ব্রিটেন সংবাদ
ব্রিটেনের মাটিতে মাইক্রোপ্লাস্টিক, খাদ্যনিরাপত্তা নিয়ে এমপিদের সতর্কবার্তা
ভয়েস অব পিপল রিপোর্ট, ১ সেপ্টেম্বর:
ব্রিটেনের কৃষিজমিতে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি বাড়তে থাকায় দেশের খাদ্যনিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বিজ্ঞানী, এমপি ও পরিবেশকর্মীরা বলছেন, বিষয়টি এখন আর শুধু পরিবেশদূষণের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; ভবিষ্যতে মাটির উর্বরতা ও খাদ্য উৎপাদনেও এর প্রভাব পড়তে পারে।
মাইক্রোপ্লাস্টিক নিয়ে ব্রিটিশ পার্লামেন্টের অল-পার্টি পার্লামেন্টারি গ্রুপ (APPG) প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে কৃষিজমিতে এসব ক্ষুদ্র প্লাস্টিক কণার ক্রমবর্ধমান উপস্থিতিকে বড় ধরনের ঝুঁকি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইউরোপের সবচেয়ে বেশি মাইক্রোপ্লাস্টিক দূষিত কৃষিজমিগুলোর মধ্যে ব্রিটেনের মাটিও রয়েছে।

বিশেষ করে পানি শোধনাগার থেকে পাওয়া বর্জ্য কাদা বা সিউয়েজ স্লাজ কৃষিজমিতে সার হিসেবে ব্যবহারের মাধ্যমে মাটিতে মাইক্রোপ্লাস্টিক জমা হচ্ছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
মাইক্রোপ্লাস্টিক বলতে সাধারণত ১ মাইক্রোমিটার থেকে ৫ মিলিমিটার আকারের প্লাস্টিক কণাকে বোঝায়। কাপড়, প্লাস্টিকের প্যাকেট, রং, প্রসাধনী এবং গাড়ির টায়ারসহ দৈনন্দিন ব্যবহারের নানা সামগ্রী ক্ষয় হয়ে এসব কণা তৈরি করতে পারে।
গবেষকদের উদ্বেগের জায়গা শুধু মাটিতে প্লাস্টিকের উপস্থিতি নয়। এসব কণা মাটির গঠন ও পানি ধারণক্ষমতায় পরিবর্তন আনতে পারে। একই সঙ্গে মাটির জন্য গুরুত্বপূর্ণ ব্যাকটেরিয়া ও ছত্রাকের মতো অণুজীব এবং কেঁচোর মতো প্রাণীর ওপরও এর প্রভাব পড়তে পারে। ফলে মাটির স্বাভাবিক জীববৈচিত্র্য ও উর্বরতা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
প্রতিবেদনের অন্যতম লেখক এবং ইউনিভার্সিটি অব পোর্টসমাউথের রেভল্যুশন প্লাস্টিকস ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ক্রেসিডা বাওয়ার বলেন, মাটিকে শুধু নিষ্প্রাণ কোনো বস্তু হিসেবে দেখলে চলবে না। এটি একটি জটিল জীবন্ত বাস্তুতন্ত্র, যার ওপর কৃষি ও খাদ্য উৎপাদন নির্ভরশীল।
আরেকটি উদ্বেগের বিষয় হলো, মাইক্রোপ্লাস্টিক পরিবেশ থেকে অন্যান্য দূষক পদার্থ শোষণ করতে পারে। ভারী ধাতু, ব্যাকটেরিয়া ও অন্যান্য রাসায়নিক এসব কণার সঙ্গে যুক্ত হয়ে আরও জটিল দূষণ তৈরি করতে পারে বলে প্রতিবেদনে সতর্ক করা হয়েছে।
এ অবস্থায় সরকারকে শুধু দূষণ শনাক্ত করার মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে উৎস পর্যায়েই মাইক্রোপ্লাস্টিকের নির্গমন কমানোর আহ্বান জানিয়েছেন এমপি ও বিজ্ঞানীরা।
প্রতিবেদনে পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপের সুপারিশ করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে মাইক্রোপ্লাস্টিক দূষণ কমাতে আইনগতভাবে বাধ্যতামূলক লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ, দূষণের বড় উৎসগুলোর ওপর নিয়ন্ত্রণ, প্লাস্টিক উৎপাদন ও ব্যবহারের পুরো চক্রে উৎপাদকদের আরও দায়িত্বশীল করা, বর্জ্যপানি ও সিউয়েজ স্লাজ ব্যবস্থাপনায় কঠোর সুরক্ষা এবং দেশজুড়ে মাইক্রোপ্লাস্টিক পর্যবেক্ষণের জন্য সমন্বিত ব্যবস্থা গড়ে তোলা।
প্রতিবেদনটির সহলেখক ড. আন্তায়া মার্চের মতে, সব বৈজ্ঞানিক প্রশ্নের চূড়ান্ত উত্তর পাওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা না করে এখনই প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। কারণ দূষণ কমানোর সুযোগ থাকলে ভবিষ্যতের ঝুঁকি কমানো সম্ভব।
দক্ষিণ লেস্টারশায়ারের এমপি ও মাইক্রোপ্লাস্টিকবিষয়ক APPG-এর চেয়ারম্যান আলবার্তো কস্তাও বলেছেন, মাইক্রোপ্লাস্টিক মোকাবিলায় ব্রিটেনের বর্তমান পদক্ষেপ খুবই সীমিত। তাঁর মতে, মানবস্বাস্থ্য ও খাদ্যনিরাপত্তা রক্ষায় উৎস থেকেই প্লাস্টিক দূষণ কমানোর দিকে নজর দেওয়া জরুরি।
জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ব্রিটিশ কৃষি ইতোমধ্যে চরম আবহাওয়া ও অন্যান্য চাপের মুখে রয়েছে। তার সঙ্গে মাটির ভেতরে অদৃশ্য প্লাস্টিক দূষণ যুক্ত হলে কৃষি উৎপাদনের ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে ভাবতে হবে—এমন সতর্কতাই উঠে এসেছে নতুন এই প্রতিবেদনে।