ভয়েস অব পিপল ।। জনগণের কণ্ঠস্বর, বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি

কুষ্টিয়া থেকে শাহজাদপুর: রবীন্দ্রনাথের স্মৃতির মাটিতে দুটি বিশ্ববিদ্যালয়

কুষ্টিয়া থেকে শাহজাদপুর: রবীন্দ্রনাথের স্মৃতির মাটিতে দুটি বিশ্ববিদ্যালয়

ভয়েস অব পিপল প্রতিবেদন, ১ সেপ্টেম্বর:

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক শুধু কবিতা, গান কিংবা স্মৃতিবিজড়িত জমিদারবাড়ির সম্পর্ক নয়। বাংলার নদী, মাঠ, কৃষক, জেলে, দরিদ্র প্রজা, গ্রামের নারী-পুরুষ—এই মানুষগুলোর জীবনও তাঁর চিন্তা ও সৃষ্টির একটি বড় অংশ হয়ে উঠেছিল।

জমিদারি পরিচালনার কাজে তিনি পূর্ববঙ্গের শিলাইদহ, শাহজাদপুর ও পতিসরে দীর্ঘ সময় কাটিয়েছেন। এই সময় তিনি কাছ থেকে দেখেছেন গ্রামের দারিদ্র্য, কৃষকের ঋণগ্রস্ততা, শিক্ষার অভাব, স্বাস্থ্যসেবার সংকট এবং সামাজিক পশ্চাৎপদতা। সেই অভিজ্ঞতা তাঁকে শুধু সাহিত্যিকভাবে সমৃদ্ধ করেনি; গ্রামীণ সমাজকে কীভাবে আত্মনির্ভর করে তোলা যায়, সেই চিন্তারও জন্ম দিয়েছে।

আজ সেই স্মৃতিবিজড়িত ভূখণ্ডে তাঁর নামে দাঁড়িয়ে আছে দুটি বিশ্ববিদ্যালয়—কুষ্টিয়ার রবীন্দ্র মৈত্রী বিশ্ববিদ্যালয় এবং সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুরের রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ

একটি বেসরকারি, অন্যটি সরকারি। কিন্তু দুটির সঙ্গেই জড়িয়ে আছে রবীন্দ্রনাথের স্মৃতি, শিক্ষা-ভাবনা, মানবিকতা ও এই অঞ্চলের মানুষের সঙ্গে তাঁর দীর্ঘ সম্পর্ক।

শিলাইদহ থেকে শাহজাদপুর—রবীন্দ্রনাথের পূর্ববঙ্গ

রবীন্দ্রনাথের পূর্ববঙ্গের জমিদারি জীবন শুরু হয় মূলত জমিদারি দেখাশোনার দায়িত্ব পালনের মধ্য দিয়ে। তিনি শিলাইদহ, শাহজাদপুর, পতিসরসহ বিভিন্ন এলাকায় যাতায়াত করতেন। এই সময় তিনি গ্রামের সাধারণ মানুষের জীবন খুব কাছ থেকে পর্যবেক্ষণ করেন। এই অভিজ্ঞতা তাঁর সাহিত্যকেও গভীরভাবে প্রভাবিত করে।

শিলাইদহে পদ্মার তীর, শাহজাদপুরে গ্রামীণ জনপদ আর পতিসরে নাগর নদীর পরিবেশ—সব মিলিয়ে পূর্ববঙ্গ তাঁর কাছে হয়ে ওঠে জীবন্ত মানুষের এক বিশাল পাঠশালা।

এই অভিজ্ঞতা থেকেই তিনি বুঝতে পারেন, গ্রামের উন্নয়ন শুধু ওপর থেকে সাহায্য দিয়ে সম্ভব নয়। দরকার শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষির আধুনিকায়ন, সমবায়, সহজ ঋণ এবং মানুষের নিজের শক্তিকে কাজে লাগানোর সুযোগ।

বাংলাপিডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, শিলাইদহেই তিনি গ্রামোন্নয়ন ও আধুনিক কৃষিপদ্ধতি নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা শুরু করেন। পরবর্তী সময়ে পতিসরে এসব উদ্যোগ আরও বাস্তব রূপ পায়। শিলাইদহে তিনি পুত্রবধূ প্রতিমা দেবীর নামে একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ও প্রতিষ্ঠা করেন।

শিলাইদহে জমিদার, কিন্তু ভাবনায় সমাজকর্মী

রবীন্দ্রনাথ জমিদার পরিবারের সন্তান ছিলেন। কিন্তু জমিদারি পরিচালনার সময় প্রজাদের জীবনযাত্রা তাঁকে ভাবিয়েছে।

বাংলাপিডিয়ার রবীন্দ্রনাথ-জীবনীতে উল্লেখ আছে, দরিদ্র প্রজাদের দুর্ভোগ কমাতে তিনি শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পানি সরবরাহ, রাস্তা নির্মাণ ও মেরামত এবং কৃষকদের ঋণের বোঝা কমানোর মতো নানা উদ্যোগ নিয়েছিলেন। তাঁর ‘স্বদেশী সমাজ’ প্রবন্ধেও গ্রামীণ পুনর্গঠন, গণশিক্ষা ও সমবায়ের মাধ্যমে সমাজকে আত্মনির্ভর করার ধারণা পাওয়া যায়।

অর্থাৎ রবীন্দ্রনাথের কাছে সমাজসেবা ছিল বিচ্ছিন্ন কিছু দান-খয়রাত নয়। তিনি একটি সমন্বিত গ্রাম-উন্নয়ন ব্যবস্থা কল্পনা করেছিলেন।

এই চিন্তার বাস্তব প্রয়োগ সবচেয়ে স্পষ্টভাবে দেখা যায় পতিসরে।

পতিসর: রবীন্দ্রনাথের পল্লি উন্নয়নের পরীক্ষাগার

পতিসর ছিল নাগর নদীর তীরে ঠাকুর পরিবারের জমিদারির একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। রবীন্দ্রনাথ প্রথম সেখানে যান ১৮৯১ সালের জানুয়ারিতে।

এই পতিসরেই তিনি একের পর এক সামাজিক ও অর্থনৈতিক উদ্যোগ গ্রহণ করেন।

 সেখানে তিনি—

  • প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন;
  • রথীন্দ্রনাথ উচ্চ বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন;
  • দাতব্য চিকিৎসালয় স্থাপন করেন;
  • ১৯০৫ সালে পতিসর কৃষিব্যাংক প্রতিষ্ঠা করেন;
  • কৃষির উন্নয়নে আধুনিক পদ্ধতির চাষাবাদ চালু করার চেষ্টা করেন;
  • কৃষি, তাঁত ও মৃৎশিল্পের সমবায় সংগঠন গড়ে তোলেন।

এখানেই রবীন্দ্রনাথের সমাজচিন্তার একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য দেখা যায়। তিনি শুধু দরিদ্র মানুষকে সাহায্য করতে চাননি; তাঁদের উৎপাদনক্ষমতা ও অর্থনৈতিক শক্তি বাড়াতে চেয়েছিলেন।

কৃষক যেন মহাজনের ওপর নির্ভরশীল না হন, গ্রামের মানুষ যেন নিজেরাই উৎপাদন ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করতে পারেন—এই ধারণাই তাঁর পল্লি উন্নয়ন কর্মসূচির কেন্দ্রে ছিল।

এমনকি নোবেল পুরস্কারের অর্থের একটি বড় অংশও তিনি গ্রামীণ উন্নয়নে ব্যবহার করেন। বাংলাপিডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, পতিসর কৃষিব্যাংকে তিনি এক লাখ টাকা দিয়েছিলেন, যা তিনি আর ফেরত পাননি।

কৃষকের জন্য ব্যাংক—সেই সময়ের এক ব্যতিক্রমী চিন্তা

আজ কৃষি ব্যাংক, ক্ষুদ্রঋণ, সমবায় কিংবা কৃষকের প্রাতিষ্ঠানিক ঋণ পাওয়ার বিষয়টি পরিচিত। কিন্তু উনিশ শতকের শেষভাগ ও বিশ শতকের শুরুতে গ্রামের দরিদ্র কৃষকের জন্য এমন ব্যবস্থা ছিল খুবই সীমিত।

