ভয়েস অব পিপল ।। জনগণের কণ্ঠস্বর, বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি

ইসলামের দৃষ্টিতে একজন ভালো অতিথির আচরণ কেমন হবে?

ইসলামের দৃষ্টিতে একজন ভালো অতিথির আচরণ কেমন হবে?

ধর্ম ডেস্ক, ভয়েস অব পিপল :

কারও বাড়িতে বেড়াতে যাওয়া সামাজিক সৌজন্যের অংশ। তবে ইসলাম এ ক্ষেত্রে স্পষ্ট কিছু আদব নির্ধারণ করেছে। আত্মীয়ের বাড়ি, বন্ধুর বাড়ি কিংবা পরিচিতজনের বাসায় যাওয়া-আসার মাধ্যমে মানুষের পারস্পরিক সম্পর্কও দৃঢ় হয়। তবে ইসলাম শুধু অতিথি হয়ে যাওয়ার অনুমতিই দেয়নি; অন্যের বাড়িতে গিয়ে কীভাবে আচরণ করতে হবে, কোথায় থামতে হবে এবং কোন সীমা অতিক্রম করা যাবে না—সেসব বিষয়েও সুস্পষ্ট আদব শিক্ষা দিয়েছে। বিশেষ করে অনুমতি ছাড়া প্রবেশ করা এবং আড়ি পেতে অন্যের ব্যক্তিগত কথা শোনা—দুটিই গুরুতর অনৈতিক আচরণ।

বিশেষ করে অন্যের ব্যক্তিগত পরিসরে অনধিকার প্রবেশ, অনুমতি ছাড়া ঘরে ঢুকে পড়া, ঘরের ভেতর উঁকি দেওয়া কিংবা কেউ কারও সঙ্গে ব্যক্তিগতভাবে কথা বলার সময় আড়ালে দাঁড়িয়ে তা শোনা ইসলামী নৈতিকতার পরিপন্থী। কোরআন ও হাদিসে মানুষের ঘর, ব্যক্তিগত জীবন ও গোপনীয়তার প্রতি সম্মান দেখানোর ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

অনুমতি ছাড়া প্রবেশ নয়

আল্লাহ বলেন,

“তোমরা নিজেদের ঘর ছাড়া অন্য কোনো ঘরে প্রবেশ করো না, যতক্ষণ না তোমরা অনুমতি নাও এবং তার অধিবাসীদের সালাম দাও।”

সূরা আন-নূর, ২৪:২৭

অর্থাৎ পরিচিত বা আত্মীয়ের বাড়ি হলেও আগে সালাম দিয়ে অনুমতি নিতে হবে। দরজা খোলা থাকলেও অনুমতি ছাড়া ঢোকা যাবে না।

অনুমতি না পেলে ফিরে আসতে হবে

আল্লাহ আরও বলেন,

“যদি তোমাদের বলা হয়, ‘ফিরে যাও’, তাহলে ফিরে যাও। এটাই তোমাদের জন্য অধিক পবিত্র।”

সূরা আন-নূর, ২৪:২৮

রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন,

“তোমাদের কেউ যখন তিনবার অনুমতি চায় এবং তাকে অনুমতি দেওয়া না হয়, তাহলে সে যেন ফিরে যায়।”

— **সহিহ মুসলিম, ২১৫৩c

সুতরাং বারবার দরজায় কড়া নাড়া, কলিংবেল বাজানো কিংবা ফোন করে বিরক্ত করা ইসলামী আদব নয়।

আড়ি পেতে অন্যের কথা শোনা নিষেধ

কারও বাড়িতে গিয়ে সবচেয়ে গুরুতর যে অন্যায়গুলোর একটি করা হয়, তা হলো—অন্যরা ব্যক্তিগতভাবে কথা বলছে, আর আড়ালে দাঁড়িয়ে সেই কথা শোনা।

রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন,

“যে ব্যক্তি কোনো সম্প্রদায়ের কথাবার্তা শোনে, অথচ তারা তা অপছন্দ করে, তার কানে গলিত সীসা ঢেলে দেওয়া হবে।”

আল-আদাবুল মুফরাদ, ১১৬৭

অর্থাৎ কেউ যে কথা আপনাকে শোনাতে চায় না, সেটি গোপনে শোনার চেষ্টা করা নিছক কৌতূহল নয়; এটি ইসলামে কঠোরভাবে নিন্দিত কাজ।

কোরআনেও আল্লাহ বলেন,

“তোমরা একে অপরের গোপন বিষয় অনুসন্ধান করো না।”

সূরা আল-হুজুরাত, ৪৯:১২

তাই কারও ঘরে গিয়ে কে কী বলছে, কার সঙ্গে কী আলোচনা করছে—তা জানার জন্য দরজার আড়ালে, জানালার পাশে বা অন্য কোনো স্থানে দাঁড়িয়ে শোনা থেকে অবশ্যই বিরত থাকতে হবে।

দাওয়াতের পর অযথা দীর্ঘক্ষণ বসে থাকা উচিত নয়

কোরআনে রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর ঘরে দাওয়াতের প্রসঙ্গে আল্লাহ বলেন—

“তোমরা যখন খেয়ে নেবে, তখন চলে যেয়ো এবং কথাবার্তায় মশগুল হয়ে বসে থেকো না।”

সূরা আল-আহযাব, ৩৩:৫৩

এই আয়াত বিশেষ একটি প্রেক্ষাপটে নাজিল হলেও এর মধ্যে অতিথি হিসেবে অন্যের বাড়িতে গিয়ে অযথা দীর্ঘ সময় অবস্থান না করার গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক শিক্ষা রয়েছে।

অতিথির উচিত গৃহকর্তার সময় ও সুবিধার প্রতি খেয়াল রাখা।

সুতরাং ইসলামের শিক্ষা হচ্ছে:

কারও বাড়িতে গেলে একজন মুসলিমের উচিত—

প্রথমত, আগে থেকে সম্ভব হলে খবর দেওয়া।

দ্বিতীয়ত, বাড়িতে গিয়ে সালাম দেওয়া।

তৃতীয়ত, প্রবেশের আগে অনুমতি নেওয়া।

চতুর্থত, অনুমতি না পাওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করা।

পঞ্চমত, তিনবার অনুমতি চেয়েও সাড়া না পেলে ফিরে আসা।

ষষ্ঠত, বাড়ির মানুষ ফিরে যেতে বললে কোনো অভিমান বা বিরক্তি না দেখিয়ে চলে আসা।

সপ্তমত, অনুমতি পাওয়ার পরও বাড়ির ব্যক্তিগত জায়গায় অনধিকার প্রবেশ না করা।

অষ্টমত, কেউ ব্যক্তিগতভাবে কথা বললে আড়ি পেতে তা না শোনা।

নবমত, অন্যের গোপন বিষয় জানার জন্য অনুসন্ধান না করা।

দশমত, কারও ব্যক্তিগত কথা শুনে ফেললে তা অন্যের কাছে ছড়িয়ে না দেওয়া।

একাদশত, দাওয়াত বা সাক্ষাতের সময় অযথা দীর্ঘ না করা।

 রেফারেন্স :

    ১. সূরা আন-নূর, আয়াত ২৭
    ২. সূরা আন-নূর, আয়াত ২৮
    ৩. সূরা আন-নূর, আয়াত ২৯
    ৪. সূরা আল-হুজুরাত, আয়াত ১২
    ৫. সূরা আল-আহযাব, আয়াত ৫৩
    ৬. সহিহ মুসলিম, হাদিস ২১৫৩a
    ৭. সহিহ মুসলিম, হাদিস ২১৫৩c
    ৮. সহিহ মুসলিম, হাদিস ২১৫৩d
    ৯. আল-আদাবুল মুফরাদ, হাদিস ১১৬৭