড়তে চাইছে কিন্তু চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের পর্যাপ্ত সুযোগ পাচ্ছে না—তাহলে তাকে শুধু অপরাধী হিসেবে দেখলে সমস্যার একটি বড় অংশ অদৃশ্য থেকে যায়।

ব্যবসায়ীর লাভ, পরিবারের সর্বনাশ

মাদক ব্যবসা অন্য অনেক অবৈধ ব্যবসার মতোই লাভের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। একজন খুচরা বিক্রেতা থেকে শুরু করে পরিবহনকারী, সরবরাহকারী ও বড় কারবারি—একটি চক্রের বিভিন্ন স্তর থাকতে পারে।

এই ব্যবসার লাভের বিপরীতে সমাজকে দিতে হয় বিশাল মূল্য।

একজন তরুণের শিক্ষা নষ্ট হয়। কর্মজীবন থেমে যায়। পরিবারে অর্থনৈতিক চাপ বাড়ে। সম্পর্ক ভেঙে যায়। কেউ কেউ নেশার টাকা জোগাড় করতে গিয়ে অপরাধে জড়িয়ে পড়ে।

অর্থাৎ মাদক ব্যবসায়ীর আয় যত বাড়ে, তার সামাজিক ক্ষতির বোঝা বহন করতে হয় অসংখ্য পরিবারকে।

অভিযান দরকার, কিন্তু শুধু অভিযান যথেষ্ট নয়

মাদকবিরোধী অভিযান অবশ্যই চালাতে হবে। সীমান্তে নজরদারি বাড়াতে হবে। বড় চালান, সরবরাহকারী ও অর্থের উৎস শনাক্ত করতে হবে। একই সঙ্গে যারা মাদক ব্যবসাকে পৃষ্ঠপোষকতা করে, তাদেরও আইনের আওতায় আনতে হবে।

কিন্তু সরবরাহ বন্ধের পাশাপাশি চাহিদা কমানোর কাজটিও করতে হবে।

স্কুল-কলেজে কার্যকর মাদকবিরোধী শিক্ষা, পরিবারের সচেতনতা, খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের সুযোগ, তরুণদের মানসিক সহায়তা এবং সহজলভ্য চিকিৎসা—সবগুলোকে একসঙ্গে এগিয়ে নিতে হবে।

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের নিজস্ব কার্যক্রমেও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মাদকবিরোধী কমিটি, শ্রেণি বক্তৃতা, আলোচনা সভা ও সচেতনতা তৈরির নানা কর্মসূচির কথা রয়েছে।

প্রশ্ন হলো—এসব কর্মসূচি কতটা নিয়মিত, কতটা কার্যকর এবং সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ তরুণদের কাছে কতটা পৌঁছাচ্ছে।

এখনই না জাগলে সামনে আরও কঠিন সময়

বাংলাদেশে প্রায় ৮২ লাখ মানুষের অবৈধ মাদক ব্যবহারের হিসাব কোনো ছোট সংখ্যা নয়। তার চেয়েও ভয়ংকর হলো, ব্যবহার শুরু করার বয়স অনেকের ক্ষেত্রেই কৈশোর ও তরুণ বয়স।

সিলেট থেকে খুলনা, সীমান্ত থেকে রাজধানী—কোনো অঞ্চলই এই সমস্যার বাইরে নয়।

সীমান্তে মাদক আটকানো যেমন জরুরি, তেমনি শহরের ভেতরে ক্রেতা-বিক্রেতার নেটওয়ার্ক ভাঙাও জরুরি। মাদক ব্যবসায়ীকে আইনের আওতায় আনার পাশাপাশি মাদকাসক্ত মানুষকে চিকিৎসার সুযোগ দিতে হবে। পরিবারকে সচেতন করতে হবে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে আরও সক্রিয় করতে হবে এবং তরুণদের সামনে নেশার বিকল্প হিসেবে একটি সুস্থ, অর্থপূর্ণ জীবন তৈরি করতে হবে।

কারণ মাদকবিরোধী লড়াই শুধু কয়েকটি ট্যাবলেট বা কয়েক কেজি গাঁজা উদ্ধারের লড়াই নয়।

এটি একটি প্রজন্মকে হারিয়ে যাওয়ার হাত থেকে বাঁচানোর লড়াই।