রবীন্দ্রনাথ তখন বুঝেছিলেন, কৃষকের সবচেয়ে বড় সমস্যার একটি হলো অর্থের অভাব এবং মহাজনি ঋণের ওপর নির্ভরতা।

তাই কৃষি উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি তিনি ঋণের বিকল্প ব্যবস্থাও তৈরি করতে চেয়েছিলেন।

পতিসর কৃষিব্যাংক এবং সমবায় উদ্যোগ সেই চিন্তারই বাস্তব রূপ।

এখানে রবীন্দ্রনাথের চিন্তার সঙ্গে আধুনিক উন্নয়ন অর্থনীতির একটি মিলও দেখা যায়—মানুষকে শুধু সাহায্য না করে এমন প্রতিষ্ঠান তৈরি করা, যাতে মানুষ নিজের অর্থনৈতিক সক্ষমতা বাড়াতে পারে।

শিক্ষা ও স্বাস্থ্যকে একই পরিকল্পনায় দেখা

রবীন্দ্রনাথের পল্লি উন্নয়ন পরিকল্পনায় শিক্ষা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

শিলাইদহে বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি পতিসরে প্রাথমিক ও উচ্চশিক্ষার উদ্যোগ নেওয়া হয়। একই সঙ্গে প্রতিষ্ঠা করা হয় দাতব্য চিকিৎসালয়।

অর্থাৎ একজন গ্রামের মানুষকে শুধু শিক্ষিত করলেই হবে না; তাকে সুস্থও থাকতে হবে। আবার শুধু চিকিৎসা দিলেও হবে না; তার আয় ও উৎপাদনক্ষমতা বাড়াতে হবে।

এই সমন্বিত চিন্তাই রবীন্দ্রনাথের পল্লি উন্নয়ন ভাবনার বিশেষত্ব।

শাহজাদপুর: কবির আরেক স্মৃতিবিজড়িত ঠিকানা

কুষ্টিয়ার শিলাইদহের পাশাপাশি সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুরও রবীন্দ্রনাথের পূর্ববঙ্গ জীবনের গুরুত্বপূর্ণ স্থান।

সিরাজগঞ্জ জেলা পুলিশের সরকারি তথ্য অনুযায়ী, রবীন্দ্রনাথ ১৮৯০ থেকে ১৮৯৬ সাল পর্যন্ত মোট প্রায় সাত বছর শাহজাদপুরে জমিদারি কাজের সূত্রে অবস্থান করেন। শাহজাদপুরের রবীন্দ্র কাছারি বাড়ি আজও সেই সময়ের স্মৃতি বহন করছে।

শাহজাদপুরে তাঁর অবস্থান শুধু জমিদারি কাজের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। এখানকার প্রকৃতি ও মানুষের জীবন তাঁর সাহিত্যেও প্রভাব ফেলেছিল।

তাঁর পূর্ববঙ্গের অভিজ্ঞতা নিয়ে লেখা চিঠি ও গল্পে গ্রামীণ মানুষের জীবন, প্রকৃতি, দুঃখ-কষ্ট এবং সামাজিক বাস্তবতার যে প্রতিফলন দেখা যায়, তার পেছনে এই অঞ্চলগুলোর প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা গুরুত্বপূর্ণ ছিল।

সেই শাহজাদপুরেই সরকারি রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়

রবীন্দ্রনাথের স্মৃতিবিজড়িত শাহজাদপুরে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ

এটি একটি সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় এবং বাংলাদেশের ৪০তম পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়। ২০১৬ সালের ২৬ জুলাই জাতীয় সংসদে ‘রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ আইন, ২০১৬’ পাস হয়।

আইনের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত এই বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্দেশ্যের মধ্যে রয়েছে উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার মাধ্যমে জাতীয় প্রয়োজন পূরণ এবং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের অমর সৃষ্টি ও ঐতিহ্যকে সংরক্ষণ ও চর্চা করা। বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব তথ্যেও এই উদ্দেশ্য স্পষ্টভাবে তুলে ধরা হয়েছে।

কবে শুরু হয় শিক্ষা কার্যক্রম?

