ভয়েস অব পিপল ।। জনগণের কণ্ঠস্বর, বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি

কলিকালের কলধ্বনি ।। ১১৫ ।। সত্যজিৎ রায়: বাস্তবতার নীরব ভাষা ও বিশ্ব চলচ্চিত্রের একটি স্বতন্ত্র ব্যাকরণ

কলিকালের কলধ্বনি ।। ১১৫ ।। সত্যজিৎ রায়: বাস্তবতার নীরব ভাষা ও বিশ্ব চলচ্চিত্রের একটি স্বতন্ত্র ব্যাকরণ

উৎসর্গ:
“সত্যজিৎ রায়কে—যাঁর চলচ্চিত্র আমাকে দেখার নতুন চোখ শিখিয়েছে”

আজ বিশ্ব চলচ্চিত্রের ইতিহাসে এক অনন্য দিন—ভারতের মহান চলচ্চিত্রকার, লেখক ও শিল্পী সত্যজিৎ রায়ের জন্মদিন। ১৯২১ সালের ২ মে কলকাতায় জন্ম নেওয়া এই নির্মাতা শুধু ভারতীয় সিনেমাকেই নয়, বিশ্ব চলচ্চিত্রের নান্দনিক ভাষাকেও নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করেছিলেন। সত্যজিৎ রায় শুধু একজন চলচ্চিত্রকার নন, তিনি একটি দর্শন। তাঁর সিনেমা আমাদের শেখায়—মানুষের গল্পই আসল, এবং সেই গল্প বলার জন্য কোনো কৃত্রিমতা দরকার নেই।

সত্যজিৎ রায় ছিলেন বিরল ধরনের বহুমাত্রিক শিল্পী। তিনি শুধু পরিচালকই ছিলেন না—গল্পকার, চিত্রশিল্পী, সংগীত পরিচালক এবং চিত্রনাট্যকার হিসেবেও সমান দক্ষ ছিলেন। তাঁর নির্মিত ফেলুদা সিরিজ আজও বাংলা সাহিত্যের জনপ্রিয় গোয়েন্দা সাহিত্য।

আমি ব্যক্তিগতভাবে সেই নব্বইয়ের তরুণবেলায় তাঁর গভীর ভক্ত হয়ে পড়ি। বাংলাদেশ টেলিভিশনে তাঁর দু’একটা ছবি তখন দেখেছিলাম। তারপর থেকে ভিডিও ক্যাসেট কিনে কিনে তাঁর সব ছবি দেখা শেষ করি। তখন আমাকে তাঁর মতো সিনেমা পরিচালক হওয়ার ঝোঁক মাথায় চেপে বসে। তাঁর ওপর বিভিন্ন বইপত্র কিনে পড়া শুরু করলাম। এভাবে সত্যজিতের সিনেমা দেখে আর বইপত্র পড়ে ‘দৈনিক সিলেটের ডাক’-এ লেখা শুরু করলাম ধারাবাহিক কলাম, শুধু সত্যজিতকে নিয়ে। প্রতি সপ্তাহে একটা করে লেখা যেত। শিরোনাম ছিল ‘সত্যজিৎ রায় ও তাঁর ধ্রুপদি চলচ্চিত্র’। মনে হয় প্রায় বছরখানেক লেগেছিল সব চলচ্চিত্র নিয়ে বিশ্লেষণ করে কলাম লিখতে। অতি দুঃখের বিষয়, ঐ লেখাসহ সিলেটের ডাকে প্রকাশিত প্রায় লেখাই হারিয়ে গেছে। হয়তো ৯৫-৯৬ সালের পত্রিকা খুঁজে বের করতে পারলে সব লেখা দিয়ে একটা ভালো বই হতে পারত।

সেই বয়সে অনেকেই অভিনেতা হতে চায়। আমার অভিনয়ের দিকে তেমন ঝোঁক ছিল না। তবে ঢাকায় যাওয়া-আসার সুবাধে একবার এফডিসি থেকে অভিনয় করার অফার এসেছিল ডাকে বাসার ঠিকানায়। ছবির নাম ছিল ‘গোলামীর জিঞ্জির’। ভাগ্যিস সেই গোলামীর জিঞ্জিরে অভিনয় করতে যাইনি। নইলে হয়তো আজও সেই গোলামির জিঞ্জিরে আটকা পড়ে থাকতে হতো। আর বিলাত আসা হতো না। হয়তো শেষ বয়সে পৌছালে দু:স্থ শিল্পী হয়ে ভিক্ষা চাইতে হতো সরকারের কাছে ! এই তো দেখছি গত কয়েক দশক থেকে।

