ভয়েস অব পিপল ।। জনগণের কণ্ঠস্বর, বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি
বিজ্ঞাপনের টাকায় মধ্যস্বত্বভোগীর দাপট, সংকটে সংবাদমাধ্যম
বাংলাদেশ প্রতিনিধি, ১ সেপ্টেম্বর:
বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যমের আর্থিক সংকট নিয়ে আলোচনা যতটা হয় সাংবাদিকদের বেতন, চাকরির অনিশ্চয়তা কিংবা বিজ্ঞাপনের ঘাটতি নিয়ে, বিজ্ঞাপনের অর্থ সংবাদমাধ্যমে পৌঁছানোর আগের ধাপগুলো নিয়ে ততটা আলোচনা হয় না। অথচ বিজ্ঞাপননির্ভর সংবাদমাধ্যমের জন্য এই ব্যবস্থাই এখন বড় প্রশ্ন হয়ে উঠছে।
সাংবাদিকদের দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা ও সংশ্লিষ্ট মহলের অভিযোগ অনুযায়ী, বড় ব্র্যান্ডের বিজ্ঞাপন অনেক সময় সরাসরি সংবাদমাধ্যমে না গিয়ে বিজ্ঞাপন ও মিডিয়া এজেন্সির মাধ্যমে আসে। সেখানে মূল বিজ্ঞাপনদাতা থেকে সংবাদমাধ্যম পর্যন্ত অর্থ পৌঁছাতে একাধিক স্তর তৈরি হয়। কমিশন, মিডিয়া-বাইং, সাব-এজেন্সি ও অন্যান্য চার্জ বাদ দেওয়ার পর সংবাদমাধ্যমের হাতে শেষ পর্যন্ত কত টাকা থাকে—এ নিয়ে স্বচ্ছ তথ্যের ঘাটতি রয়েছে।
এই ব্যবস্থার কারণে বাংলাদেশের অনেক সংবাদমাধ্যম তাদের প্রকাশিত বিজ্ঞাপনের পুরো মূল্য সময়মতো পায় না বলে অভিযোগ রয়েছে। বিশেষ করে ছোট ও মাঝারি সংবাদমাধ্যমের ক্ষেত্রে কয়েক মাস বিল আটকে থাকলে তার প্রভাব সরাসরি পড়ে কর্মীদের বেতন ও প্রতিষ্ঠানের দৈনন্দিন পরিচালনায়।
বিজ্ঞাপন বাজারে প্রভাবশালী এজেন্সি
বাংলাদেশের বিজ্ঞাপন বাজারে দীর্ঘদিন ধরে প্রভাবশালী অবস্থানে রয়েছে এশিয়াটিকের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান। ১৯৬৬ সালে যাত্রা শুরু করা এশিয়াটিক পরবর্তী সময়ে বিজ্ঞাপন, মিডিয়া, যোগাযোগ ও বিনোদনসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে ব্যবসা সম্প্রসারণ করে। তাদের মিডিয়া কার্যক্রমের সঙ্গে আন্তর্জাতিক বিজ্ঞাপন নেটওয়ার্কের অংশীদারিত্বও রয়েছে।
এশিয়াটিক মাইন্ডশেয়ার নিয়ে দীর্ঘদিনের সাংবাদিকতার অভিজ্ঞতা থেকে কিছু অভিযোগ সামনে এসেছে। অভিযোগকারীদের ভাষ্য, বড় ব্র্যান্ডের বিজ্ঞাপন পাওয়ার ক্ষেত্রে সংবাদমাধ্যমগুলোকে বড় বিজ্ঞাপন এজেন্সির ওপর নির্ভর করতে হয়। ফলে বিজ্ঞাপন বাজারে প্রভাবশালী কোনো এজেন্সির সঙ্গে সম্পর্ক খারাপ হলে বিজ্ঞাপন পাওয়ার ক্ষেত্রে সংবাদমাধ্যম সমস্যায় পড়তে পারে।