আইন পাসের পর বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক কার্যক্রম শুরু হয় ২০১৮ সালে, ২০১৭-১৮ শিক্ষাবর্ষে।

প্রথমদিকে দুটি অনুষদের অধীনে তিনটি বিভাগে ১১৩ জন শিক্ষার্থী নিয়ে স্নাতক পর্যায়ের শিক্ষা কার্যক্রম শুরু হয়েছিল। বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়টি চারটি অনুষদের অধীনে পাঁচটি বিভাগে শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করছে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান তথ্য অনুযায়ী, এর চার অনুষদ ও পাঁচ বিভাগ হলো—

কলা অনুষদ

  • বাংলা

সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদ

  • অর্থনীতি
  • সমাজবিজ্ঞান

ব্যবসায় শিক্ষা অনুষদ

  • ম্যানেজমেন্ট

সংগীত অনুষদ

  • সংগীত

এই কাঠামো থেকে বোঝা যায়, বিশ্ববিদ্যালয়টি রবীন্দ্রনাথের সাহিত্য ও সংস্কৃতির পাশাপাশি সমাজ, অর্থনীতি ও ব্যবসায় শিক্ষাকেও গুরুত্ব দিচ্ছে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান পরিসর

রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়েবসাইটে বর্তমানে ২০০-এর বেশি কর্মকর্তা-কর্মচারী, ১,০০০-এর বেশি শিক্ষার্থী এবং ৩০০-এর বেশি গবেষণা ও প্রবন্ধের তথ্য দেওয়া হয়েছে।

বিশ্ববিদ্যালয়টি বর্তমানে জিএসটি গুচ্ছভুক্ত ভর্তি ব্যবস্থার মাধ্যমে শিক্ষার্থী ভর্তি করছে। ২০২৫-২৬ শিক্ষাবর্ষের ভর্তি সংক্রান্ত বিজ্ঞপ্তিও বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত হয়েছে।

শিক্ষা কার্যক্রমের পাশাপাশি গবেষণা, সেমিনার, কর্মশালা, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড এবং বিভিন্ন একাডেমিক আয়োজনও নিয়মিত হচ্ছে। ২০২৬ সালেও বিশ্ববিদ্যালয়টির ওয়েবসাইটে গবেষণা ও একাডেমিক কার্যক্রমের বিভিন্ন তথ্য প্রকাশিত হয়েছে।

স্থায়ী ক্যাম্পাসের প্রশ্ন

রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়ের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো এর স্থায়ী ক্যাম্পাস।

সিরাজগঞ্জ জেলা পুলিশের সরকারি তথ্য অনুযায়ী, শাহজাদপুর উপজেলার বুড়ি পোতাজিয়া এলাকায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জমিদারির প্রায় ২৩৬ একর জমির ওপর স্থায়ী ক্যাম্পাস নির্মাণের প্রস্তাব রয়েছে এবং অধিগ্রহণ ও নির্মাণ প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

অন্যদিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়েবসাইটে স্থায়ী ক্যাম্পাসের জন্য ঐতিহাসিকভাবে রবীন্দ্রনাথের জমিদারির সঙ্গে সম্পর্কিত ভূমির কথা তুলে ধরা হয়েছে।

এটি বাস্তবায়িত হলে বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের ঐতিহাসিক সম্পর্ক আরও দৃশ্যমান হয়ে উঠতে পারে।

কুষ্টিয়ায় আরেক বিশ্ববিদ্যালয়—রবীন্দ্র মৈত্রী

শাহজাদপুরের সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশাপাশি রবীন্দ্রনাথের স্মৃতিবিজড়িত কুষ্টিয়াতেও তাঁর নামে রয়েছে একটি বিশ্ববিদ্যালয়—রবীন্দ্র মৈত্রী বিশ্ববিদ্যালয়

এটি একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়

বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান ঠিকানা কুষ্টিয়া শহরের কোর্টপাড়ার ৯৭/৭১, রামচন্দ্র রায় চৌধুরী স্ট্রিটে।

