বাংলাদেশ সংবাদ

বাংলাদেশে গত ৭ মাসে ১৫ হাজার ৯১৭ শিশু নিখোঁজ, পরিণতি জানে না কেউ

বাংলাদেশে গত ৭ মাসে ১৫ হাজার ৯১৭ শিশু নিখোঁজ, পরিণতি জানে না কেউ

বাংলাদেশ প্রতিনিধি

বাংলাদেশে শিশু নিখোঁজের ঘটনা উদ্বেগজনক মাত্রায় পৌঁছেছে। চলতি বছরের প্রথম সাত মাসে দেশের বিভিন্ন থানায় ১৫ হাজার ৯১৭ শিশুর নিখোঁজ হওয়ার ঘটনায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) হয়েছে। পুলিশ সদর দপ্তরের এই হিসাব অনুযায়ী, প্রতিদিন গড়ে ৭৫টির বেশি শিশুর নিখোঁজ হওয়ার অভিযোগ থানায় এসেছে। অর্থাৎ গড়ে প্রায় ২০ মিনিট পরপর একটি শিশুর নিখোঁজের অভিযোগ নথিভুক্ত হয়েছে।

তবে এই সংখ্যা শুনে ১৫ হাজার ৯১৭ শিশু এখনো নিখোঁজ—এমন সিদ্ধান্তে যাওয়ার সুযোগ নেই। কারণ নিখোঁজ হওয়া শিশুর অনেকে পরে উদ্ধার হয়, কেউ নিজে বাড়িতে ফিরে আসে, আবার কেউ পরিবারের অজান্তে অন্য কোথাও চলে যায়। কিন্তু বড় প্রশ্ন হলো—এই জিডিগুলোর পরিণতি কী হয়েছে, তার পূর্ণাঙ্গ জাতীয় হিসাব কোথায়?

পুলিশের কাছে নিখোঁজের জিডি রয়েছে, কিন্তু কতজন শিশু উদ্ধার হয়েছে, কতজন নিজে ফিরে এসেছে, কতটি ঘটনা অপহরণ মামলায় গড়িয়েছে, কতজন পাচারের শিকার হয়েছে এবং কতজন এখনো নিখোঁজ—এসব তথ্য এক জায়গায় এনে নিয়মিত প্রকাশের ব্যবস্থা নেই।

ফলে ১৫ হাজার ৯১৭ সংখ্যাটি মূলত জিডির সংখ্যা। এটি প্রকৃত নিখোঁজ শিশুর সংখ্যা নয়। আবার জিডি হওয়ার পর শিশুটি ফিরে এলেও পরিবার যদি থানাকে না জানায়, তাহলে পুলিশের নথিতে ঘটনাটি নিখোঁজ হিসেবেই থেকে যেতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ব্যবস্থায় বড় ধরনের তথ্যগত ঘাটতি রয়েছে। একটি শিশুর নিখোঁজের পর তার কেসের শেষ পরিণতিও নথিভুক্ত করা দরকার। শিশুটি উদ্ধার হয়েছে, নিজে বাড়ি ফিরেছে, অন্যত্র পাওয়া গেছে, অপহরণের মামলা হয়েছে, পাচারের শিকার হিসেবে শনাক্ত হয়েছে, মারা গেছে অথবা এখনো নিখোঁজ—প্রতিটি অবস্থার জন্য আলাদা তথ্য থাকা উচিত।

এ ক্ষেত্রে শুধু পুলিশের থানাভিত্তিক তথ্য যথেষ্ট নয়। পুলিশের তদন্ত, সিআইডি ও পিবিআইয়ের অনুসন্ধান, হাসপাতাল ও মর্গের তথ্য এবং শিশু নিখোঁজ নিয়ে কাজ করা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর তথ্যও একটি কেন্দ্রীয় ব্যবস্থার আওতায় আনা জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

বেসরকারি সংস্থা নারী মৈত্রীর প্রোগ্রাম ম্যানেজার তাসলিমা হুদা স্বপ্না বলেন, শিশু নিখোঁজ ঠেকাতে এখনই বাস্তবভিত্তিক উদ্যোগ নেওয়া দরকার। নারী ও শিশু নির্যাতন এবং পাচার প্রতিরোধে ১০৯ এবং শিশুদের জন্য ১০৯৮ হেল্পলাইনকে কেন্দ্র করে কার্যকর প্রকল্প নেওয়ার পরামর্শ দেন তিনি।

