‘‘গল্পকাররা বিশ্ব শাসন করে’’

নির্ঝর এর ঝরঝরে অনুগল্প ।। ৩৭ ।। শিক্ষক যখন বোধিবৃক্ষ

নির্ঝর এর ঝরঝরে অনুগল্প ।। ৩৭ ।। শিক্ষক যখন বোধিবৃক্ষ

 ।। শিক্ষক যখন বোধিবৃক্ষ ।।

উৎসর্গ


শিক্ষক রাজেন্দ্র দাওয়াদি এবং

পৃথিবীর সকল সেই শিক্ষকের প্রতি,
যারা নিজেরা রোদ-বৃষ্টি-ঝড় সহ্য করে
ছাত্রদের মাথার ওপর বোধিবৃক্ষ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকেন।

ত্রিভুবন ত্রিশূলী মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক ও ছাত্রছাত্রীবৃন্দ

নেপালের পাহাড়ে সকাল নামে অন্যরকম মায়া নিয়ে। সূর্যের প্রথম আলো তুষারঢাকা শৃঙ্গ ছুঁয়ে ধীরে ধীরে নেমে আসে সবুজ পাহাড়ের গায়ে। পাহাড়ের বুক কেটে আঁকাবাঁকা পথ চলে গেছে দূরের কোনো উপত্যকার দিকে। কোথাও পাহাড়ের ঢালে ছোট ছোট ঘর, কোথাও মেঘ এসে পাহাড়কে ঢেকে রাখছে, আবার কোথাও গভীর খাদ পেরিয়ে ত্রিশূলী নদী ছুটে যাচ্ছে আপন মনে। নদীর স্বচ্ছ পানিতে সকালের আলো ঝিলিক দিচ্ছে। প্রকৃতিকে তখন মনে হচ্ছে পৃথিবীর সবচেয়ে শান্ত দৃশ্য।

শত শত পর্যটক নেপালের এই পাহাড়ি সৌন্দর্য দেখতে বিভিন্ন উপত্যকায় ঘুরে বেড়াচ্ছেন। কারও হাতে ক্যামেরা, কেউ পাহাড়ের ঢালে দাঁড়িয়ে ছবি তুলছেন, কেউ নদীর পাশে বসে আছেন। কেউ হয়তো জানেনই না, যে নদীর সৌন্দর্য তিনি ক্যামেরাবন্দী করছেন, সেই নদীই কয়েক ঘণ্টা পর ভয়ংকর এক রূপ নিতে যাচ্ছে। পাহাড়ের ওপরে মেঘ জমছে। বাতাস বদলে যাচ্ছে। ত্রিশূলী নদীর বুক ফুলে উঠছে। প্রকৃতি যেন নিঃশব্দে নিজের ভাষায় মানুষকে কিছু একটা বলতে চাইছে।

ত্রিশূলী উপত্যকার ত্রিভুবন ত্রিশূলী মাধ্যমিক বিদ্যালয়েও সকাল শুরু হচ্ছে অন্য দিনের মতো। মাঠে ছেলেমেয়েরা ছুটছে। কেউ বই খুলছে, কেউ বন্ধুর সঙ্গে গল্প করছে। কেউ জানালার পাশে দাঁড়িয়ে পাহাড় দেখছে। স্কুলে তখন প্রায় ৯০০ শিক্ষার্থী উপস্থিত। আরও প্রায় ৭০০ শিক্ষার্থী বাসে কিংবা পায়ে হেঁটে স্কুলের পথে। সব মিলিয়ে শিক্ষার্থীর সংখ্যা ১ হাজার ৬৪৩। তাদের কেউ জানে না, আজকের দিনটি তাদের জীবনের অন্য সব দিনের চেয়ে আলাদা হতে যাচ্ছে।

প্রধান শিক্ষক রাজেন্দ্র দাওয়াদি তাঁর অফিসে বসে আছেন। বয়স ৪৭। বহু বছর ধরে তিনি এই স্কুলে শিক্ষকতা করছেন। তাঁর কাছে স্কুল মানে শুধু একটি ভবন নয়। এই ভবনের প্রতিটি শ্রেণিকক্ষের সঙ্গে তাঁর স্মৃতি জড়িয়ে আছে। প্রতিটি শিশুর মুখ তাঁর কাছে আলাদা। কোনো শিশুর বাবা নেই, কোনো শিশুর মা অসুস্থ, কেউ দরিদ্র পরিবারের সন্তান—সব খবরই যেন তাঁর জানা।

হঠাৎ ফোন বাজে। ওপাশে তাঁর এক বন্ধু। কণ্ঠে অস্বাভাবিক উৎকণ্ঠা।

--রাজেন্দ্র, ওপরের দিকে একটা গ্রাম পানিতে ডুবে গেছে।

রাজেন্দ্র কিছুক্ষণ চুপ করে থাকেন।

--কত দূরে?