রবীন্দ্র মৈত্রী বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক কাঠামো বর্তমানে বেশ বিস্তৃত। এর চারটি অনুষদের অধীনে একাধিক বিভাগ রয়েছে।

কলা ও সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদ

এই অনুষদের অধীনে রয়েছে—

  • ইংরেজি
  • বাংলা
  • শারীরিক শিক্ষা ও ক্রীড়া বিজ্ঞান
  • চারুকলা
  • সংগীত

প্রকৌশল অনুষদ

এখানে রয়েছে—

  • তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি
  • কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং
  • ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং
  • মাইক্রোবায়োলজি

ব্যবসায় শিক্ষা অনুষদ

  • ব্যবসায় প্রশাসন

কৃষি অনুষদ

  • কৃষি

বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব ফ্যাকাল্টি তালিকায় এই চার অনুষদ ও সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলোর উল্লেখ রয়েছে।

অর্থাৎ নামের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের সাহিত্য ও সংস্কৃতির সম্পর্ক থাকলেও প্রতিষ্ঠানটির শিক্ষা কার্যক্রম শুধু বাংলা বা সাহিত্যকেন্দ্রিক নয়। কৃষি, প্রযুক্তি, প্রকৌশল, ব্যবসা, বিজ্ঞান, চারুকলা, সংগীত ও মানবিক বিদ্যা—সব মিলিয়ে একটি বহুমাত্রিক উচ্চশিক্ষা কাঠামো গড়ে তোলার চেষ্টা রয়েছে।

কেন কুষ্টিয়ায় রবীন্দ্র মৈত্রী?

এর উত্তর খুঁজতে গেলে আবার ফিরে যেতে হয় শিলাইদহে।

শিলাইদহ কুঠিবাড়ি কুষ্টিয়ার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রবীন্দ্র-স্মৃতিচিহ্নগুলোর একটি। এখানেই রবীন্দ্রনাথ তাঁর পূর্ববঙ্গের জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সময় কাটিয়েছেন। এখানেই গ্রামীণ জীবনকে কাছ থেকে দেখে তাঁর পল্লি উন্নয়নের চিন্তার প্রাথমিক পরীক্ষাগুলো শুরু হয়েছিল।

রবীন্দ্র মৈত্রী বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব পরিচিতিতেও রবীন্দ্রনাথের সৃজনশীলতা, মানবিকতা ও সম্প্রীতির ভাবনা থেকে অনুপ্রেরণা নেওয়ার কথা তুলে ধরা হয়েছে।

এ কারণে কুষ্টিয়ায় তাঁর নামে একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা রবীন্দ্র-ঐতিহ্যকে আধুনিক উচ্চশিক্ষার সঙ্গে যুক্ত করার একটি প্রাতিষ্ঠানিক প্রয়াস হিসেবে দেখা যায়।

দুটি বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে পার্থক্য

দুটি বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম কাছাকাছি হওয়ায় অনেক সময় বিভ্রান্তি হয়। কিন্তু তাদের পরিচয় পরিষ্কার।

বিষয় রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ রবীন্দ্র মৈত্রী বিশ্ববিদ্যালয়
ধরন সরকারি বেসরকারি
অবস্থান শাহজাদপুর, সিরাজগঞ্জ কুষ্টিয়া শহর
আইনি/প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি ২০১৬ সালের আইন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে অনুমোদিত
একাডেমিক কার্যক্রম ২০১৮ সালে শুরু ২০১৭ সালে শুরু
বর্তমান একাডেমিক কাঠামো ৪ অনুষদ, ৫ বিভাগ ৪ অনুষদ, একাধিক বিভাগ
ঐতিহাসিক সম্পর্ক শাহজাদপুরে রবীন্দ্রনাথের জমিদারি জীবন শিলাইদহ ও কুষ্টিয়ায় রবীন্দ্রনাথের স্মৃতি

রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব ওয়েবসাইট অনুযায়ী এটি ২০১৬ সালের আইনে প্রতিষ্ঠিত এবং ২০১৮ সালে ১১৩ জন শিক্ষার্থী নিয়ে শিক্ষা কার্যক্রম শুরু করে। রবীন্দ্র মৈত্রী বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান ওয়েবসাইটে কুষ্টিয়ার ঠিকানা ও চার অনুষদের অধীন বিভাগগুলোর তথ্য রয়েছে।

রবীন্দ্রনাথের কাজের সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয় দুটির সম্পর্ক কোথায়?

