ভয়েস অব পিপল | বিশেষ প্রতিবেদন
নীরব আগ্রাসন: তিন পথে ব্রিটেনকে টার্গেট করছে ইরান
লন্ডন, ৩ মে:
লন্ডনের আকাশে এখন শুধু কূটনীতি বা প্রচলিত রাজনীতির উত্তাপ নেই; এর ভেতরে জমে উঠছে এক নীরব ছায়াযুদ্ধ। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম The Times-এর সাম্প্রতিক অনুসন্ধান বলছে, ইরান সরাসরি সামরিক সংঘাতে না গিয়ে বহুস্তরীয় কৌশলের মাধ্যমে যুক্তরাজ্যকে লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করছে। এই কৌশলগুলো দৃশ্যমান নয়, কিন্তু প্রভাব গভীর—সমাজের ভেতর, নিরাপত্তা কাঠামোর ভেতর, এমনকি রাজনীতির অন্তর্গত স্তরেও এর ছাপ পড়ছে।

প্রথমত, প্রক্সি বা ছায়া সংগঠনের ব্যবহার। বিশ্লেষকদের মতে, ইরান এমন কিছু গোষ্ঠীকে সামনে রেখে কাজ করছে, যাদের সঙ্গে রাষ্ট্রের সরাসরি সম্পর্ক প্রমাণ করা কঠিন। এসব গোষ্ঠী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজেদের উপস্থিতি দেখায়, মাঝে মাঝে হামলার দায় স্বীকার করে, কিন্তু তাদের পেছনে কারা আছে—তা ধোঁয়াশার আড়ালেই থেকে যায়। এই কৌশলের সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো, রাষ্ট্র সরাসরি দায় এড়াতে পারে, অথচ লক্ষ্যবস্তুতে আতঙ্ক ছড়িয়ে দিতে সক্ষম হয়। ব্রিটেনে কিছু উপাসনালয় বা নির্দিষ্ট সম্প্রদায়কে লক্ষ্য করে সাম্প্রতিক হামলাগুলো এই প্যাটার্নের সঙ্গেই মিলে যায় বলে নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের ধারণা।
দ্বিতীয় কৌশলটি আরও জটিল—অপরাধ জগতকে ব্যবহার করা। আইনশৃঙ্খলা সংস্থার তথ্যমতে, সংগঠিত অপরাধচক্রকে এখন অনেক ক্ষেত্রে “আউটসোর্সড অপারেশন” হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। যারা হামলা চালাচ্ছে তারা অনেক সময় আদর্শিকভাবে কোনো চরমপন্থী সংগঠনের সদস্য নয়; বরং অর্থ, প্রভাব বা চাপের কারণে এসব কাজে যুক্ত হচ্ছে। ফলে এটি প্রচলিত সন্ত্রাসবাদের চেয়ে আলাদা একটি ধারা তৈরি করছে, যেখানে অপরাধ ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্য একে অপরের সঙ্গে মিশে যাচ্ছে। এই বাস্তবতায় হুমকি শনাক্ত করা যেমন কঠিন হচ্ছে, তেমনি প্রতিরোধ ব্যবস্থাও জটিল হয়ে উঠছে।
তৃতীয়ত, নরম শক্তির ব্যবহার—যা সবচেয়ে সূক্ষ্ম এবং দীর্ঘমেয়াদি। ধর্মীয়, সামাজিক বা অনলাইন প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে প্রভাব বিস্তার করে ধীরে ধীরে একটি মানসিক ও আদর্শিক ক্ষেত্র তৈরি করা হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। কিছু ক্ষেত্রে তরুণদের এমন কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়তে দেখা গেছে, যেখানে তারা নিজেরাই পুরো প্রেক্ষাপট বুঝে উঠতে পারেনি। এই প্রক্রিয়াটি তাৎক্ষণিক হামলার মতো দৃশ্যমান নয়, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে সমাজের ভেতরে বিভাজন ও অবিশ্বাস তৈরি করে।
এই তিনটি কৌশল একসঙ্গে একটি নতুন ধরনের যুদ্ধের ইঙ্গিত দেয়—যা প্রচলিত যুদ্ধের মতো নয়। এখানে ট্যাংক বা মিসাইলের ব্যবহার নেই; বরং রয়েছে প্রভাব, বিভ্রান্তি এবং অদৃশ্য চাপ। বিশ্লেষকরা এটিকে একটি বহুমাত্রিক ছায়াযুদ্ধ হিসেবে দেখছেন, যেখানে সরাসরি সংঘর্ষের বদলে সমাজের ভেতরে প্রবেশ করে ধীরে ধীরে অস্থিরতা তৈরি করা হয়।
যুক্তরাজ্য ইতোমধ্যে এই হুমকির মোকাবিলায় নজরদারি বাড়িয়েছে, বেশ কয়েকটি গ্রেপ্তার হয়েছে, এবং নিরাপত্তা কাঠামোকে আরও শক্তিশালী করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কিন্তু বড় প্রশ্নটি থেকেই যায়—এই ধরনের অদৃশ্য ও বহুমাত্রিক হুমকি কি শুধু আইন বা শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে মোকাবিলা করা সম্ভব?
ভয়েস অব পিপল-এর দৃষ্টিতে, এটি শুধু একটি দেশের বিরুদ্ধে আরেকটি দেশের কৌশল নয়; বরং বিশ্ব রাজনীতির একটি নতুন বাস্তবতা। রাষ্ট্রগুলো এখন আর শুধু সীমান্তে যুদ্ধ করে না, তারা সমাজের ভেতরে ঢুকে পড়ে—মানুষের মন, বিশ্বাস এবং পারস্পরিক সম্পর্ককে প্রভাবিত করে।
এই বাস্তবতায় সবচেয়ে বড় সতর্কবার্তা হলো—যুদ্ধের আগুন এখন আর দূরে কোথাও জ্বলছে না; তা ধীরে ধীরে মানুষের ভেতরেই ছড়িয়ে পড়ছে।