--প্রায় পাঁচ মাইল।

তিনি জানালার বাইরে তাকান। ত্রিশূলী নদীর দিকে তাঁর চোখ চলে যায়। নদীটাকে আর আগের মতো শান্ত মনে হচ্ছে না।

ঠিক তখনই আরেকটি ফোন আসে। একজন অভিভাবক ফোন করেছেন।

--স্যার, নদীর পানি খুব দ্রুত বাড়ছে। স্কুলের দিকেই আসছে মনে হচ্ছে।

রাজেন্দ্র আর কোনো প্রশ্ন করেন না। তাঁর চোখের সামনে ভেসে ওঠে স্কুলের মাঠ। নয়শো শিশু। তারপর মনে পড়ে যায়—আরও প্রায় সাতশো শিশু পথে আছে।

তিনি সঙ্গে সঙ্গে বাসচালকদের ফোন করা শুরু করেন।

--বাস ফিরিয়ে নিন। এখনই।

একজন চালক হয়তো পরিস্থিতির ভয়াবহতা বুঝতে পারছেন না।

--কিন্তু স্যার, আমরা তো স্কুলের কাছাকাছি চলে এসেছি।

--আর এক ইঞ্চিও সামনে আসবেন না। বাস ঘুরিয়ে দিন।

একজন একজন করে বাস ফিরতে শুরু করে। কিন্তু একটি বাস তখনও স্কুলের দিকে এগিয়ে আসছে। রাজেন্দ্র আবার ফোন করেন। এবার তাঁর কণ্ঠে কোনো দ্বিধা নেই।

--বাস ঘুরিয়ে দিন। এখনই।

বাসটি ঘুরে যায়। সেতুর অপর প্রান্তে পৌঁছানোর সঙ্গে সঙ্গে সেতুটি বিকট শব্দে ভেঙে পড়ে।

রাজেন্দ্র কয়েক মুহূর্ত স্থির হয়ে থাকেন। তিনি বুঝতে পারেন, মাত্র কয়েক সেকেন্ডের ব্যবধান কতগুলো জীবনকে মৃত্যুর হাত থেকে ফিরিয়ে আনতে পারে।

কিন্তু বিপদ তখনও শেষ হয়নি।

স্কুলের চত্বরে পানি ঢুকতে শুরু করেছে। প্রথমে অল্প। তারপর দ্রুত। শিশুরা ভয় পেয়ে যাচ্ছে। কেউ কাঁদছে, কেউ মাকে ডাকছে, কেউ দৌড়ে শিক্ষকের কাছে যাচ্ছে।

একটি ছোট ছেলে এসে রাজেন্দ্রর হাত ধরে।

--স্যার, আমরা মারা যাব?

রাজেন্দ্র নিচু হয়ে ছেলেটার চোখের দিকে তাকান। শিশুটির চোখে আতঙ্ক। রাজেন্দ্র তার মাথায় হাত রাখেন।

--না।

--নিশ্চিত?

রাজেন্দ্র মৃদু হাসেন।

--আমি যতক্ষণ আছি, ততক্ষণ না।

ছেলেটি তাঁর হাত আরও শক্ত করে ধরে।

রাজেন্দ্র জানেন না, তিনি সত্যিই তাদের সবাইকে বাঁচাতে পারবেন কি না। কিন্তু একজন শিক্ষক কখনো কখনো নিজের ভয়টাকে নিজের কাছে রেখে দেন, যাতে শিশুরা একটু সাহস পায়।

তিনি সবাইকে পাহাড়ের দিকে যেতে বলেন।

--সবাই পাহাড়ের দিকে যাবে। কেউ একা যাবে না। একজন আরেকজনের হাত ধরবে।

শিশুরা নড়তে শুরু করে। শিক্ষকরা তাদের সঙ্গে যাচ্ছেন। পানি বাড়ছে। পেছনে স্কুল ভবন কাঁপছে। সামনে পাহাড়। মাঝখানে হাজার হাজার শিশুর ভয়।

একজন ছাত্রী হঠাৎ পড়ে যায়। রাজেন্দ্র ছুটে যান। মেয়েটি কাঁপছে।

--স্যার, আমার খুব ভয় করছে।

রাজেন্দ্র তার দিকে তাকান।

--ভয় করলে হবে?