যা বলছিলাম, পরিচালক হওয়ার বাসনা নিয়ে তখন মনে মনে ঘুরি। এদিকে কলাম, ফিচার লেখাও শুরু করেছি সেই সময়। তখন বিভিন্ন কাজে বা চাকরির ইন্টারভিউ দিতে প্রায় ঢাকায় যেতে হতো। এভাবে লেখালেখির সুবাদে চিত্রতারকাদের সাক্ষাৎকার নিতে মনস্থ করলাম। ভেতরে ইচ্ছে—যদি পরিচালক হওয়ার সুযোগ পাওয়া যায়। এভাবে কয়েক বছর পরে ‘ঢাকা ফিল্ম ইনস্টিটিউট, উত্তরা’-তে ভর্তি হলাম চলচ্চিত্র পরিচালনা শেখার জন্য। প্রতি শনি-রবিবারে সিলেট থেকে ঢাকায় যেতাম কোর্স করতে। সেই ডিপ্লোমা কোর্সের সনদ এখনও আছে।

প্রায় সমসাময়িককালে ইন্টারভিউ নিয়েছিলাম নায়ক সোহেল রানা, অভিনেতা ইনাম আহমেদ, অভিনেতা খলিল, হেলাল খানদের। এগুলো ‘সিলেটের ডাক’, ‘দৈনিক বাংলা বাজার’ ইত্যাদিতে প্রকাশিত হয়েছিল। এর মধ্যে অভিনেতা ইনাম আহমেদের সঙ্গে প্রায় পারিবারিক ঘনিষ্ঠতা হয়ে যায়। উনি আমার সিলেটের বাসায়ও একদিন বেড়াতে আসেন। উনার শ্বশুরবাড়ি বালুচরে নিয়ে যান। তখন আমার দায়িত্ব ছিল উনার আত্মজীবনী ‘সোনাল অতীত’ সম্পাদনা করার ও অনু লেখনীর। ঢাকায় গেলেই তাঁর শাহজাহানপুরের বাসায় অবধারিতভাবে দেখা করতে হতো। ‘চাচা’ ডাকতাম উনাকে আর অভিনেতা খলিলকে আঙ্কেল। তো ইনাম চাচা একদিন বেশ রাগ করে বললেন, ‘আমি ইচ্ছে করলে পুরোনো পরিচালকদের বলে দিতে পারি। কিন্তু বলব না। কারণ আজ চলচ্চিত্রের সেই অবস্থা নেই। আমাদের সময় সবাই সিনিয়রদের মান্য করতো। আমি আউটডোর সুটিং এ গেলে তখনকার সব নায়ক নায়িকা আমাকে বাবার মতো শ্রদ্ধ করতো। একটা কথা বললে তা পালন করতো। নায়ক রহমান, রাজ্জাক, সোহেল রানা, আলমগীর, ফারুক, শাবানা, ববিতা, রোজিনাসহ এরা সবাই আমাকে বাবার মতো মনে করতো। তোমার মতো শিক্ষিত, মার্জিত, ভদ্র ছেলে এখনকার চলচ্চিত্রে কাজ করতে পারবে না। তোমাকে নায়িকার পায়ে জুতা পরিয়ে দিতে হবে প্রথম প্রথম, ধমক শুনতে হবে সবার। তুমি স্বাধীনচেতা ছেলে এসব পারবে না। এফডিসি আজ বে..না’’ ইত্যাদি। এসব কথা বলেছিলেন ৯৬ সালের দিকে তাঁর ঢাকার বাসায় বসে। সব শুনে চলচ্চিত্র পরিচালক হওয়ার ইচ্ছা আস্তে আস্তে অবদমিত হতে থাকে। 

সত্যজিৎ, মৃণাল সেন, ঋত্বিক ঘটককে নিয়ে আমার একটি গ্রন্থ লেখা অনেক আগেই শেষ। একটু ঘষামাজা করার পর প্রকাশ করার ইচ্ছে আছে। সমস্যা হচ্ছে, এ ধরনের গবেষণাধর্মী বই পড়ার ও কেনার মতো বাঙালি তেমন একটা নেই ব্রিটেনে বা বাংলাদেশেও। এখন তো মানুষ দেখছি, বই-ই পড়তে চায় না। সবাই ফেসবুক নিয়ে ব্যস্ত। তাই বই ছাপাতে গিয়ে হই চিন্তাগ্রস্ত। ব্যক্তিগত প্রসঙ্গ তাহলে আজ থাক, সত্যজিৎ নিয়ে আলোচনা হোক।

আসলে বিশ্ব চলচ্চিত্রে সত্যজিতের অবস্থান এতটাই উচ্চ যে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম The Guardian তাঁকে নিয়ে লিখেছে—
“Not to see Ray’s films was like not seeing the sun or the moon.”