তার মতে, শুধু সরকারি উদ্যোগ নয়, সামাজিক সচেতনতাও বাড়াতে হবে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিয়মিত সচেতনতামূলক প্রচারণা, ছোট আকারের দৈনিক বুলেটিন এবং প্রয়োজনে ঘরে ঘরে গিয়ে প্রচারণা চালানোর ওপর গুরুত্ব দেন তিনি। বিশেষ করে ১২ থেকে ১৪ বছর বয়সী শিশু-কিশোরদের প্রতি বেশি নজর দেওয়ার কথা বলেন তিনি।

শিশু নিখোঁজের তথ্য দ্রুত ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য পুলিশ ‘MUN Alert’ নামে একটি ব্যবস্থা চালু করেছে। ২০২৬ সালের ১৩ জানুয়ারি চালু হওয়া এই ব্যবস্থায় ২৪ ঘণ্টা তথ্য দেওয়ার সুযোগ রয়েছে। নিখোঁজ শিশুর ছবি, সর্বশেষ অবস্থানসহ প্রয়োজনীয় তথ্য দ্রুত ছড়িয়ে দেওয়ার লক্ষ্যেই এটি চালু করা হয়েছে।

অতিরিক্ত আইজিপি মো. সিবগাত উল্লাহ জানান, শিশু নিখোঁজ হওয়ার পর প্রথম কয়েক ঘণ্টা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দ্রুত তথ্য ছড়িয়ে দিয়ে ব্যবস্থা নিতে পারলে শিশুকে উদ্ধারের সম্ভাবনা বাড়ে।

তিনি বলেন, ‘MUN Alert’-এর মাধ্যমে নিখোঁজ বা অপহৃত শিশুর তথ্য দ্রুত প্রচার, তথ্য যাচাই এবং ঝুঁকি মূল্যায়নের ভিত্তিতে জরুরি সতর্কতা জারি করা হয়। তবে থানার জিডির সঙ্গে ‘MUN Alert’-এর তথ্য এখনো পুরোপুরি সমন্বিত না হওয়ায় দুই ব্যবস্থার সংখ্যাকে সরাসরি তুলনা করা যাবে না।

পুলিশ ভবিষ্যতে অন্যান্য হটলাইনকেও এই ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করে একটি সমন্বিত ব্যবস্থা গড়ে তোলার পরিকল্পনার কথা জানিয়েছে। শিশু পাচারের আশঙ্কা থাকলে সীমান্তপথে নজরদারি বাড়ানোর পাশাপাশি প্রয়োজনে ইন্টারপোলের মাধ্যমে ‘ইয়েলো নোটিশ’ জারির ব্যবস্থার কথাও জানিয়েছে সিআইডি।

তবে শুধু নিখোঁজ শিশুর ছবি ও তথ্য প্রচার করাই যথেষ্ট নয় বলে মনে করছেন শিশু অধিকারকর্মীরা। তাদের মতে, শিশুটি পাওয়া গেল কি না—সেই তথ্যও একই ব্যবস্থায় দ্রুত আপডেট হওয়া দরকার। কোনো শিশুর সন্ধান পাওয়ার পর সেই তথ্য না থাকলে পুরোনো নিখোঁজের পোস্ট মানুষের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি করতে পারে এবং পুরো ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে।

শিশুদের নিয়ে কাজ করা প্রতিষ্ঠান নব আনন্দের প্রতিষ্ঠাতা শামীমা শওকত লাভলী বলেন, দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির কারণে শিশুদের নিরাপত্তা নিয়ে পরিবারের উদ্বেগ বেড়েছে। তার ভাষায়, এখন অনেক অভিভাবক সন্তানকে চোখের আড়াল করতেও ভয় পাচ্ছেন।

তিনি মনে করেন, শিশু নিখোঁজের পরিসংখ্যান শুধু পুলিশের নথির সংখ্যা নয়; এটি সমাজে তৈরি হওয়া নিরাপত্তাহীনতারও একটি প্রতিচ্ছবি।

