ভয়েস অব পিপল ।। জনগণের কণ্ঠস্বর, বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি
আমলা আছেন দেড় হাজার, পদ মাত্র ৫০২!
বাংলাদেশ প্রতিনিধি, ১ সেপ্টেম্বর:
রাষ্ট্র পরিচালনার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ স্তর জনপ্রশাসন। অথচ সেই প্রশাসনেই এখন দেখা যাচ্ছে অদ্ভুত এক অসামঞ্জস্য। কোথাও প্রয়োজনের তুলনায় কর্মকর্তা অনেক বেশি, আবার গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালনের জন্য একজন কর্মকর্তাকেই সামলাতে হচ্ছে একাধিক শাখা।
সবচেয়ে বড় ব্যবধান দেখা যাচ্ছে যুগ্ম সচিব পর্যায়ে। অনুমোদিত পদ রয়েছে ৫০২টি। কিন্তু কর্মরত কর্মকর্তা প্রায় ১ হাজার ৫০০ জন। অর্থাৎ পদের প্রায় তিনগুণ কর্মকর্তা রয়েছেন এই পর্যায়ে।
অতিরিক্ত সচিব পর্যায়েও চিত্র খুব একটা স্বাভাবিক নয়। এ পর্যায়ে প্রেষণসহ অনুমোদিত পদ ৩৩৭টি। কর্মকর্তা রয়েছেন প্রায় ৩৫০ জন।
এরপরও কেন একজন কর্মকর্তাকে একসঙ্গে দুই-তিনটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করতে হচ্ছে—এই প্রশ্নই এখন সামনে আসছে।
মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের অতিরিক্ত সচিব হুমায়ুন কবিরের দায়িত্বের উদাহরণটি বিষয়টি স্পষ্ট করে। নিজের দপ্তরের দায়িত্বের পাশাপাশি তিনি জেলা ও মাঠ প্রশাসন এবং কমিটি ও অর্থনৈতিক অনুবিভাগের দায়িত্বও পালন করছেন।
অন্য মন্ত্রণালয়েও একই ধরনের চিত্র রয়েছে। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের অতিরিক্ত সচিব মোহাম্মদ খালেদ হাসান তিনটি অনুবিভাগের দায়িত্বে আছেন। সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের অতিরিক্ত সচিব তাহমিনা ইয়াসমিনও তিনটি অনুবিভাগ দেখছেন। আরও কয়েকজন কর্মকর্তা দুটি করে গুরুত্বপূর্ণ শাখার দায়িত্ব পালন করছেন।
একজনের হাতে যত বেশি দায়িত্ব জমছে, ততই প্রশ্ন উঠছে প্রশাসনিক কাজের মান ও গতিশীলতা নিয়ে। কারণ একটি অনুবিভাগের সিদ্ধান্ত গ্রহণ, ফাইল নিষ্পত্তি ও বাস্তবায়নই যেখানে সময়সাপেক্ষ, সেখানে একই কর্মকর্তাকে একাধিক শাখার কাজ দেখতে হলে স্বাভাবিকভাবেই চাপ বাড়ে।
কাজ নেই, তবু বেতন আছে
অন্যদিকে প্রশাসনের আরেক প্রান্তে সম্পূর্ণ ভিন্ন দৃশ্য।
প্রায় ৬৫০ কর্মকর্তা বর্তমানে ওএসডি হিসেবে রয়েছেন। তাঁদের নিয়মিত কোনো দায়িত্ব নেই। অর্থাৎ একই সরকারি ব্যবস্থায় কেউ দায়িত্ব সামলাতে হিমশিম খাচ্ছেন, আর কেউ নির্দিষ্ট কাজ ছাড়াই সরকারি বেতন পাচ্ছেন।
কর্মকর্তাদের একটি অংশকে আবার এমন সব দায়িত্বে রাখা হয়েছে, যেখানে কাজের পরিমাণ খুবই কম। ফলে দক্ষ ও অভিজ্ঞ জনবল যথাযথভাবে কাজে লাগানো যাচ্ছে না—এমন প্রশ্নও উঠছে।
সমস্যাটি শুধু জনবল ব্যবস্থাপনার নয়
জনপ্রশাসন সংশ্লিষ্টদের মতে, এই পরিস্থিতির পেছনে দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক প্রভাব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। বিভিন্ন সরকারের সময়ে প্রশাসনে আনুগত্য ও আস্থার বিষয়টি গুরুত্ব পাওয়ায় যোগ্যতার ভিত্তিতে কর্মকর্তা বাছাইয়ের সংস্কৃতি দুর্বল হয়েছে বলে তাঁদের অভিমত।
জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের পর সেই পুরোনো কাঠামোয় আবার পরিবর্তন এসেছে। আগের সরকারের সময় গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকা বেশ কয়েকজন কর্মকর্তাকে বাধ্যতামূলক অবসর দেওয়া হয়েছে কিংবা ওএসডি করা হয়েছে।
গত ২৮ জুলাই ৩২ জন যুগ্ম সচিবকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়। তাঁদের অনেকেই ২০১৮ সালের নির্বাচনের সময় জেলা প্রশাসক ও রিটার্নিং কর্মকর্তার দায়িত্ব পালন করেছিলেন।
ফলে প্রশাসনে এখন শুধু শূন্য পদ পূরণ নয়, যোগ্যতা, নিরপেক্ষতা ও আস্থার মধ্যে ভারসাম্য তৈরির প্রশ্নটিও বড় হয়ে উঠেছে।
সংস্কারের প্রতিশ্রুতি কতটা বাস্তব হবে?
অন্তর্বর্তী সরকারের জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশনও দীর্ঘদিনের রাজনীতিকরণ, অদক্ষতা ও জবাবদিহির ঘাটতি নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছিল। কমিশনের সুপারিশ ছিল প্রশাসনকে আরও নিরপেক্ষ, দক্ষ ও জনমুখী করা।
বর্তমান সরকার নির্বাচনী ইশতেহারে নিয়োগ, বদলি ও পদোন্নতিতে যোগ্যতাকে প্রধান মাপকাঠি করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।
এখন সেই প্রতিশ্রুতির বাস্তব প্রয়োগই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
কারণ প্রশাসনে কর্মকর্তা কম নয়। বরং প্রশ্ন হচ্ছে—সঠিক মানুষকে সঠিক জায়গায় বসানো যাচ্ছে কি না।
একদিকে তিনটি দায়িত্ব একসঙ্গে সামলাচ্ছেন কেউ, অন্যদিকে কাজ ছাড়াই বেতন নিচ্ছেন শত শত কর্মকর্তা। এই বৈপরীত্য চলতে থাকলে জনবল বাড়িয়েও জনপ্রশাসন দক্ষ হবে না। প্রয়োজন হবে পদ, দায়িত্ব ও কর্মকর্তার মধ্যে বাস্তবসম্মত সমন্বয়—এবং তার ভিত্তি হতে হবে যোগ্যতা, দক্ষতা ও নিরপেক্ষতা।