এটি কেবল প্রশংসা নয়, বরং তাঁর চলচ্চিত্রের মানবিকতা ও সার্বজনীনতার এক গভীর স্বীকৃতি।

সত্যজিৎ রায়ের চলচ্চিত্র ছিল মূলত ভারতীয় বাস্তবতার শিল্পভাষা। তিনি যে ধারার সূচনা করেন, সেটি পরে “Parallel Cinema” নামে পরিচিত হয়। Turner Classic Movies (TCM) তাঁর জন্মশতবার্ষিকী উপলক্ষে লিখেছিল—
“Ray created a cinema of simple observation… dealing with social issues.”

অর্থাৎ তিনি কৃত্রিম চমক নয়, বরং জীবনের খাঁটি বাস্তবতাকে পর্দায় তুলে ধরেছিলেন। গ্রামের দারিদ্র্য, শহরের মধ্যবিত্ত সংকট এবং মানবিক সম্পর্কের জটিলতা—সবই ছিল তাঁর গল্পের কেন্দ্র।

সত্যজিৎ রায়ের প্রভাব ছিল বৈশ্বিক। জাপানি কিংবদন্তি পরিচালক আকিরা কুরোসাওয়া তাঁর সম্পর্কে বলেন—
“Not to have seen the cinema of Ray means existing in the world without seeing the sun or the moon.”
এই একটি বাক্যই বোঝায়, রায়ের চলচ্চিত্র কতটা সর্বজনীন ও কালজয়ী। মার্টিন স্করসেজি, ফ্রান্সিস ফোর্ড কপোলা এবং ক্রিস্টোফার নোলানের মতো পরিচালকরা তাঁকে তাঁদের অনুপ্রেরণার অন্যতম উৎস হিসেবে উল্লেখ করেছেন।

১৯৫৫ সালে নির্মিত পথের পাঁচালী শুধু ভারত নয়, বিশ্ব সিনেমায় এক নতুন অধ্যায় রচনা করে। এটি “Apu Trilogy”-র সূচনা, যা পরে বিশ্ব চলচ্চিত্র ইতিহাসে এক মাইলফলক হিসেবে স্বীকৃত হয়। অনেক সমালোচক একে ২০শ শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্র হিসেবে বিবেচনা করেন।

সত্যজিৎ রায়ের চলচ্চিত্রে ক্যামেরা কখনো চিৎকার করে না—বরং পর্যবেক্ষণ করে। তাঁর প্রতিটি ফ্রেম একটি নীরব চিত্রকর্ম, যেখানে আলো, ছায়া এবং মানবিক অভিব্যক্তি একসাথে কাজ করে।

Turner Classic Movies তাঁর সম্পর্কে লিখেছিল—
“Ray created a cinema of simple observation dealing with social issues.”

সত্যজিৎ রায় ছিলেন বিরল ধরনের বহুমাত্রিক শিল্পী। তিনি শুধু পরিচালকই ছিলেন না—গল্পকার, চিত্রশিল্পী, সংগীত পরিচালক এবং চিত্রনাট্যকার হিসেবেও সমান দক্ষ ছিলেন। তাঁর নির্মিত ফেলুদা সিরিজ আজও বাংলা সাহিত্যের জনপ্রিয় গোয়েন্দা সাহিত্য।

সত্যজিৎ রায়ের চলচ্চিত্রে “mise-en-scène” অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তিনি প্রতিটি ফ্রেমকে একটি চিত্রকর্মের মতো গঠন করতেন—আলো, ছায়া, নীরবতা এবং মানবিক অভিব্যক্তির সূক্ষ্ম ভারসাম্যে।

Turner Classic Movies তাঁর কাজ নিয়ে লিখেছিল—
“Ray created a cinema of simple observation dealing with social issues।”

অর্থাৎ, তিনি সিনেমাকে জটিলতা থেকে সরিয়ে জীবনের স্বাভাবিক পর্যবেক্ষণে নিয়ে গিয়েছিলেন।

তাঁর অনেক চলচ্চিত্রই সমাজের কঠিন বাস্তবতা তুলে ধরেছে। The Guardian তাঁর কাজ নিয়ে মন্তব্য করেছে যে তাঁর চলচ্চিত্র “মানবজীবনের গভীর জটিলতা ও সাংস্কৃতিক সূক্ষ্মতা” ধারণ করে।