মেয়েটি মাথা নাড়ে।

--না।

--তাহলে আমার দিকে তাকাও। এবার হাঁটো।

মেয়েটি হাঁটতে শুরু করে। কিছুদূর গিয়ে আবার পেছনে তাকায়।

--স্যার, আপনি আসবেন তো?

রাজেন্দ্র বলেন,

--আমি তো তোমাদের সঙ্গেই আছি।

একজন ছাত্রী আতঙ্কে অসুস্থ হয়ে পড়ে। রাজেন্দ্র তাকে নিরাপদে পাঠানোর ব্যবস্থা করেন। তারপর আবার শিশুদের দিকে ফিরে তাকান। তাঁর নিজের জীবনও ঝুঁকির মধ্যে। তবু তিনি পেছনে ফিরছেন না।

পাহাড়ের দিকে উঠতে উঠতে কেউ কাঁদছে, কেউ মায়ের নাম ডাকছে, কেউ বাবাকে ফোন করার চেষ্টা করছে। একজন ছেলে নিজের মোবাইলের দিকে তাকিয়ে বলে,

--স্যার, আমার ফোনে নেট নেই।

রাজেন্দ্র তাকে শান্ত করার জন্য বলেন,

--নেট আসবে।

ছেলেটা জিজ্ঞেস করে,

--কখন?

রাজেন্দ্র একটু ভেবে বলেন,

--বৃষ্টি থামলে।

ছেলেটা আর কিছু বলে না। সে হয়তো বিশ্বাস করে। অথবা বিশ্বাস করতে চায়।

অবশেষে শিশুরা পাহাড়ের ওপরে উঠে আসে। সেখানে দাঁড়িয়ে আছে একটি বিশাল বোধিবৃক্ষ। তার নিচে একে একে শিশুরা আশ্রয় নেয়। কারও পোশাক ভেজা, কারও পায়ে কাদা, কারও চোখে এখনও আতঙ্ক। কিন্তু তারা বেঁচে আছে।

রাজেন্দ্র চারদিকে তাকান। তিনি যেন আবার গুনতে শুরু করেন। একজন, দুইজন, তিনজন... তাঁর মনে শুধু একটাই প্রশ্ন—সবাই এসেছে তো?

হঠাৎ একজন শিক্ষার্থী জিজ্ঞেস করে,

--স্যার, সান্তোস স্যার কোথায়?

রাজেন্দ্রর মুখ থেমে যায়।

৩২ বছর বয়সী সমাজ ও ইতিহাসের শিক্ষক সান্তোস পারিয়ার সেদিন অতিরিক্ত ক্লাস নিতে সকালে স্কুলে এসেছিলেন। তিনি আর ফিরছেন না। ভয়াবহ বন্যার পানিতে তিনি ভেসে যাচ্ছেন।

রাজেন্দ্র কিছুক্ষণ কোনো কথা বলেন না। তাঁর চোখ চলে যায় বোধিবৃক্ষের দিকে। তিনি গাছটির কাণ্ডে হাত রাখেন। হয়তো মনে মনে সান্তোসের জন্য প্রার্থনা করেন। তারপর ধীরে ধীরে শিশুদের কাছে ফিরে আসেন।

একটি ছোট মেয়ে তাঁর জামা ধরে।

--স্যার?

--কী?

--আমরা কি আজ বাসায় যেতে পারব?

রাজেন্দ্র মেয়েটির দিকে তাকিয়ে থাকেন। এই প্রশ্নের উত্তর তাঁর জানা নেই। চারদিকে যে বিপর্যয়, তাতে কখন বাড়ি ফেরা যাবে কেউ জানে না।

তবু তিনি বলেন,

--যাবি।

মেয়েটি আবার জিজ্ঞেস করে,

--আপনিও যাবেন?

রাজেন্দ্র মৃদু হাসেন।

--হ্যাঁ।

মেয়েটি নিশ্চিন্ত হয়ে তাঁর পাশে বসে পড়ে।

তারপর আরেকজন শিশু আসে। তারপর আরেকজন। কিছুক্ষণ পর দেখা যায়, শিশুরা রাজেন্দ্রকে ঘিরে বসে আছে। কেউ তাঁর কাঁধে মাথা রাখছে। কেউ তাঁর হাত ধরে আছে। কেউ শুধু তাঁর মুখের দিকে তাকিয়ে আছে।