তবে এ ধরনের অভিযোগের সবগুলো স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর বক্তব্য ছাড়া কোনো নির্দিষ্ট অনিয়মকে প্রতিষ্ঠিত সত্য হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
কমিশন নিয়ে স্বচ্ছতার প্রশ্ন
বিজ্ঞাপন ব্যবসায় এজেন্সির কমিশন নেওয়া আন্তর্জাতিকভাবেই প্রচলিত। বিজ্ঞাপনদাতার হয়ে প্রচার পরিকল্পনা তৈরি, বিভিন্ন মাধ্যমে বিজ্ঞাপন কেনা, বাজার বিশ্লেষণ ও প্রচারণার কার্যকারিতা মূল্যায়নের বিনিময়ে এজেন্সি পারিশ্রমিক পেয়ে থাকে।
বাংলাদেশে প্রশ্ন উঠছে অন্য জায়গায়—এই কমিশনের কাঠামো কতটা স্বচ্ছ এবং বিজ্ঞাপনের অর্থের কত অংশ সংবাদমাধ্যম পর্যন্ত পৌঁছাচ্ছে।
সংশ্লিষ্টদের কেউ কেউ দাবি করছেন, একটি বিজ্ঞাপনের অর্থ থেকে এজেন্সি ও মধ্যবর্তী বিভিন্ন পক্ষের কমিশন বাদ দেওয়ার পর সংবাদমাধ্যমের হাতে মূল বরাদ্দের তুলনায় অনেক কম অর্থ থাকে। কোথাও কোথাও সাব-এজেন্সি ব্যবস্থার মাধ্যমেও অর্থ ভাগ হওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
তবে বাজারজুড়ে একই হারে কমিশন কাটা হয়—এমন কোনো নির্ভরযোগ্য সরকারি তথ্য প্রকাশ্যে নেই। ফলে নির্দিষ্ট কোনো শতাংশকে সার্বজনীন বাস্তবতা হিসেবে দেখার আগে স্বাধীন যাচাই প্রয়োজন।
বিল আটকে গেলে সংকট বাড়ে সংবাদমাধ্যমে
বিজ্ঞাপন প্রকাশের পর বিল পরিশোধে দীর্ঘসূত্রতার অভিযোগটিও নতুন নয়। কোনো বিজ্ঞাপনের বিল কয়েক মাস আটকে থাকলে বড় প্রতিষ্ঠান হয়তো তা সামাল দিতে পারে। কিন্তু সীমিত আয়ের সংবাদমাধ্যমের জন্য পরিস্থিতি ভিন্ন।
একটি সংবাদমাধ্যমের মাসিক ব্যয়ের বড় অংশ কর্মীদের বেতন। এর সঙ্গে অফিস ভাড়া, বিদ্যুৎ, মুদ্রণ, প্রযুক্তি, পরিবহন ও সংবাদ সংগ্রহের ব্যয় রয়েছে। বিজ্ঞাপনের অর্থ সময়মতো না এলে নগদ অর্থের সংকট তৈরি হয়। আর তার প্রথম চাপ পড়ে কর্মীদের ওপর।
ফলে একই সময়ে কোনো সংবাদমাধ্যমে বিজ্ঞাপন প্রকাশিত হলেও সাংবাদিকদের বেতন বকেয়া থাকার ঘটনা ঘটতে পারে। এই বাস্তবতা সংবাদমাধ্যমের অর্থনৈতিক কাঠামো নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তৈরি করছে।
সাংবাদিকের শ্রম, অর্থ পায় অন্যরা?