এদিকে নিখোঁজ শিশুদের সঙ্গে পাচারের সম্পর্ক রয়েছে কি না, তা নিয়েও নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। পুলিশ বলছে, ১৫ হাজার ৯১৭টি নিখোঁজের জিডির সঙ্গে শিশু পাচারের সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে—এমন কোনো প্রমাণ তাদের হাতে নেই। তবে নিখোঁজ শিশুদের ক্ষেত্রে পাচারের আশঙ্কা পুরোপুরি উড়িয়ে দেওয়ারও সুযোগ নেই।

ইউনিসেফের ২০২৫ সালের গবেষণায় বাংলাদেশকে নারী ও শিশু পাচারের উৎস, ট্রানজিট ও গন্তব্য—তিন ধরনের দেশ হিসেবেই চিহ্নিত করা হয়েছে। দারিদ্র্য, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাস্তুচ্যুতি, শিশুবিয়ে এবং অনিরাপদ অভিবাসনের মতো কারণ শিশুদের ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়।

আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা—আইএলওর একটি দ্রুত মূল্যায়নেও নিখোঁজ শিশুদের বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া গেছে। পাটগ্রাম, শিবগঞ্জ ও টেকনাফের ৬১টি নিখোঁজ শিশুর ঘটনা পর্যালোচনায় দেখা যায়, ৬১ শতাংশ ছেলে এবং ৩৯ শতাংশ মেয়ে। ৬৭ শতাংশ শিশু বাড়ি থেকে নিখোঁজ হয়েছিল। ১৩ থেকে ১৮ বছর বয়সীদের অংশ ছিল ৫৪ শতাংশ। প্রায় অর্ধেক শিশুকে খুঁজে পাওয়া গেলেও টেকনাফে উদ্ধার হওয়া ১০ শিশুকে পরে পাচারের শিকার হিসেবে শনাক্ত করা হয়।

তবে এই তথ্য কোনোভাবেই দেশের ১৫ হাজার ৯১৭টি জিডির সঙ্গে সরাসরি মিলিয়ে দেখা যাবে না। কারণ আইএলওর মূল্যায়নটি সীমিত কয়েকটি এলাকার ঘটনা নিয়ে করা হয়েছে।

অজ্ঞাত মরদেহের তথ্যও জরুরি

শিশু নিখোঁজের পরিণতি খুঁজে বের করার ক্ষেত্রে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো অজ্ঞাতপরিচয় মরদেহের তথ্য

কোনো নিখোঁজ শিশুর মরদেহ উদ্ধার হলেও পরিচয় শনাক্ত না হলে এবং সেই তথ্য নিখোঁজ শিশুদের ডেটাবেসের সঙ্গে মিলিয়ে দেখার ব্যবস্থা না থাকলে একটি কেস বছরের পর বছর অমীমাংসিত থেকে যেতে পারে।

তাই বিশেষজ্ঞরা একটি জাতীয় পর্যায়ের সমন্বিত ‘ম্যাচিং সিস্টেম’ তৈরির ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন। সেখানে নিখোঁজ শিশুর ছবি, বয়স, লিঙ্গ, শারীরিক বৈশিষ্ট্য, সর্বশেষ অবস্থান ও পরিবারের যোগাযোগের তথ্য যেমন থাকবে, তেমনি হাসপাতাল, মর্গ ও উদ্ধারকেন্দ্রে পাওয়া অজ্ঞাতপরিচয় শিশু বা মরদেহের তথ্যও থাকবে।

একই কেসের সঙ্গে শিশুর পরবর্তী প্রতিটি ঘটনা যুক্ত করার ব্যবস্থা থাকলে বোঝা সম্ভব হবে—কত শিশু হারিয়েছিল, কতজন ফিরে এসেছে, কতজন উদ্ধার হয়েছে, কতজন অপহরণ বা পাচারের শিকার হয়েছে এবং শেষ পর্যন্ত কতজন এখনো নিখোঁজ।

বাংলাদেশে বর্তমানে সবচেয়ে বড় ঘাটতি সম্ভবত নিখোঁজের সংখ্যা নয়, বরং নিখোঁজের পরিণতির হিসাব

১৫ হাজার ৯১৭টি জিডি তাই শুধু একটি বড় সংখ্যা নয়; এটি দেশের শিশু নিরাপত্তা ও তথ্য ব্যবস্থাপনার সামনে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নও তুলে দিয়েছে—থানায় নিখোঁজের খবর নথিভুক্ত হওয়ার পর সেই শিশুটির কী হলো, তার উত্তর কি রাষ্ট্রের কাছে আছে?