Pratidwandi বা Jana Aranya-র মতো চলচ্চিত্রে তিনি শহুরে বেকারত্ব, হতাশা ও নৈতিক সংকটকে অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে তুলে ধরেছেন—যা আজও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক।

তাঁর চলচ্চিত্রজীবন সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নতুন নতুন সামাজিক বাস্তবতা ও মানবিক সংকটকে তুলে ধরেছে। নিচে তাঁর প্রধান চলচ্চিত্রসমূহ সময়ক্রমে দেওয়া হলো:

প্রারম্ভিক বাস্তববাদী পর্ব
• পথের পাঁচালী (১৯৫৫)
• অপরাজিত (১৯৫৬)
• জলসাঘর (১৯৫৮)
• অপুর সংসার (১৯৫৯)
• দেবী (১৯৬০)
• তিন কন্যা (১৯৬১)
• কাঞ্চনজঙ্ঘা (১৯৬২)
• মহানগর (১৯৬৩)
• চারুলতা (১৯৬৪)

মধ্যপর্ব: সমাজ, সাহিত্য রাজনীতি
• কাপুরুষ ও মহাপুরুষ (১৯৬৫)
• নায়ক (১৯৬৬)
• চিড়িয়াখানা (১৯৬৭)
• গুপী গাইন বাঘা বাইন (১৯৬৯)
• অরণ্যের দিনরাত্রি (১৯৬৯)
• প্রতিদ্বন্দ্বী (১৯৭০)
• সীমাবদ্ধ (১৯৭১)
• অশনি সংকেত (১৯৭৩)
• সোনার কেল্লা (১৯৭৪)
• জন অরণ্য (১৯৭৫)

আন্তর্জাতিক পরিণত পর্ব
• শতরঞ্জ কে খিলাড়ি (১৯৭৭)
• জয় বাবা ফেলুনাথ (১৯৭৯)
• হীরক রাজার দেশে (১৯৮০)
• ঘরে বাইরে (১৯৮৪)
• গণশত্রু (১৯৮৯)
• শাখা প্রশাখা (১৯৯০)
• আগন্তুক (১৯৯১)

উত্তরাধিকার: কেন তিনি আজও গুরুত্বপূর্ণ

সত্যজিৎ রায়ের সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল তাঁর মানবিক দৃষ্টি। তিনি কখনোই কেবল বিনোদনের জন্য সিনেমা তৈরি করেননি; বরং মানুষের ভেতরের সত্যকে খুঁজে বের করেছেন। এজন্যই তিনি আজও সমান প্রাসঙ্গিক।

আজকের ডিজিটাল, দ্রুতগামী ও ভিজ্যুয়াল অতিভারাক্রান্ত যুগে তাঁর সিনেমা আমাদের মনে করিয়ে দেয়—ধৈর্য, পর্যবেক্ষণ এবং মানবিকতা ছাড়া শিল্প কখনো পূর্ণতা পায় না।

সত্যজিৎ রায় আমাদের শেখান—চলচ্চিত্র শুধু গল্প বলার মাধ্যম নয়, বরং মানুষকে বোঝার এক গভীর পথ। তাঁর চলচ্চিত্রে কোনো অতিরঞ্জন নেই; আছে নীরবতা, আছে বাস্তবতা, আর আছে মানবজীবনের সূক্ষ্ম বেদনা।

আজ তাঁর জন্মদিনে তাঁকে স্মরণ করা মানে শুধু একজন নির্মাতাকে স্মরণ করা নয়—বরং সেই দৃষ্টিভঙ্গিকে স্মরণ করা, যা মানুষকে দেখে সহানুভূতির চোখে এবং জীবনকে দেখে শিল্পের চোখে।

সেই প্রায় সাত ফুট লম্বা মানুষটার সৃজনশীলতার প্রতি আমি আজও মোহাবিষ্ট হয়ে রয়েছি। সেই মোহাবিষ্টতা বোধ হয় আজীবন যাবে না। 

আজ তাঁর জন্মদিনে বিশ্ব চলচ্চিত্র তাঁকে স্মরণ করছে শুধু একজন নির্মাতা হিসেবে নয়, বরং একজন মানবতাবাদী শিল্পদ্রষ্টা হিসেবে—যিনি পর্দায় জীবনের সত্যকে সবচেয়ে নিখুঁতভাবে ধরতে পেরেছিলেন।

লেখক: সম্পাদক, কলামিস্ট, বিশ্লেষক ও সাবেক অধ্যাপক
লন্ডন, ২ মে ২০২৬