রুটিন ইসিজি বিশ্লেষণ করে হৃদ্যন্ত্রের গোপন সংকেত শনাক্ত করতে সক্ষম নতুন প্রযুক্তি
দুই সেকেন্ডেই হৃদরোগের ঝুঁকি ধরবে ‘সুপারহিউম্যান’ এআই
ভয়েস অব পিপল ডেস্ক, ১ সেপ্টেম্বর:
হৃদরোগ শনাক্ত করতে এখন আর সবসময় দীর্ঘ পরীক্ষার জন্য অপেক্ষা করতে হবে না। মাত্র দুই সেকেন্ডেরও কম সময়ে সাধারণ ইসিজি পরীক্ষার তথ্য বিশ্লেষণ করে হৃদ্যন্ত্রের গুরুতর সমস্যার সম্ভাবনা শনাক্ত করতে সক্ষম একটি নতুন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তি তৈরি করেছেন গবেষকেরা।
ইম্পেরিয়াল কলেজ লন্ডনের গবেষকদের তৈরি এই প্রযুক্তিকে ‘সুপারহিউম্যান’ বলা হচ্ছে। কারণ, সাধারণ ইসিজিতে থাকা এমন কিছু সূক্ষ্ম সংকেতও এটি শনাক্ত করতে পারে, যা মানুষের চোখে সহজে ধরা পড়ে না। প্রযুক্তিটি তৈরি করতে ব্যবহার করা হয়েছে কোটি কোটি নয়, বরং মিলিয়ন পর্যায়ের ইসিজি ও রোগীর স্বাস্থ্যসংক্রান্ত তথ্য।
গবেষণায় দেখা গেছে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় ৬৭ হাজার রোগীর তথ্য নিয়ে করা পরীক্ষায় এআইটি হৃদ্যন্ত্রের দুর্বলতা বা হার্ট ফেইলিওরের প্রায় ৮১ শতাংশ এবং হৃদ্যন্ত্রের ভালভের রোগের প্রায় ৯০ শতাংশ শনাক্ত করতে পেরেছে।
সাধারণ ইসিজি থেকেই মিলবে বাড়তি তথ্য
ইসিজি হলো খুব পরিচিত একটি পরীক্ষা। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই এটি হৃদ্যন্ত্রের বৈদ্যুতিক কার্যকলাপ, হৃদস্পন্দনের গতি ও ছন্দের তথ্য দেয়। কিন্তু হৃদ্যন্ত্রের গঠন বা ভালভের সমস্যা নিশ্চিতভাবে জানতে সাধারণত আরও উন্নত পরীক্ষা, বিশেষ করে ইকোকার্ডিওগ্রামের প্রয়োজন হয়।
নতুন এআই প্রযুক্তির লক্ষ্য হলো সাধারণ ইসিজির মধ্যেই লুকিয়ে থাকা অতিরিক্ত তথ্য বের করে আনা। কোনো রোগীর হৃদ্যন্ত্রে এমন সমস্যা থাকার সম্ভাবনা দেখা গেলে তাকে দ্রুত ইকোকার্ডিওগ্রাম বা প্রয়োজনীয় চিকিৎসার জন্য অগ্রাধিকার দেওয়া যেতে পারে।
এর ফলে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের কাছে পৌঁছানোর আগেই ঝুঁকিপূর্ণ রোগীদের আলাদা করে চিহ্নিত করা সম্ভব হতে পারে। বিশেষ করে যেসব রোগী এখনো কোনো স্পষ্ট উপসর্গ নিয়ে চিকিৎসকের কাছে আসেননি, তাদের ক্ষেত্রেও প্রযুক্তিটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
চিকিৎসককে সরাবে না, বরং বাড়াবে ‘আরেক জোড়া চোখ’
গবেষকেরা অবশ্য বলছেন, এই প্রযুক্তি চিকিৎসকের বিকল্প হিসেবে তৈরি করা হয়নি। বরং চিকিৎসকদের সিদ্ধান্ত নেওয়ার কাজে সহায়তা করাই এর উদ্দেশ্য।
ইম্পেরিয়াল কলেজের গবেষকদের মতে, একজন চিকিৎসক ইসিজিতে যে তথ্য দেখতে পান, এআই তার বাইরে থাকা কিছু সূক্ষ্ম বৈদ্যুতিক সংকেত বিশ্লেষণ করতে পারে। ফলে চিকিৎসক আরও দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন—কাকে জরুরি ভিত্তিতে পরবর্তী পরীক্ষা বা চিকিৎসার জন্য পাঠানো প্রয়োজন।
এই প্রযুক্তি হাসপাতালগুলোতে ব্যবহারের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। এর পেছনে ব্রিটিশ হার্ট ফাউন্ডেশনের দীর্ঘদিনের গবেষণা সহায়তাও রয়েছে। প্রযুক্তিটি বাণিজ্যিকভাবে হাসপাতাল ব্যবহারের উপযোগী করতে Cardiovolt.ai নামে একটি প্রতিষ্ঠানও গড়ে উঠেছে।
বিশেষজ্ঞদের আশা, ভবিষ্যতে হাসপাতালের প্রায় সব রুটিন ইসিজির সঙ্গে এমন এআই যুক্ত করা গেলে অজানা হৃদরোগের অনেক ঘটনা আগেভাগে ধরা পড়তে পারে। এমনকি হাতে বহনযোগ্য ইসিজি যন্ত্রেও এই প্রযুক্তি ব্যবহারের পরিকল্পনা রয়েছে।
হৃদরোগ বিশ্বজুড়ে মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ। তাই কয়েক মিনিট বা কয়েক মাস নয়—মাত্র কয়েক সেকেন্ডে ঝুঁকিপূর্ণ রোগীকে চিহ্নিত করার এই প্রযুক্তি কার্যকরভাবে হাসপাতাল ব্যবস্থায় যুক্ত করা গেলে দ্রুত চিকিৎসা শুরুর সুযোগ বাড়তে পারে। তবে এআইয়ের ফলাফলকে চূড়ান্ত রোগ নির্ণয় হিসেবে না দেখে চিকিৎসকের মূল্যায়ন ও প্রয়োজনীয় নিশ্চিত পরীক্ষার সঙ্গে মিলিয়ে নেওয়াই হবে নিরাপদ পদ্ধতি।