ভয়েস অব পিপল ।। জনগণের কণ্ঠস্বর, বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি
ব্রিটেনে কাউন্সেলিং ও সাইকোথেরাপি পেশায় আইনি নিয়ন্ত্রণের সুপারিশ, অনিয়ম ঠেকাতে নতুন উদ্যোগ
ভয়েস অব পিপল রিপোর্ট, ২ নভেম্বর :
ব্রিটেনে কাউন্সেলিং ও সাইকোথেরাপি পেশায় আইনগত নিয়ন্ত্রণ (Statutory Regulation) চালুর সুপারিশ করেছে একটি স্বাধীন কমিশন। মানসিক স্বাস্থ্যসেবার নামে অযোগ্য ব্যক্তিদের চিকিৎসা দেওয়া, রোগীদের সঙ্গে অনৈতিক আচরণ এবং অসদাচরণের পরও থেরাপিস্টদের কাজ চালিয়ে যাওয়ার সুযোগ বন্ধ করতে এই উদ্যোগের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
সোমবার প্রকাশিত কমিশনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বর্তমানে যুক্তরাজ্যে কেউ যথাযথ পেশাগত যোগ্যতা ছাড়াই নিজেকে কাউন্সেলর বা সাইকোথেরাপিস্ট পরিচয় দিতে পারেন। এসব পেশাগত পরিচয় আইন দ্বারা সংরক্ষিত নয়। ফলে কোনো থেরাপিস্টের বিরুদ্ধে গুরুতর অসদাচরণের অভিযোগ প্রমাণিত হলেও তাঁকে সব ক্ষেত্রে পেশা থেকে স্থায়ীভাবে বিরত রাখার কার্যকর আইনি ব্যবস্থা নেই।
কেন আইনি নিয়ন্ত্রণের প্রয়োজন?
বর্তমানে ব্রিটেনে কাউন্সেলিং ও সাইকোথেরাপির ক্ষেত্রে মূলত স্বেচ্ছাভিত্তিক নিবন্ধন ব্যবস্থা চালু রয়েছে। প্রফেশনাল স্ট্যান্ডার্ডস অথরিটির (PSA) স্বীকৃত বিভিন্ন পেশাজীবী সংগঠন তাদের সদস্যদের প্রশিক্ষণ, নৈতিকতা ও পেশাগত আচরণ পর্যবেক্ষণ করে। কিন্তু সব কাউন্সেলর বা থেরাপিস্টের এসব সংগঠনে নিবন্ধিত হওয়া বাধ্যতামূলক নয়।
কমিশনের মতে, এই ব্যবস্থায় জনসাধারণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে বড় ধরনের ঘাটতি রয়েছে। বিশেষ করে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত ও সংকটাপন্ন মানুষ চিকিৎসার জন্য থেরাপিস্টের কাছে যান। তাঁদের পক্ষে একজন থেরাপিস্টের যোগ্যতা ও পেশাগত গ্রহণযোগ্যতা যাচাই করা সব সময় সহজ নয়।
আইনগত নিয়ন্ত্রণ চালু হলে পেশাগত যোগ্যতার নির্দিষ্ট মানদণ্ড, বাধ্যতামূলক নিবন্ধন, অভিযোগ তদন্ত এবং গুরুতর অসদাচরণের ক্ষেত্রে কাজের অনুমতি বাতিলের ব্যবস্থা করা সম্ভব হবে।
ভুক্তভোগীর অভিজ্ঞতায় সামনে এসেছে নিরাপত্তার প্রশ্ন