রাজেন্দ্র মাঝখানে বসে আছেন।

উপরে বিশাল বোধিবৃক্ষ।

নিচে ১ হাজার ৬৪৩টি শিশুর জীবন।

আর মাঝখানে একজন শিক্ষক। ছাত্রছাত্রীদের কাছে এখন রাজেন্দ্র স্যারই বোধিবৃক্ষ।

বোধিবৃক্ষ হলো—জ্ঞান ও জাগরণের প্রতীক সেই পবিত্র বৃক্ষ, যার নিচে সিদ্ধার্থ গৌতম বুদ্ধ জ্ঞান লাভ করেছিলেন। কিন্তু সেদিন ত্রিশূলী উপত্যকার শিশুদের কাছে বোধিবৃক্ষ শুধু একটি গাছ নয়। তাদের কাছে রাজেন্দ্র দাওয়াদিও যেন একটি বোধিবৃক্ষ—যাঁর ছায়ায় ভয় একটু কমে আসে, বিপদের মধ্যে সাহস জন্ম নেয়, আর মৃত্যুর মুখেও বেঁচে থাকার বিশ্বাস জেগে ওঠে।

একজন শিক্ষক তখন আর শুধু শিক্ষক থাকেন না।

তিনি হয়ে ওঠেন মহিরুহ।

নিজে ঝড়ের মধ্যে দাঁড়িয়ে অন্যদের মাথার ওপর ছায়া ধরে রাখেন বোধিবৃক্ষের মতো।

নদী নিচে গর্জন করছে। পাহাড়ে ভূমিধস হচ্ছে। ত্রিভুবন ত্রিশূলী মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ভবনটি ধীরে ধীরে পানির ভয়ংকর স্রোতে হারিয়ে যাচ্ছে। যে স্কুলে এতদিন শিশুদের হাসির শব্দ শোনা যায়, সেটি এখন নদীর পেটে চলে যাচ্ছে।

কিন্তু শিশুরা নিরাপদ।

রাজেন্দ্র তাদের মাঝখানে বসে আছেন।

একটি ছেলে ধীরে ধীরে তাঁর হাঁটুর ওপর মাথা রেখে ঘুমিয়ে পড়ছে। একটি মেয়ে তাঁর হাত ধরে বসে আছে। কেউ কাঁদছে না এখন।

রাজেন্দ্র মেয়েটির মাথায় হাত বুলিয়ে দেন।

খুব আস্তে।

যেন নিজের সন্তানের মাথায় হাত রাখছেন।

তিনি আকাশের দিকে তাকান। বৃষ্টি তখনও পড়ছে।

তাঁর নিজের বুকের ভেতরেও ভয় আছে। নিজের পরিবারের কথা মনে পড়ছে। সহকর্মী সান্তোস পারিয়ারের কথা মনে পড়ছে। চোখের সামনে নিজের স্কুলটি ভেসে যাচ্ছে।

তবু তিনি শিশুদের সামনে সেই ভয় প্রকাশ করছেন না।

তিনি মনে মনে শুধু বলেন,

‘হে ঈশ্বর, আমার স্কুলটা তুমি নিয়ে যাও। আমার বাচ্চাগুলোকে নিও না।’

শিশুরা জানে না, তাদের শিক্ষকও ভয় পাচ্ছেন।

তারা শুধু জানে—

রাজেন্দ্র স্যার আছেন।

তাই তারা ভয় পাচ্ছে না।

সেদিন নেপালের ত্রিশূলী উপত্যকায় একটি স্কুল ভেসে যাচ্ছে। একজন শিক্ষক প্রাণ হারাচ্ছেন। পাহাড়, নদী আর কাদার নিচে চাপা পড়ছে মানুষের কত স্মৃতি। প্রকৃতি তার ভয়ংকর মুখ দেখাচ্ছে।

কিন্তু সেই ভয়ংকর দিনের মাঝেও ১ হাজার ৬৪৩টি শিশু বেঁচে থাকার গল্প হয়ে উঠছে।

কারণ একজন মানুষ সময়মতো বুঝতে পারছেন বিপদ আসছে।

একজন শিক্ষক নিজের ভয়কে সরিয়ে রেখে শিশুদের আগে রাখছেন।

আর একজন মানুষ তখন মহিরুহ হয়ে দাঁড়াচ্ছেন।

বোধিবৃক্ষ হয়ে দাঁড়াচ্ছেন।

নিজে ঝড়ের মধ্যে থেকেও ছায়া দিয়ে যাচ্ছেন।

হয়তো সত্যিকারের শিক্ষক এমনই হন।

তিনি শুধু পড়ান না—কখনো কখনো নিজের জীবন দিয়ে ছাত্রদের জন্য একটি নিরাপদ পৃথিবী তৈরি করেন। আর এই ধরনের শিক্ষকগণই ছাত্রছাত্রীদের কাছে আজীবন ‘বোধিবৃক্ষ‘ হয়েই হৃদয়ে বিরাজ করেন।

লন্ডন, ৩১ আগস্ট, ২০২৬