এখানে একটি বিষয় মনে রাখা দরকার।

এই দুই বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার সরকারি ও প্রাতিষ্ঠানিক দলিলে রবীন্দ্রনাথের নাম, তাঁর স্মৃতি, শিক্ষা-গবেষণা, সাহিত্য ও ঐতিহ্য সংরক্ষণের বিষয় স্পষ্টভাবে রয়েছে। কিন্তু তাঁর সামাজিক কর্মকাণ্ডের প্রতিটি উদ্যোগের ‘স্বীকৃতিস্বরূপ’ এই দুটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়েছে—এমন সরাসরি সরকারি ঘোষণা পাওয়া যায় না।

তবে ইতিহাসের দিক থেকে দুটি বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থান অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ এগুলো এমন ভূখণ্ডে প্রতিষ্ঠিত, যেখানে রবীন্দ্রনাথ নিজে মানুষের জীবন দেখেছেন, কাজ করেছেন এবং পল্লি উন্নয়নের নানা ধারণা বাস্তবায়নের চেষ্টা করেছেন।

বিশেষ করে শিলাইদহ ও পতিসরে তাঁর কাজের সঙ্গে শিক্ষা, কৃষি, সমবায়, স্বাস্থ্য ও গ্রামীণ অর্থনীতির যে সম্পর্ক ছিল, তা আজকের উচ্চশিক্ষার সঙ্গে একটি স্বাভাবিক বুদ্ধিবৃত্তিক সংযোগ তৈরি করে।

আজকের বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছে রবীন্দ্রনাথের শিক্ষা

রবীন্দ্রনাথের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হয়তো এই—শিক্ষা শুধু চাকরি পাওয়ার উপায় নয়; শিক্ষা মানুষকে মানুষ করে, সমাজকে বদলায় এবং নিজের শক্তিকে চিনতে শেখায়।

শিলাইদহে তিনি গ্রামকে দেখেছেন। পতিসরে সেই গ্রামকে বদলানোর চেষ্টা করেছেন। শাহজাদপুরে জমিদারি পরিচালনার মাধ্যমে মানুষের জীবনকে কাছ থেকে দেখেছেন।

আর আজ সেই অঞ্চলেই বিশ্ববিদ্যালয়।

এ কারণে রবীন্দ্রনাথের নামে প্রতিষ্ঠিত বিশ্ববিদ্যালয় দুটির কাছে প্রত্যাশাটিও অন্য রকম। এগুলো শুধু ডিগ্রি দেওয়ার প্রতিষ্ঠান হবে না; গবেষণার মাধ্যমে স্থানীয় কৃষি, নদী, পরিবেশ, লোকসংস্কৃতি, গ্রামীণ অর্থনীতি ও মানুষের জীবন নিয়েও কাজ করতে পারে।

বিশেষ করে কুষ্টিয়া ও শাহজাদপুরের রবীন্দ্র-ঐতিহ্যকে কেন্দ্র করে গবেষণা হলে বাংলাদেশ ও বিশ্বে রবীন্দ্র-চর্চার নতুন ক্ষেত্র তৈরি হতে পারে।

একটি বিশ্ববিদ্যালয় যদি শিলাইদহের ইতিহাস, আরেকটি যদি শাহজাদপুরের ইতিহাসকে কেবল জাদুঘরের বিষয় না বানিয়ে বর্তমান সমাজ ও অর্থনীতির সঙ্গে যুক্ত করতে পারে, তাহলেই রবীন্দ্রনাথের উত্তরাধিকার আরও জীবন্ত হয়ে উঠবে।

কারণ রবীন্দ্রনাথের কাছে অতীত ছিল ভবিষ্যৎ নির্মাণের উপাদান।

আজ তাঁর নামে দুটি বিশ্ববিদ্যালয় সেই ভবিষ্যৎ নির্মাণের দায়িত্বই বহন করছে।

রবীন্দ্রনাথ কুষ্ঠিয়া ও সিরাজগঞ্জে কী কী সমাজসেবামূলক কাজ করেছিলেন?