প্রতিবেদনে এলা জ্যানেহ নামের এক নারীর অভিজ্ঞতা তুলে ধরা হয়েছে। ২০২৪ সালে তিনি তাঁর থেরাপিস্টের বিরুদ্ধে ধর্ষণ ও যৌন নিপীড়নের অভিযোগে হাইকোর্টে মামলা করে জয়ী হন। কিন্তু দেওয়ানি মামলায় জয়ী হওয়ার পরও ওই থেরাপিস্টের পেশাগত কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার সুযোগ রয়েছে।
এলা বলেন, বর্তমান ব্যবস্থায় একই ব্যক্তি অসদাচরণের পরও অন্যত্র কাজ চালিয়ে যেতে পারেন। তাঁর মতে, আইনগত নিয়ন্ত্রণ চালু হলে অনৈতিক ও নির্যাতনকারী ব্যক্তিদের পেশা থেকে দূরে রাখা সহজ হবে।
কমিশনের সহসভাপতি এবং নার্সিং অ্যান্ড মিডওয়াইফারি কাউন্সিলের সাবেক প্রধান নির্বাহী আন্দ্রেয়া সাটক্লিফ বলেন, কাউন্সেলিং ও সাইকোথেরাপি জটিল পেশাগত সেবা। এখানে দীর্ঘ প্রশিক্ষণ ও দক্ষতা প্রয়োজন। অথচ অধিকাংশ থেরাপিস্ট স্বাধীনভাবে কাজ করেন এবং তাঁদের ওপর কোনো নিয়োগকর্তার সরাসরি তদারকি থাকে না। তাই জনসাধারণের সুরক্ষায় কার্যকর নিয়ন্ত্রণ প্রয়োজন।
মানসিক স্বাস্থ্যসেবায় বাড়তি সুযোগ
কমিশনের প্রতিবেদনে শুধু নিয়ন্ত্রণ নয়, মানসিক স্বাস্থ্যসেবার পরিধি বাড়ানোর সম্ভাবনাও তুলে ধরা হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, যুক্তরাজ্যে প্রায় ৮২ হাজার যোগ্য কাউন্সেলর ও সাইকোথেরাপিস্ট রয়েছেন, যাঁদের একটি বড় অংশের অতিরিক্ত সেবা দেওয়ার সক্ষমতা রয়েছে। তাঁদের প্রতিনিধিত্বকারী পেশাজীবী সংগঠনগুলোর তথ্য অনুযায়ী, এই কর্মীরা সম্মিলিতভাবে প্রতি সপ্তাহে আরও ৩ লাখ ৭০ হাজার ঘণ্টার বেশি থেরাপি সেবা দিতে পারবেন।
কমিশনের হিসাবে, এই অতিরিক্ত সক্ষমতার মাত্র ১০ শতাংশ কাজে লাগানো গেলেও বছরে দেড় লাখের বেশি মানুষকে নতুন করে মানসিক স্বাস্থ্যসেবা দেওয়া সম্ভব। বর্তমানে যুক্তরাজ্যে প্রায় ১৮ লাখ মানুষ মানসিক স্বাস্থ্যসেবা পাওয়ার অপেক্ষায় রয়েছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
সরকারের সিদ্ধান্ত এখনো বাকি
কমিশনের সুপারিশ প্রকাশের অর্থ এই নয় যে ব্রিটেনে কাউন্সেলর ও সাইকোথেরাপিস্টদের জন্য ইতিমধ্যে নতুন আইন কার্যকর হয়েছে। আইন প্রণয়ন ও বাধ্যতামূলক নিয়ন্ত্রণ চালুর সিদ্ধান্ত নিতে হবে সরকারকে।
উল্লেখ্য, ২০২৬ সালের মার্চে সংসদে দেওয়া এক লিখিত জবাবে স্বাস্থ্য ও সমাজসেবা বিভাগ জানিয়েছিল, কাউন্সেলিং ও সাইকোথেরাপি পেশায় আইনগত নিয়ন্ত্রণ সম্প্রসারণের কোনো তাৎক্ষণিক পরিকল্পনা সরকারের নেই। নতুন কমিশনের সুপারিশের পর সরকারের অবস্থান পরিবর্তন হয় কি না, সেটিই এখন দেখার বিষয়।