বাংলাদেশের সাংবাদিকতা পেশায় দীর্ঘদিনের একটি অভিযোগ হলো—সংবাদ তৈরিতে সাংবাদিকরা যে পরিমাণ শ্রম দেন, তার তুলনায় তাদের আয় খুবই কম। একজন প্রতিবেদক দিনের পর দিন মাঠে কাজ করেন, তথ্য সংগ্রহ করেন, যাচাই করেন, রাত পর্যন্ত অফিস করেন। কিন্তু সংবাদ প্রকাশের পর সেই সংবাদমাধ্যমের আয় কীভাবে বণ্টিত হচ্ছে, সে বিষয়ে তার জানার সুযোগ খুবই সীমিত।
এখানেই বিজ্ঞাপন ব্যবস্থার স্বচ্ছতার প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
একটি সংবাদমাধ্যম যদি বিজ্ঞাপন থেকে ১০০ টাকা আয় করে, সেই অর্থের কত অংশ সাংবাদিকদের বেতন ও সংবাদ সংগ্রহে ব্যয় হচ্ছে, কত অংশ এজেন্সি কমিশন হিসেবে যাচ্ছে এবং কত অংশ অন্যান্য খাতে থাকছে—এসব তথ্য সাধারণত প্রকাশ্যে আসে না।
ফলে সংবাদমাধ্যমের আর্থিক সংকটের প্রকৃত কারণ নির্ধারণ করাও কঠিন হয়ে পড়ে।
প্রয়োজন নীতিমালা
বাংলাদেশের বিজ্ঞাপন বাজারকে আরও স্বচ্ছ করতে সংশ্লিষ্টদের মধ্যে একটি কার্যকর নীতিমালার দাবি উঠছে। বিজ্ঞাপন এজেন্সির কমিশন, সাব-এজেন্সির ভূমিকা, বিল পরিশোধের সময়সীমা এবং স্বার্থের সংঘাত—সবকিছু স্পষ্ট করার প্রয়োজন রয়েছে।
বিশেষ করে সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে যুক্ত কোনো ব্যক্তি একই সঙ্গে বিজ্ঞাপন সরবরাহকারী বা সাব-এজেন্সির ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত থাকলে সেখানে স্বার্থের সংঘাতের বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা দরকার।
একই সঙ্গে বিজ্ঞাপনের বিল পরিশোধের জন্য একটি নির্দিষ্ট সময়সীমা থাকলে সংবাদমাধ্যমের নগদ অর্থের সংকটও কমতে পারে।
শুধু এজেন্সি নয়, পুরো ব্যবস্থার সংস্কার দরকার
বাংলাদেশের বিজ্ঞাপন বাজারে বিজ্ঞাপন এজেন্সির প্রয়োজন রয়েছে। একটি বড় ব্র্যান্ডের প্রচারণা পরিকল্পনা, বিভিন্ন গণমাধ্যমে বিজ্ঞাপন বণ্টন এবং বাজার বিশ্লেষণে তাদের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ।
তাই সমাধান এজেন্সি ব্যবস্থা তুলে দেওয়া নয়; বরং পুরো ব্যবস্থাকে জবাবদিহির মধ্যে আনা।
বিজ্ঞাপনের অর্থ কোথা থেকে আসছে, কোন পর্যায়ে কত কমিশন যাচ্ছে, সংবাদমাধ্যমের বিল কত দিনে পরিশোধ হচ্ছে এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর মধ্যে কোনো গোপন আর্থিক সম্পর্ক রয়েছে কি না—এসব বিষয়ে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা গেলে বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যমের আর্থিক সংকট মোকাবিলায় তা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
কারণ একটি স্বাধীন সংবাদমাধ্যম শুধু সম্পাদক বা সাংবাদিকের ওপর দাঁড়িয়ে থাকে না। তার পেছনে প্রয়োজন একটি সুস্থ আর্থিক কাঠামোও। সেই কাঠামো যদি অস্বচ্ছ হয়, তাহলে তার বোঝা শেষ পর্যন্ত গিয়ে পড়ে সংবাদকর্মীদের ওপর।
বাংলাদেশে সাংবাদিকদের ন্যায্য বেতন ও সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে হলে তাই শুধু নিউজরুমের দিকে তাকালেই হবে না। বিজ্ঞাপনের টাকা যে পথে সংবাদমাধ্যমে পৌঁছায়, সেই পথটিও আলোয় আনতে হবে।