রবীন্দ্রনাথের পূর্ববঙ্গের জমিদারি ও পল্লি উন্নয়ন কর্মকাণ্ডকে সংক্ষেপে কয়েকটি মূল পয়েন্টে ধরা যায়—

  • শিলাইদহে গ্রামোন্নয়ন ও আধুনিক কৃষিপদ্ধতি নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা শুরু করেন।
  • শিলাইদহে একটি প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন, যা তাঁর পুত্রবধূ প্রতিমা দেবীর নামে ছিল।
  • পতিসরে প্রাথমিক বিদ্যালয় ও রথীন্দ্রনাথ উচ্চ বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন।
  • পতিসরে দাতব্য চিকিৎসালয় প্রতিষ্ঠা করেন।
  • ১৯০৫ সালে পতিসর কৃষিব্যাংক প্রতিষ্ঠা করেন, যাতে কৃষকদের অর্থনৈতিক সমস্যার বিকল্প ব্যবস্থা তৈরি করা যায়।
  • কৃষি, তাঁত ও মৃৎশিল্পের সমবায় সংগঠন গড়ে তোলেন।
  • কৃষিতে আধুনিক পদ্ধতি ও যন্ত্র ব্যবহারের উদ্যোগ নেন, যার মধ্যে কলের লাঙল চালানোর পরীক্ষাও ছিল।
  • কৃষকদের ঋণের বোঝা কমানো ও মহাজনি নির্ভরতা কমানোর চেষ্টা করেন।
  • পল্লি সমাজে শিক্ষা বিস্তারের ওপর গুরুত্ব দেন।
  • গ্রামীণ স্বাস্থ্যসেবা উন্নয়নের উদ্যোগ নেন।
  • পানি সরবরাহ, রাস্তা নির্মাণ ও মেরামতের মতো স্থানীয় জনকল্যাণমূলক কাজের উদ্যোগ নেন।
  • মানুষকে দানের ওপর নির্ভরশীল না করে আত্মনির্ভর করে তোলার ধারণাকে গুরুত্ব দেন। তাঁর ‘স্বদেশী সমাজ’ ভাবনায় গ্রামীণ পুনর্গঠন, গণশিক্ষা ও সমবায়ের বিষয়টি বিশেষভাবে উঠে আসে।
  • নোবেল পুরস্কারের অর্থের একটি বড় অংশ পল্লি উন্নয়নে ব্যবহার করেন; বাংলাপিডিয়ার তথ্য অনুযায়ী পতিসর কৃষিব্যাংকে এক লাখ টাকা দিয়েছিলেন।

এই কারণেই শিলাইদহ, শাহজাদপুর ও পতিসরকে শুধু রবীন্দ্রনাথের সাহিত্যিক স্মৃতির জায়গা হিসেবে দেখলে তাঁর পূর্ববঙ্গের জীবনকে অসম্পূর্ণভাবে দেখা হয়। এসব জায়গায় তিনি ছিলেন জমিদার, পর্যবেক্ষক, সাহিত্যিক এবং একই সঙ্গে পল্লি সমাজের পরিবর্তন নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা একজন চিন্তাশীল মানুষ।

আর আজ সেই ভূখণ্ডের কাছাকাছি তাঁর নামে গড়ে ওঠা দুটি বিশ্ববিদ্যালয় যেন সেই দীর্ঘ ইতিহাসের আধুনিক উত্তরাধিকার—একটি রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে, অন্যটি বেসরকারি উদ্যোগে; কিন্তু দুটির কেন্দ্রেই সেই মানুষটি, যিনি একসময় বাংলার গ্রামের মানুষের জীবনকে খুব কাছ থেকে দেখেছিলেন।